শহীদ জিয়া স্বাধীনতার ঘোষক

ফ্যাসিবাদী আমলে পুলিশকে দলীয় বাহিনী করে ফেলা হয় : রাষ্ট্রপতি

Printed Edition

বিশেষ সংবাদদাতা

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনে রাষ্ট্রপতি মো: সাহাবুদ্দিনের ভাষণ রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক সংস্কারের নানা অঙ্গীকারের সাথে যুক্ত হয়ে উঠেছে। গতকাল বৃহস্পতিবার বিকেলে প্রদত্ত ভাষণে তিনি মুক্তিযুদ্ধ, বিএনপি ও আওয়ামী লীগ সরকারের কর্মপন্থা এবং পুলিশের সংস্কার নিয়ে বক্তব্য রাখেন।

ভাষণের শুরুতে রাষ্ট্রপতি মুক্তিযুদ্ধের শহীদ ও বীর মুক্তিযোদ্ধাদের স্মরণ করে বলেন, ‘স্বাধীনতার ঘোষক শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান বীর উত্তম।’ এ ছাড়া তিনি বিএনপির সাবেক চেয়ারপারসন ও তিনবারের নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার অবদানকেও শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করেন। এ সময় সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীর বিক্রম অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন। সংবিধান অনুযায়ী ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনে রাষ্ট্রপতি এ ভাষণ দেন। তবে ভাষণ চলাকালীন বিরোধী দলের এমপিরা ওয়াকআউট করেন। জামায়াত জোটের এমপিরা এ সময় ‘জুলাইয়ের সাথে গাদ্দারি চলবে না’ লেখা লাল রঙের প্ল্যাকার্ড প্রদর্শন করেন। রাষ্ট্রপতি কে প্রবেশের সময় সংসদ নেতা ও সরকারদলীয় সদস্যরা দাঁড়িয়ে অভিবাদন জানান।

সংসদে ভাষণে রাষ্ট্রপতি বলেন, বিতাড়িত ফ্যাসিবাদী শাসনামলে আইনশৃঙ্খলা রাকারী বাহিনীকে দলীয় বাহিনী হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছিল। জুলাই-আগস্ট গণ-অভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশ পুলিশের সার্বিক সংস্কারের জন্য অন্তর্বর্তী সরকার ৯ ডিসেম্বর ২০২৫ তারিখে ‘পুলিশ সংস্কার কমিশন’ গঠন করেছে। বর্তমান সরকার আইনশৃঙ্খলা রাকারী বাহিনীকে সম্পূর্ণ পেশাদার, আধুনিক এবং দ বাহিনী হিসেবে গড়ে তুলতে বদ্ধপরিকর। সেবাবান্ধব পুলিশ গঠন, পুলিশের নৈতিক মনোবল পুনর্গঠন, অনলাইন অভিযোগ দায়ের ব্যবস্থা সম্প্রসারণ এবং পুলিশ কমিশন অধ্যাদেশ পুনঃনিরীণ করা হবে।

২০২৪ সালের জুলাই-আগস্ট ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানে শহীদ ও আহতদের অসামান্য ত্যাগের মাধ্যমে বাংলাদেশ ফ্যাসিবাদমুক্ত হয়ে গণতন্ত্রের পথে যাত্রা শুরু করেছে বলে উল্লেখ করেন রাষ্ট্রপতি।

রাষ্ট্রপতি মো: সাহাবুদ্দিন বলেন, বাংলাদেশের গণতন্ত্রের ইতিহাসে ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্ট মাসে ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থান একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। কোটা সংস্কার আন্দোলন থেকে একপর্যায়ে এটি ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে রূপ নেয়। দেশের ছাত্র-জনতা, কৃষক-শ্রমিক, শিক, সাংবাদিক, বুদ্ধিজীবী, প্রবাসী তথা সব শ্রেণিপেশার মানুষ, গণতন্ত্রের পরে রাজনৈতিক দলসহ সবার সম্মিলিত আন্দোলনের ফলে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট তৎকালীন ফ্যাসিস্ট সরকারের পতন ঘটে। তিনি বলেন, হাজারো শহীদের রক্তের ওপর দিয়ে তাঁবেদার ও ফ্যাসিবাদমুক্ত নতুন গণতান্ত্রিক বাংলাদেশের সূচনা হয়। আমি ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্ট ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানে শহীদ ও আহতদের এবং দীর্ঘ দেড় দশকের ফ্যাসিবাদী শাসনামলে গুম, খুন, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড এবং ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে নির্যাতন ও নিপীড়নের শিকার সাধারণ মানুষ ও রাজনৈতিক দলের সদস্যবৃন্দকে কৃতজ্ঞতার সাথে স্মরণ করছি, যাদের অসামান্য ত্যাগের মাধ্যমে বাংলাদেশ ফ্যাসিবাদমুক্ত হয়ে গণতন্ত্রের পথে যাত্রা শুরু করেছে।

