মোবাইল হ্যাক বা ওটিপি সংগ্রহ করে টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে প্রতারক চক্র

সচেতনতায় জোর অপরাধ বিশেষজ্ঞদের

Printed Edition

নূরুল মোস্তফা কাজী, চট্টগ্রাম ব্যুরো

মোবাইল হ্যাক করে বা সম্মোহিত করে ওটিপি সংগ্রহ করে পরিচিতজনদের কাছ থেকে হাজার হাজার টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে সংঘবদ্ধ প্রতারক চক্র। কখনো সেনাবাহিনীর কর্মকর্তা পরিচয়ে, কখনো পুলিশের, কখনো শিক্ষা বোর্ডের কর্মকর্তা অথবা কখনো চাকরিপ্রত্যাশী নম্বর ভুল হওয়ার কথা বলে নতুন নতুন কৌশলে প্রতারিত করছে সাধারণ মানুষকে। প্রতারক চক্রটি নিজেদের বুদ্ধিমত্তায় কখনো ওটিপি দিতে রাজি করাচ্ছে, কখনো বা মোবাইল অফ করে রাখতে রাজি করাচ্ছে। আর ওই অল্প সময়ে হাতিয়ে নিচ্ছে হাজার হাজার টাকা। ফলে এ ধরনের প্রতারণা থেকে বাঁচতে সচেতনতার উপর জোর দিয়েছেন অপরাধ বিশেষজ্ঞ এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা।

ঘটনা:১

হঠাৎ কোনো অপরিচিত মেয়ের নম্বর থেকে এক আইনজীবীর মোবাইলে কল আসে। কলকারী মেয়ে অত্যন্ত নম্র-ভদ্র ও আন্তরিক ভঙ্গিতে অনুরোধ করে বলে- ভাইয়া, আমি অনেক কষ্টে একটি সরকারি চাকরি পেয়েছি। কিন্তু যে কম্পিউটারের দোকান থেকে আবেদন করেছিলাম, তিনি ভুলবশত আমার নম্বরের জায়গায় আপনার নম্বর দিয়ে দিয়েছেন। এখন চাকরির কনফার্মেশন মেসেজের ওটিপি আপনার নম্বরে গেছে। দয়া করে ওটিপিটা বললে আমার চাকরিটা হয়ে যাবে। আপনি না দিলে আমি খুব বিপদে পড়ে যাব বলেই কান্নাকাটি শুরু করে দেয়।

ওই আইনজীবী বলেন, মেয়েটির কথাবার্তা এমনভাবে সাজানো ছিল, যাতে তার প্রতি সহানভূতি জাগে এবং আমি তাড়াহুড়া করে তাকে সাহায্য করতে চাই। তার কথায় সরল বিশ্বাসে নিজের মোবাইলে পাঠানো ওটিপি (ওয়ান টাইম পাসওয়ার্ড) বলে দেয়ার প্রতারকচক্র আমার মোবাইলে থাকা বিভিন্ন অ্যাপের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেয়। বিশেষ করে- কল কেটে দেয়ার আগেই আমার বিকাশ এবং নগদ অ্যাকাউন্ট জিরো হয়ে গেছে।

ওই আইনজীবী নয়া দিগন্তকে বলেন, ওটিপি সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত ও গোপন তথ্য। কোনো প্রতিষ্ঠান কখনো ফোন করে আপনার ওটিপি চায় না। সন্দেহজনক কল এলে সাথে কল কেটে দিন। একটি ছোট অসাবধানতাই বড় ক্ষতির কারণ হতে পারে।

ঘটনা:২

ব্যাংক অ্যাকাউন্ট হ্যাক করে অনলাইন ট্রান্সফার পদ্ধতিতে ব্যাংক অ্যাকাউন্ট থেকে অর্থ আত্মসাৎ :

