গবেষণায় ৪ দশকের উজ্জ্বল নক্ষত্র রাবির অধ্যাপক আজহার

Printed Edition

রাবি সংবাদদাতা

গবেষণা, শিক্ষা ও একাডেমিক কার্যক্রমে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক ড. এ কে এম আজহারুল ইসলামকে ‘প্রফেসর ইমেরিটাস’ পদে নিয়োগ দেয়া হয়েছে। ১২ ডিসেম্বর ২০২৪-এ অনুষ্ঠিত বিশ্ববিদ্যালয় সিন্ডিকেটের ৫৩৫তম সভায় এই সিদ্ধান্ত অনুমোদিত হয়। তবে এই নিয়োগকে কেন্দ্র করে বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরে মেধা বনাম আত্মীয়তার বিতর্ক দানা বেঁধেছে। এক দিকে যেমন তার বিশ্বমানের গবেষণা ও যোগ্যতার পাল্লা ভারী, অন্য দিকে বর্তমান ভিসির সাথে তার পারিবারিক সম্পর্ক নিয়ে উঠেছে প্রশ্ন।

প্রফেসর ইমেরিটাস পদটি মূলত অবসরপ্রাপ্ত সেইসব শিক্ষকদের দেয়া হয়, যারা আজীবন শিক্ষা ও গবেষণায় বিশেষ স্বাক্ষর রেখেছেন। ড. আজহারুল ইসলামের ক্যারিয়ার পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, তিনি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিএসসি (অনার্স) ও এমএসসিতে প্রথম শ্রেণীতে প্রথম স্থান অধিকার করেন। পরবর্তীতে লন্ডনের ইম্পেরিয়াল কলেজ ও লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উচ্চতর ডিগ্রি অর্জন করেন।

গবেষণার ক্ষেত্রে তিনি এক বিস্ময়। জাপানি বিজ্ঞানীদের সাথে যৌথভাবে ‘পেরোভস্কাইট-টাইপ অক্সাইড সুপারকন্ডাক্টর’ সহ-আবিষ্কার তার অন্যতম বড় সাফল্য। বর্তমানে তিনি বিশ্বের শীর্ষ বিজ্ঞানীদের তালিকায় স্থান করে নিয়েছেন। পাঁচ শতাধিক প্রকাশনা, ৩১৫টি আন্তর্জাতিক গবেষণা নিবন্ধ এবং ১৪১ জন গবেষকের মেন্টর হিসেবে তার কাজ বিশ্বজুড়ে স্বীকৃত। ২০১৩ সালে তৎকালীন বিভাগীয় সভাপতি অধ্যাপক ড. সোমনাথ ভট্টাচার্য তাকে ইমেরিটাস করার প্রস্তাব দিলেও তৎকালীন ‘আওয়ামী প্রশাসন’ তা আমলে নেয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে। ৫ আগস্টের পট-পরিবর্তনের পর সেই ফাইলটি পুনরায় প্রাণ পায়। বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে একটি ব্যক্তিগত সম্পর্ক- আজহারুল ইসলাম তখনকার ভিসি অধ্যাপক ড. সালেহ হাসান নকীবের আপন শ্বশুর। বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি অংশ মনে করছেন, এই নিয়োগে ‘শ্বশুর কোটা’র প্রভাব থাকতে পারে।

তবে এই বিতর্ককে নাকচ করে দিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। নিয়োগের জন্য গঠিত পাঁচ সদস্যের বোর্ডে ছিলেন দেশ-বিদেশের খ্যাতিমান বিশেষজ্ঞরা। এর মধ্যে রয়েছেন বাংলাদেশ বিজ্ঞান একাডেমির তদানীন্তন সভাপতি ইমেরিটাস অধ্যাপক ড. এম শমশের আলী এবং জাপানের জেএআইএসটি ও মালয়েশিয়ার পার্লিস বিশ্ববিদ্যালয়ের বিদেশী অধ্যাপকরা। স্বচ্ছতা বজায় রাখতে ভিসি নিজে এই বোর্ড থেকে দূরে ছিলেন। কমিটির আহ্বায়ক ও প্রোভিসি (শিক্ষা) অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ ফরিদ উদ্দিন খান বলেন, ‘ড. আজহারুল ইসলামের সাইটেশন ও গবেষণার সংখ্যা অন্য যে কারোর চেয়ে বেশি। বিদেশী বিশেষজ্ঞরা তার কাজের ভূয়সী প্রশংসা করেছেন। বর্তমান ও সাবেক ইমেরিটাস অধ্যাপকদের সাথে তুলনা করলে তার যোগ্যতা প্রশ্নাতীত।’

বিভাগের আরেক প্রথিতযশা ইমেরিটাস অধ্যাপক ড. অরুণ কুমার বসাক তার ছাত্রের এই অর্জনে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে বলেন, ‘তিনি শুধু যোগ্যই নন, অত্যন্ত যোগ্য। আরো অনেক আগেই তার এই স্বীকৃতি পাওয়া উচিত ছিল।’

ব্যক্তিগত সম্পর্ককে কেন্দ্র করে বিতর্ক থাকলেও ড. আজহারুল ইসলামের ছয় দশকের একাডেমিক অর্জন তাকে অনন্য উচ্চতায় আসীন করেছে। বাংলাদেশের প্রথম আইএসইএসসিও লরিয়েট হওয়া এবং পাকিস্তানের প্রেসিডেন্টের স্বর্ণপদক জয়ী এই বিজ্ঞানীর নিয়োগকে রাবির জ্যেষ্ঠ শিক্ষকরা মেধার জয় হিসেবেই দেখছেন।

নিজের অনুভূতি প্রকাশ করতে গিয়ে অধ্যাপক ড. এ কে এম আজহারুল ইসলাম বলেন, ‘আমার লক্ষ্য ছিল দক্ষ ও দেশপ্রেমিক শিক্ষার্থী তৈরি করা। দীর্ঘ শিক্ষকতা জীবনে গবেষণাকেই ধ্যান-জ্ঞান মেনেছি। এই স্বীকৃতি সেই চেষ্টারই ফল।’