এস আলমের অর্থ লুটে অসহায় ব্যাংকার ও গ্রাহকরা

এসআইবিএলের মামলায় ৪ ভাইবোনের গ্রেফতারি পরোয়ানা

আশরাফুল ইসলাম
Printed Edition

দেশের ব্যাংক খাত থেকে রাষ্ট্রযন্ত্র ব্যবহার করে প্রায় চার লাখ কোটি টাকা বের করে নিয়েছিলেন এস আলম। কিন্তু এসব অর্থ এখন আর তিনি ফেরত দিচ্ছেন না। এমনকি তার সাথে যোগাযোগও করা যাচ্ছে না। কোন দেশে পালিয়ে আছেন তারও কোনো খোঁজ মিলছে না। এমনি পরিস্থিতিতে বেকায়দায় পড়েছে এস আলমের এক সময়ে দখলে থাকা আটটি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান। ব্যাংকগুলো গ্রাহকদের টাকা ফেরত দিতে পারছে না। এতে গ্রাহক অসন্তোষ দিন দিন বেড়ে যাচ্ছে। দীর্ঘ আট মাস হলো অনেকেই টাকা ফেরত না পাওয়ায় হতাশ হয়ে পড়েছেন। এমনি পরিস্থিতিতে পলাতক এস আলম ও তার তিন ভাইবোনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেছে সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক। গতকাল ব্যাংকটির মামলায় চার ভাইবোনের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেছেন আদালত।

গতকাল ঢাকা মেট্রোপলিটন আদালত থেকে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করা হয়েছে সাইফুল আলম ওরফে এস আলম, তার ভাই ওসমান গণি, আরেক ভাই আব্দুস সামাদ ও বোন হালিমা বেগমের নামে। তারা সবাই এস আলম কোল্ড রোল্ড স্টিলের চেয়ারম্যান, এমডি ও পরিচালক। ১৪০ কোটি ৪৫ লাখ টাকার চেক ডিজঅনার মামলায় তাদের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেছেন আদালত।

বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রাথমিক হিসেবে এস আলমের নামে দুই লাখ ২৫ হাজার কোটি টাকা ব্যাংক থেকে নামে বেনামে বের করার প্রমাণ পেয়েছে। আরো অধিকতর তদন্ত করা হচ্ছে। তবে, চূড়ান্ত হিসাবে চার লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে জানা গেছে।

গতকাল ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকের একজন গ্রাহক নয়া দিগন্তকে জানিয়েছেন. দীর্ঘ ১০ বছর তার স্ত্রী মাসিক সঞ্চয় স্কিমে টাকা জমা করেছিলেন। মুনাফাসহ আসলের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ছয় লাখ ৮০ হাজার টাকা। কিন্তু ব্যাংক থেকে টাকা উত্তোলন করতে গেলে বলা হয় প্রতিদিন ১০ হাজার করে টাকা দেয়া হবে। এ নিয়ে তিনি হতাশা ব্যক্ত করে বলেন, এক সময়ে কত ভালো ব্যাংক ছিল ফার্স্ট সিকিউরিটি ব্যাংক। কিন্তু এস আলম দখলে নিয়েই ব্যাংক থেকে হরিলুট করেছেন। এখন ব্যাংক গ্রাহকের অর্থ ফেরত দিতে পারছেন না। তিনি জানান, অনেক অসহায় গ্রাহক দিনের পর দিন ব্যাংকে ধরনা দিচ্ছেন টাকা ফেরত পাওয়ার জন্য। কিন্তু ব্যাংক টাকা ফেরত দিতে পারছে না। এতে অনেকেই ক্ষুব্ধ হয়ে ব্যাংকারদের বকাঝকা করছেন। কিন্তু জীবন জীবিকার তাগিদে ব্যাংকাররা গ্রাহকদের খারাপ আচরণ সহ্য করছেন। ব্যাংকার ও গ্রাহক উভয়ই এখন অসহায় হয়ে পড়েছেন।