রাষ্ট্রপতি বলেন, ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানে সহস্রাধিক মানুষ শহীদ হয়েছেন। নারী, পুরুষ, শিশুসহ আহত ও পঙ্গু হয়েছেন কমপে ত্রিশ হাজার মানুষ। পাঁচ শতাধিক মানুষ চোখ হারিয়ে অন্ধত্ববরণ করেছেন। তিনি বলেন, ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানে আহতদের দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা চলমান রয়েছে। ১৩৭ জন গুরুতর আহত জুলাই যোদ্ধাকে উন্নত চিকিৎসার জন্য বিদেশে পাঠানো হয়েছে। আহতদের ১২ হাজার ৪৩টি স্বাস্থ্য কার্ড দেয়া হয়েছে। ১৯৭১ সালের বীর মুক্তিযোদ্ধা ও ২০২৪ সালের জুলাই যোদ্ধাদের চিকিৎসা সহায়তা ও ভাতা অনলাইন ব্যাংকিং সিস্টেমে পরিচালিত হচ্ছে।

ভাষণের শুরুতে রাষ্ট্রপতি বলেন, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের এই উদ্বোধনী অধিবেশন বাংলাদেশের ইতিহাসে এক ঐতিহাসিক মুহূর্ত। একটি শান্তিপূর্ণ, অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপে নির্বাচনের মাধ্যমে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের নিয়ে এই মহান জাতীয় সংসদের যাত্রা শুরু হয়েছে। তিনি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী সব রাজনৈতিক দল এবং এই নির্বাচন আয়োজনের সাথে সংশ্লিষ্ট সবার প্রতি আন্তরিক অভিনন্দন জানান।

রাষ্ট্রপতি বলেন, অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপে নির্বাচন আয়োজনের জন্য নির্বাচন কমিশন, মাঠ প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রাকারী বাহিনীসহ প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীদের নিরলস পরিশ্রম, নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী সব রাজনৈতিক দল ও ব্যক্তির আন্তরিক উদ্যোগ এবং সাধারণ জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ ভবিষ্যতের জন্য একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।

তিনি বলেন, বর্তমান সংসদে বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি ও সমমনা দলগুলো দুই-তৃতীয়াংশের বেশি আসনে বিপুল ভোটে জয়লাভ করেছে। এই সংসদে আপনার মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এবং তার নেতৃত্বে গঠিত নতুন সরকারকে আন্তরিক অভিনন্দন জানাচ্ছি। আমি এই মহান জাতীয় সংসদে নির্বাচিত সব সংসদ সদস্যকেও অভিনন্দন জানাচ্ছি।

মো: সাহাবুদ্দিন বলেন, মহান মুক্তিযুদ্ধের লাখো শহীদ এবং বীর মুক্তিযোদ্ধাদের শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করছি, যাদের আত্মত্যাগের বিনিময়ে আজকের এই স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ। স্বাধীনতার ঘোষক শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান বীর উত্তম, স্বাধীনতা এবং মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের সব অবিসংবাদিত নেতার অবদানকেও শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করছি। তিনবারের নির্বাচিত সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির সাবেক চেয়ারপারসন, দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার অবদানকে শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করছি, যিনি দেশে সংসদীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করেছেন। গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ে প্রতিবার সামনের কাতারে থেকে আপসহীন নেতৃত্ব দিয়েছেন। তিনি আরো বলেন, ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনের যুদ্ধ, ২০২৪ সালের দেশ এবং জনগণের স্বাধীনতা রার যুদ্ধসহ এ যাবৎকালে দেশের ইতিহাসের সব গণতান্ত্রিক আন্দোলনের শহীদদের আকাক্সিত বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার ল্েয সরকার কার্যক্রম অব্যাহত রেখেছে।

