শব্দদূষণে বধিরতার দিকে যাচ্ছে রাজধানীবাসী

Printed Edition

হামিম উল কবির

শব্দদূষণে রাজধানীবাসী বধিরতার দিকে যাচ্ছে। সহনীয় মাত্রার চেয়ে তিনগুণ বেশি তীব্রতার শব্দ শুনতে বাধ্য হচ্ছে। ফলে বহুবিধ স্বাস্থ্যঝুঁকির সম্মুখীন হচ্ছেন তারা। শব্দদূষণটা হচ্ছে অজান্তেই অসচেতনভাবে, অকারণে ইচ্ছাকৃতভাবে এবং আনন্দ ফুর্তি করতে গিয়ে। আবাসিক এলাকায় যানবাহনের হর্নের মাত্রাতিরিক্ত ব্যবহার, বিভিন্ন সামাজিক ও রাজনৈতিক কাজে উচ্চ শব্দে দীর্ঘ সময় মাইক বা সাউন্ড বক্সের ব্যবহারে রাজধানীবাসী প্রচণ্ড রকম স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়েছে।

মানুষের শব্দ গ্রহণের স্বাভাবিক ক্ষমতা ৬০ ডেসিবল কিন্তু ঢাকার ব্যস্ততম এলাকার শব্দদূষণের মাত্রা এর চেয়ে অনেক বেশি। সপ্তাহে আট ঘণ্টা ধরে ৮০ ডেসিবল শব্দের বেশি (৯০ থেকে ৯৫ ডেসিবল) শব্দ শুনতে থাকলে মানুষের মধ্যে ধীরে ধীরে বধিরতা শুরু হতে থাকে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যানুযায়ী প্রতি এক হাজার জনের মধ্যে একজন জীবনের কোনো না কোনো সময় বধির হয়ে যেতে পারে। প্রতি এক হাজার জনের মধ্যে একজন বধিরতা নিয়েই জন্মায়। শব্দদূষণ থেকে বধিরতা ছাড়াও নানা জটিল রোগের সৃষ্টি হতে পারে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যানুসারে ৩০টি কঠিন রোগের কারণ ১২ রকমের পরিবেশদূষণ, যার মধ্যে শব্দদূষণ অন্যতম। শব্দদূষণের কারণে রক্তচাপ বৃদ্ধি, হৃদস্পন্দনে পরিবর্তন, হৃৎপিণ্ডে ও মস্তিস্কে অক্সিজেন কমে যেতে পারে। এ জন্য শ্বাসকষ্ট, মাথাঘোরা, বমি বমি ভাব, বমি হওয়া, দিক ভুলে যাওয়া, দেহের নিয়ন্ত্রণ হারানো, মানসিক ক্ষতিসহ বিভিন ধরনের অসুস্থতা তৈরি করে।

২০২০ সালে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের দায়িত্ব পালনরত ২০০ ট্রাফিক পুলিশের শ্রবণ স্বাস্থ্যের ওপর জরিপ চালায় ক্যাপস নামক একটি প্রতিষ্ঠান। জরিপে দেখা যায়, শব্দদূষণে ১১.৮ শতাংশ ট্রাফিক পুলিশের শ্রবণশক্তি তিগ্রস্ত হয়েছে। ১৫.৫ শতাংশ ট্রাফিক পুলিশ জানান, সাধারণভাবে মোবাইলে কথা শুনতে তাদের অসুবিধা হয়। ১৯.১ শতাংশ জানিয়েছেন, ঘরের অন্য সদস্যদের তুলনায় বেশি ভলিউম দিয়ে তাদের টিভি দেখতে হয়। আর ৩৩.৯ শতাংশ জানিয়েছেন, অন্যরা উচ্চ স্বরে কথা না বললে তাদের কথা শুনতে কষ্ট হয়। ৮.২ শতাংশ ট্রাফিক পুলিশ জানিয়েছেন, কয়েক ঘণ্টা দায়িত্ব পালনের পর তাদের মাথাঘোরানো, মাথা ভনভন করা, বমি বমি ভাব ও কান্তিতে ভুগে থাকেন।

শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণ বিধিমালা অনুযায়ী শব্দের মাত্রা অতিক্রমকারী হর্ন স্থাপন ও ব্যবহারে তাৎক্ষণিক জরিমানার বিধান করা হয়েছে। সড়ক পরিবহন আইন ২০১৮-এর ৪৫ ধারা অনুযায়ী হাইড্রোলিক হর্ন বাজানো বা অতিরিক্ত শব্দ সৃষ্টি করা নিষিদ্ধ। প্রথমবার অপরাধ করলে জরিমানা ৫০০ টাকা এবং আবার একই অপরাধ করলে ছয় মাস পর্যন্ত জেল বা ১০ হাজার টাকা জরিমানার বিধান রয়েছে। শব্দ নিয়ন্ত্রণ বিধিমালা ২০২৫ অনুযায়ী, শব্দ অতিক্রমকারী হর্ন ব্যবহার নিষিদ্ধ করা হয়েছে। ঢাকার হজরত শাহজালাল বিমানবন্দর এলাকার ৩ কিলোমিটার এলাকা ‘হর্ন ফ্রি’ এলাকা ঘোষণা করা হলেও কোনো ড্রাইভার মেনে চলেন না।

শব্দের মাত্রা নির্ধারণ করে দেয়া হলেও রাজধানীতে চলাচল করে এমন বাস, ট্রাক অথবা প্রাইভেট কারের ড্রাইভাররা স্পষ্ট করে জানেন না। নয়া দিগন্তের এই প্রতিবেদক বিভিন্ন সময় ঢাকায় চলাচল করে এমন কিছু বাসের ড্রাইভারদের জোরে হর্ন বাজালে মানুষের কোনো সমস্যা হয় না কি না জিজ্ঞাসা করলে, তারা প্রায় সবাই একই রকমভাবে বলেন, ‘এসব চিন্তা করার সময় কোথায়, জোরে হর্ন না বাজালে মানুষ শোনে না, হর্ন না বাজিয়ে গাড়ি চালালে তো এক্সিডেন্ট হবে, তখন দায়িত্ব তো আমাকেই নিতে হবে। আমাকে আর হেলপার-কন্ডাক্টরকে ধরেই থানায় নিয়ে যাবে পুলিশ। এক্সিডেন্ট করলে গাড়িটা পুড়িয়ে দিলে আমার আর মালিকের ক্ষতি হবে অন্য কেউ এর দায়িত্ব নেবে না।’

বাংলাদেশ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের নাক কান গলা বিশেষজ্ঞ ডা: আবদুল্লাহ আল মামুন বলেন, আমাদের দেশের মানুষ শব্দদূষণের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বেশি অসচেতন। এ ব্যাপারে একটি আইন আছে কিন্তু আইনের কোনো প্রয়োগ নেই। রাজধানীর শব্দদূষণের মাত্রা ভয়াবহ রকমের বেশি। আমরা প্রতিদিন প্রচুর রোগী পাই যারা কানে অনেক কম শোনেন কিন্তু এটাকে তারা রোগ মনে করেন না। আসেন অন্য রোগ নিয়ে, কানে কম শোনেন অভিযোগ অনেকেরই নেই। কিন্তু ডাক্তারের চেম্বারে আসার পর উচ্চ স্বরে কথা বলেন এটি বুঝতেও পারেন না।’

শব্দদূষণের বিরুদ্ধে পরিবেশ অধিদফতরের তেমন কোনো তৎপরতা নেই। বায়ুদূষণে তারা কিছু কাজ করলেও শব্দদূষণে কোনো কাজ নেই বললেই চলে।