হ্যাটট্রিক সিরিজ জয় মিরাজ বাহিনীর
Printed Edition
ক্রীড়া প্রতিবেদক
ঘরের মাঠে সবশেষ দুই সিরিজেই জয় পেয়েছে বাংলাদেশ ২-১ ব্যবধানে ওয়েস্ট ইন্ডিজ ও পাকিস্তানের বিপ।ে এবার অধিনায়ক মেহেদী হাসান মিরাজের মিশনটা ছিল সিরিজ জয়ের হ্যাটট্রিক পূর্ণ করা। আর সেই ল্য পূরণে সামনে ছিল নিউজিল্যান্ড। মিরাজের নেতৃত্বে টানা তিনটি ওয়ানডে সিরিজ জিতল বাংলাদেশ। পঞ্চম অধিনায়ক হিসেবে টানা তিনটি সিরিজ জিতলেন এই অলরাউন্ডার। আগের চারজন হলেনÑ হাবিবুল বাশার, সাকিব আল হাসান, মাশরাফি বিন মর্তুজা (দু’বার) ও তামিম ইকবাল।
চাপের মুখে মহাকাব্যিক এক পার্টনারশিপে দলকে উদ্ধারই শুধু করলেন না, নাজমুল হাসান শান্ত ও লিটন দাস দলকে দিয়েছেন জয়ের স্বপ্নও। চট্টগ্রামে সিরিজ নির্ধারণী তৃতীয় ওয়ানডেতে নিউজিল্যান্ডকে ২৬৬ রানের ল্য ছুড়ে দিয়েছে বাংলাদেশ। আর এর পেছনে অবদান লিটন ও শান্তর, যারা ৩২ রানে ৩ উইকেট পতনের পর দৃঢ় হাতে কিউইদের মোকাবেলা করে, গড়েছেন অনবদ্য এক পার্টনারশিপ। এরপর মোস্তাফিজ-নাহিদ-মিরাজের বোলিং তোপ ও ঘূর্ণিতে ২১০ রানে অলআউট হলে ৩১ বল হাতে রেখেই ৫৫ রানের জয় পায় বাংলাদেশ। নাজমুল হোসেন শান্ত হলেন ম্যাচ সেরা। নাহিদ রানা হলেন সিরিজ সেরা।
২০ ইনিংস পর চতুর্থ ওয়ানডে সেঞ্চুরি পেলেন নাজমুল হোসেন শান্ত। আর আন্তর্জাতিক ওয়ানডেতে ১৯ ইনিংস এবং দীর্ঘ ৯১৭ দিনের অপোর পর অবশেষে ফিফটির দেখা পেলেন লিটন দাস। এর আগে সর্বশেষ ২০২৩ বিশ্বকাপে ভারতের বিপে ফিফটি করেছিলেন তিনি। এরপর অফফর্মের কারণে দল থেকে বাদ পড়লেও গতকাল কিউইদের বিপে ৭৬ রানের সময়োপযোগী ইনিংস খেলে ফর্মে ফেরার রাজকীয় ঘোষণা দিলেন এই অভিজ্ঞ উইকেটকিপার কাম ব্যাটার।
সাগরিকা খ্যাত বীরশ্রেষ্ঠ ফাইট লেফটেন্যান্ট মতিউর রহমান স্টেডিয়ামে তিন ওয়ানডের প্রতিটিতেই টস জিতল সফরকারী নিউজিল্যান্ড। আগের দুই ম্যাচে আগে ব্যাটিং নিলেও এবার ব্যাটিং দিলেন বাংলাদেশকে। সাইফ হাসান ও তানজিদ হাসান তামিমের ওপেনিং জুটি ভেঙে যায় স্কোর বোর্ডে কোনো রান জড়ো করার আগেই। ২ বল মোকাবেলা করে সাইফ রানের খাতা খুলতে পারেননি। তামিম পাঁচ বল মোকাবেলা করে ১ রান নিয়ে যখন সাজঘরে ফিরছেন, দলীয় রান তখনো দুই অঙ্ক ছুঁতে পারেনি।
সৌম্য সরকারের জন্য ছিল কামব্যাকের গল্প লেখার মোম সুযোগ। তবে অভিজ্ঞ এই ক্রিকেটার ২৬ বলে ১৮ রান করে উইল ও’রুকির তৃতীয় শিকারে পরিণত হলে থামে সম্ভাবনাময় ইনিংস। মাত্র ৩২ রানে ৩ উইকেট হারিয়ে স্বাগতিক দল যখন দিশেহারা, তখন ত্রাতা হয়ে আবির্ভাব শান্ত ও লিটনের ১৬০ রানের পার্টনারশিপ। দুর্দান্ত এই জুটি ভাঙে ৯১ বলে ৩টি চার ও ১টি ছক্কায় ৭৬ রান করা লিটন বিদায় নিলে। লিটন দৌড়েই নিয়েছেন ৫৮ রান। তার সমর্থন কাজে লাগিয়ে শান্ত এগিয়ে যান শতকের পথে। এই জুটি ভাঙতে ১৭৮ বল লড়াই করতে হয়েছে কিউইদের।