এস আলমের এক সময়ের মালিকানাধীন একটি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক গতকাল নয়া দিগন্তকে জানিয়েছেন, এস আলমের ঋণ নিয়ে তারা মহাবিপাকে পড়ে গেছেন। ধূর্ত এস আলম ধরা দিচ্ছেন না। দেশে থাকা যেসব স্থাবর, অস্থাবর সম্পদ রয়েছে তার বাজার মূল্য দেশের ব্যাংক খাত থেকে লুট করা অর্থের তুলনায় যৎসামান্য। বলা চলে ২০ ভাগের এক ভাগও না। নানাভাবে এস আলম বা তাদের প্রতিনিধিদের সাথে যোগাযোগ করার চেষ্টা করা হচ্ছে। এসব ঋণ আগামী জুনের মধ্যেই খেলাপি করতে হবে। আর খেলাপি করা হলে ব্যাংকগুলোর প্রভিশন ঘাটতি ভয়াবহ পর্যায়ে পৌঁছাবে। এ কারণেই লুটের কিছু টাকা যদি ফেরত পাওয়া যেত তাহলে ব্যাংকও বাঁচতো, গ্রাহকদেরও কোনো মতে বুঝ দেয়া যেত। কিন্তু কোনো কিছুতেই সাড়া মিলছে না এস আলমের।

ইউনিয়ন ব্যাংকের এক কর্মকর্তা গতকাল নয়া দিগন্তকে জানিয়েছেন, ব্যাংক থেকে যেভাবে অর্থ বের করে নেয়া হয়েছে তা বলা চলে বিশ্বে আর এমনটা কখনো ঘটেনি। ভুয়া পে-অর্ডার জমা দিয়ে তার বিপরীতে নামে বেনামে অর্থ বের করে নিয়েছে। ব্যাংকটির আটাশ হাজার কোটি টাকার ঋণের প্রায় ৯৭ ভাগই নিয়ে গেছে এস আলম ও তার দোসরা। একইভাবে ফার্স্ট সিকিউরিটি ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংক, সাবেক রিলায়েন্স যা বর্তমান আভিভা ফাইন্যান্স নামে পরিচিত আর্থিক প্রতিষ্ঠানের অবস্থা খুবই নাজুক। শুধু ইসলামী ব্যাংক গ্রাহকদের অর্থ ফেরত দিতে পারছে তাদের আস্থাশীল গ্রাহক থাকার কারণে। যদিও ৭ ব্যাংক থেকে যে অর্থ নিয়েছে তার চেয়ে বেশি অর্থ বের করে নেয়া হয়েছে ইসলামী ব্যাংক থেকে প্রায় ১ লাখ ১৭ হাজার কোটি টাকা।

এদিকে বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক থেকে নামে-বেনামে বের করে নেয়া হয়েছে প্রায় ১৪ হাজার কোটি টাকা। তবে ব্যাংকের প্রাথমিক হিসাবে এর পরিমাণ ৬ হাজার ৮০০ কোটি টাকা। এ অর্থ আদায়ে জোর প্রচেষ্টা চলানো হচ্ছে। বেশির ভাগ অর্থই নেয়া হয়েছে ভুয়া জামানত দিয়ে, অথবা ঋণের বিপরীতে যৎসামান্য জামানত দিয়ে। ব্যাংক সূত্র জানিয়েছে, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক থেকে নামে-বেনামে যে পরিমাণ ঋণ নেয়া হয়েছিল তার বড় একটি অংশের বিপরীতে ১৪০ কোটি ৪৫ লাখ টাকার পে-অর্ডার জমা ছিল। কিন্তু এস আলমের কোনো খোঁজ না মেলায় তাদের চারভাই বোনের নামে অর্থঋণ আদালতে মামলা দায়ের করা হয়েছিল। মামলায় হাজিরা না দেয়ায় তার বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেছেন আদালত। এ বিষয়ে ব্যাংকটির একজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, মূলত টাকা আদায়ের জোর প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে এস আলমের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়েছে। তবে তিনি জানান, এসআইবিলের অবস্থা কিছুটা উন্নতি হচ্ছে। গ্রাহকদের কিছু কিছু করে অর্থ ফেরত দিতে পারছেন। তবে ধূর্ত এস আলম ধরা দিলে বা ঋণ পরিশোধে এগিয়ে আসলে ব্যাংক গ্রাহক উভয়ের জন্যই ভালো হতো। এখন দেখা যাক এস আলম কি করেন।