চট্টগ্রামের বাসিন্দা আশফা খানম সম্প্রতি নগরীর চকবাজার থানায় একটি অভিযোগ করেছেন। এতে তিনি উল্লেখ করেন- ঢাকায় অবস্থানরত বড় মেয়েকে ০১৬২৯৩৬৭৯৮৬ নম্বর থেকে এক অজ্ঞাত ব্যক্তি ফোন করে করে নিজেকে চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের কর্মকর্তা পরিচয় দেন। এরপর পরিবারের সদস্যদের নাম সঠিকভাবে উল্লেখ করে জানান, আমার মেয়ের নামে একটি সরকারি বৃত্তির টাকা অগ্রণী ব্যাংকে জমা আছে, যা সরকার কর্তৃক সমন্বয় প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট অ্যাকাউন্টে হস্তান্তর করা হচ্ছে। এরপর তিনি আমার মেয়ের ব্যাংকসংক্রান্ত তথ্য জানতে চান। বিশেষ করে কোন কোন ব্যাংকে তার কার্ড আছে তা জানতে চান। আমার মেয়ে সরল বিশ্বাসে সাউথ ইস্ট ব্যাংক অ্যাকাউন্টের কার্ড নম্বর পরে ওই ব্যক্তি আমার মেয়েকে বলেন, তার বৃত্তির টাকা অভিভাবকের অ্যাকাউন্টেও স্থানান্তর করা যাবে। এই প্রেক্ষিতে আমার মেয়ের মাধ্যমে তারা আমার ব্যক্তিগত মোবাইল নম্বর সংগ্রহ করে।

কিছুক্ষণ পর ০১৩৪৬৮৫৯৬৬৭ নম্বর থেকে ফোনে কল আসে। কলদাতা নিজেকে আবার চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের প্রতিনিধি পরিচয় দিয়ে জানায়, সরকার ‘অগ্রণী ব্যাংক’ বন্ধ করে দিচ্ছে এবং সব অ্যাকাউন্টের অর্থ গ্রাহকের নিজস্ব অ্যাকাউন্টে ফেরত দেয়া হচ্ছে। আমাকে বলা হয়, আমার অ্যাকাউন্ট নম্বর ও কার্ড তথ্য দিলে ওই অর্থ আমার অ্যাকাউন্টে স্থানান্তর করা হবে।

আমি তখন অফিসে দায়িত্বে থাকায় তাৎক্ষণিকভাবে অ্যাকাউন্ট তথ্য দিতে না পারলে তারা আমাকে দ্রুত বাসায় গিয়ে কার্ডের তথ্য পাঠাতে বলে। পরবর্তীতে আমি বাসায় ফিরে প্রাইম ব্যাংক ও সাউথ ইস্ট ব্যাংক অ্যাকাউন্টের কার্ড এবং চেকবইয়ের ছবি হোয়াটসঅ্যাপ ০১৩৪৬-৮৫৯৬৬৭-এ পাঠাই। তারা জানায়, ‘প্রসেসিং’ সম্পন্ন করতে আমার ফোনে যে ওটিপি কোডগুলো আসবে, তা তাদের জানাতে হবে। আমি বৃত্তির টাকা পাওয়ার আশায় সেই ওটিপি নম্বরগুলো সরল বিশ্বাসে তাদের জানাই। কিছু সময় পর তারা জানায়, আমার অ্যাকাউন্টে টাকা ঢুকছে না এবং অন্য অ্যাকাউন্ট থাকলে সেটির তথ্য দিতে বলে। এ পর্যায়ে আমার সন্দেহের সৃষ্টি হয়। কিন্তু ইত্যবসরে আমার অ্যাকাউন্ট থেকে ৬৭ হাজার টাকা অনলাইন ট্রান্সফারের মাধ্যমে হাতিয়ে নেয় প্রতারকচক্র।’

ঘটনা:৩

অতিসম্প্রতি রাত সোয়া ৮টা নাগাদ এই প্রতিবেদকের নম্বরে হোয়াটসঅ্যাপে কল আসে। অপর প্রান্ত থেকে বলা হয়- আমি ব্রিগেডিয়ার হাবিব বলছি। আপনি বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর প্রধানসহ উচ্চপদস্থ বিভিন্ন ব্যক্তি সম্পর্কে বিভিন্ন অশালীন মন্তব্য করে মেসেজ দিয়েছেন। বেঙ্গল-৫২ গ্রুপে আপনার নম্বর থেকে অশ্লীল সব মেসেজ দেয়া হচ্ছে।