মো: সাহাবুদ্দিন বলেন, বিশ্ব শিশু দিবস ও শিশু অধিকার সপ্তাহ ২০২৫ উদযাপন উপলে ২০২৫ সালের ৬ অক্টোবর সরকার জুলাইয়ের গণ-অভ্যুত্থানে শিশু শহীদদের ৬০টি পরিবারকে এককালীন ৫০ হাজার টাকার সমমূল্যের প্রাইজবন্ড এবং সম্মাননা স্মারক প্রদান করেছে। ওসমানী উদ্যানে ‘জুলাই স্মৃতিস্তম্ভ’ নির্মাণের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। জুলাই-আগস্ট গণ-অভ্যুত্থানের শহীদদের স্মরণে শহীদী মৃত্যুর নির্দিষ্ট স্থানে ঝঃৎববঃ গবসড়ৎু ঝঃধসঢ় স্থাপনের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। শহীদদের কবর সংরণ করা হয়েছে। জুলাই শহীদদের স্মৃতি অম্লান রাখতে জুলাই গণ-অভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর এবং ৬৪ জেলায় স্মৃতিস্তম্ভ স্থাপন করা হয়েছে। জাতীয়ভাবে ৩৬ দিনব্যাপী জুলাই পুনর্জাগরণ অনুষ্ঠানমালা-২০২৫ বাস্তবায়িত হয়েছে।

রাষ্ট্রপতি বলেন, ২০২৫ সালে ৭৯১ জনকে সাব-ইন্সপেক্টর পদে, ৮,০১১ জনকে কনস্টেবল পদে নিয়োগ করা হয়েছে। একই বছরে কনস্টেবল হতে এসআই পর্যন্ত বিভিন্ন পদে সর্বমোট তিন হাজার ৫৬০ জন সদস্যকে পদোন্নতি দেয়া হয়েছে। দেশের আইনশৃঙ্খলা রা এবং পুলিশের সমতা বাড়াতে বর্তমান সরকার পুলিশে আরো চার হাজার সাব-ইন্সপেক্টর এবং ১০ হাজার নতুন কনস্টেবল নিয়োগ দেবে। একই সাথে পুলিশ সার্জেন্টের ১৮০টি শূন্যপদে নিয়োগ চূড়ান্ত করবে। দেশে কারাগার ব্যবস্থাপনার অংশ হিসেবে পাঁচটি নতুন কারাগার চালু করা হয়েছে। প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থাপনা, ‘১৬১৯১’ কল সেন্টার, ডিজিটাল বন্দী ব্যবস্থাপনার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। তিনি বলেন, আইনশৃঙ্খলার উন্নয়ন বর্তমান সরকারের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার। দেশের প্রতিটি নাগরিক যাতে ঘরে-বাইরে শান্তি, স্বস্তি এবং নিরাপত্তা বোধ করেন এটি নিশ্চিত করার ল্েযই সরকার সব কার্যক্রম বাস্তবায়ন করছে। সারা দেশে আইনশৃঙ্খলা অবনতির অন্যতম কারণ হিসেবে বর্তমান সরকার অনলাইন জুয়াসহ সব ধরনের জুয়া এবং মাদকের বিস্তারকে চিহ্নিত করেছে। ফলে জুয়া এবং মাদক নিয়ন্ত্রণে বর্তমান সরকার সারা দেশে বিশেষ অভিযান পরিচালনা শুরু করেছে। একই সাথে অবৈধ অস্ত্র, গোলাবারুদ, ধারালো অস্ত্র ও হাতবোমা উদ্ধার এবং অপরাধীদের গ্রেফতার অভিযান চলবে।

ভাষণটি শেষ হয় ‘বাংলাদেশ জিন্দাবাদ’ স্লোগান দিয়ে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানসহ সরকারদলীয় সদস্যরা রাষ্ট্রপতির বক্তব্যকে টেবিল চাপড়ে স্বাগত জানান।