মুঠোফোনে কলে এমন কথা শুনে রীতিমতো বিস্মিত এই প্রতিবেদক। এ সময় অপর প্রান্ত থেকে নানা প্রশ্নের উত্তর খোঁজা হয়। একপর্যায়ে ব্রিগেডিয়ার পরিচয় দেয়া ওই ব্যক্তি বলেন, ‘এই নম্বরটি আপনি ছাড়া অন্য কেউ কি ইউজ করেন? আমরা অশ্লীলতা ছড়ানোর বিষয়টি তদন্ত করছি। সেক্ষেত্রে আপনার সহযোগিতা লাগবে। আপনি আমার শেখানো মতে ধাপে ধাপে কিছু কাজ করতে হবে। একপর্যায়ে মোবাইলটি কিছুক্ষণের জন্য বন্ধ করে রাখার কথাও বলেন। কিন্তু সচেতনভাবে এই প্রতিবেদক ওই ‘ব্রিগেডিয়ারের’ কথামতো ধাপ অনুসরণ না করায় গালমন্দ শুনলেও এই যাত্রায় বেঁচে যাই।

ঘটনা:৪

ব্যবসায়ী কুতুবুল আলমের হোয়াটসঅ্যাপে একটি ম্যাসেজ আসে নিজের এক বন্ধু বিপদে থাকার কথা বলে। ২০ হাজার টাকা জরুরি সাহায্য চাওয়া হয়। দেয়া হয় একটি বিকাশ নম্বর। বন্ধুর বিপদে পাশে দাঁড়াতে গিয়ে তড়িঘড়ি পাঠিয়ে দেন ২০ হাজার টাকা। কিন্তু পরে ওই বন্ধুর সাথে যোগাযোগের পর জানতে পারেন একই কায়দায় মোবাইল হ্যাক করে ওই ম্যাসেজ পাঠিয়েছিল প্রতারক চক্র।

চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের (সিএমপি) অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস) মুহাম্মদ ফয়সাল আহম্মেদ নয়া দিগন্তকে বলেন, আমরা এ সংক্রান্ত অভিযোগ পেলে কাউন্টার টেররিজম ইউনিটের কাছে সে বিষয়ে ব্যবস্থা নেয়ার জন্য পাঠিয়ে দিই। এ ধরনের ঘটনা ঘটলেই থানায় জিডি বা মামলার মাধ্যমে প্রতিকার পেতে পারেন।

সিএমপির কাউন্টার টেররিজম ইউনিটের উপ-পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ বদিউজ্জামান নয়া দিগন্তকে বলেন, আমাদের কাছে অভিযোগ এলেই আমরা ব্যবস্থা নিচ্ছি। এটা আমাদের নিয়মিত কাজেরই অংশ।

তবে মানবাধিকার নিয়ে কাজ সিনিয়র আইনজীবী অ্যাডভোকেট এ এম জিয়া হাবিব আহসানের অভিযোগ সুনির্দিষ্ট তথ্য দিয়ে থানায় অভিযোগ করার পরও এ ধরনের প্রতারণার মামলাগুলোর তদন্ত এগোয়না। তিনি বলেন, ওটিপি সংগ্রহ করে প্রতারিত ব্যক্তির অ্যাকাউন্ট থেকে কোন অ্যাকাউন্টে প্রতারকরা টাকা স্থানান্তর করেছে সুনির্দিষ্ট তথ্য থাকার পরও কোনো ব্যবস্থা নেই। মনে হচ্ছে যেন এসব প্রতারকদেরকে জনসাধারণকে প্রতারিত করার জন্য স্বাধীনতা দেয়া হয়েছে। একই সাথে তিনি মোবাইলের বা ব্যক্তিগত কোনো তথ্য কারো সাথে শেয়ার না করতে জনসাধারণের প্রতি আহ্বান জানান।