সেঞ্চুরির দেখা পেয়েও যান শান্ত। তবে এর পরপরই থামতে হয়। বিদায় নেয়ার আগে ১১৯ বলে করেন ১০৫ রান, হাঁকান ৯টি চার ও ২টি ছক্কা। শান্ত বিদায় নিলেও ততণে দল চলে গেছে ভালো অবস্থানে। তৌহিদ হৃদয়, মেহেদী হাসান মিরাজরা স্বাচ্ছন্দ্যেই দিতে পেরেছেন ফিনিশিং। অধিনায়ক মিরাজ ১৮ বলে ২২ রান করে সাজঘরে ফিরলেও হৃদয় ২৯ বলে ৩৩ রান করে অপরাজিত থেকে মাঠ ছাড়েন। নির্ধারিত ৫০ ওভার শেষে ৮ উইকেট হারিয়ে ২৬৫ রান দাঁড়ায় বাংলাদেশের সংগ্রহ।
জবাবে ব্যাট করতে নেমে নিউজিল্যান্ড শুরুতেই ধাক্কা খায়। আর সেই ধাক্কার নাম মোস্তাফিজুর রহমান। ইনিংসের চতুর্থ ওভারেই হেনরি নিকোলসকে ফিরিয়ে কিউইদের ব্যাটিং লাইনআপে ফাটল ধরান এই বাঁ হাতি পেসার। ধারাবাহিক আঘাতে নিউজিল্যান্ডকে কখনোই ম্যাচে ফিরতে দেননি তিনি। তার নিখুঁত লাইন-লেন্থ আর বৈচিত্র্যময় কাটার যেন ব্যাটারদের জন্য ধাঁধা হয়ে দাঁড়ায়।
মাঝে নিক কেলি ও ডিন ফক্সক্রফটের কিছুটা প্রতিরোধ গড়ে উঠলেও তা ছিল ণস্থায়ী। কেলি ৫৯ রান করে বিদায় নেন, আর ফক্সক্রফটের ৭৫ রানের ইনিংস কেবল ব্যবধানই কমাতে পারে। দলগতভাবে দৃঢ় কোনো জুটি গড়ে ওঠেনি, আর সেখানেই ম্যাচ হারে সফরকারীরা। ১৬০ রানে ৯ উইকেট পতনের পরও এত দূর যাওয়ার কথা ছিল না সফরকারীদের। শেষ দিকে অবিশ্বাস্য কিছু করার চেষ্টা করেছিলেন ডিন ফক্সক্রফট। ঝড়ো ব্যাটিংয়ে ব্যবধান কমাচ্ছিলেন। মিরাজ তার একটি ক্যাচ মিস করলে শেষ পর্যন্ত তাকে ৭৫ রানে থামিয়েছেন মিরাজ। তার ৭২ বলের ইনিংসে ছিল ৭টি ছক্কা।
শেষ পর্যন্ত ৪৪.৫ ওভারে ২১০ রানে অলআউট হয় নিউজিল্যান্ড। মোস্তাফিজ একাই তুলে নেন ৫ উইকেটÑ তার ওয়ানডে ক্যারিয়ারের ষষ্ঠ ফাইফার। তার এই বোলিং নৈপুণ্যই ম্যাচের ভাগ্য নির্ধারণ করে দেয়। ৫৫ রানের এই জয় শুধু একটি ম্যাচ জেতা নয়; এটি ছিল একটি শক্ত প্রত্যাবর্তনের প্রতীক। সিরিজের প্রথম ম্যাচ হারের পর যেভাবে ঘুরে দাঁড়িয়েছে বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দল, তা তাদের মানসিক দৃঢ়তার প্রমাণ। ২-১ ব্যবধানে সিরিজ জয়ে ঘরের মাঠে টানা তৃতীয় সিরিজ নিজেদের করে নেয় মেহেদী হাসান মিরাজের দল।
সংক্ষিপ্ত স্কোর :
বাংলাদেশ : ২৬৫/৮ (হৃদয় ৩৩*, মোস্তাফিজ ৩*, সাইফ ০, তানজিদ ১, সৌম্য ১৮, লিটন ৭৬, শান্ত ১০৫, মিরাজ ২২, শরিফুল ১, তানভীর ০, রুকি ৩/৩২, লিস্টার ২/৬২, লেনক্স ২/৫০, ফক্সক্রফট ১/৩৫)।
নিউজিল্যান্ড : ৪৪.৫ ওভারে ২১০/১০ (লিস্টার ২*; নিকোলস ৪, ইয়াং ১৯, ল্যাথাম ৫, কেলি ৫৯, আব্বাস ২৫, কার্কসন ৬, স্মিথ ২, লেনক্স ২, ও’রুর্ক ১, ফক্সক্রফট ৭৫, শরীফুল ১/১৯, মোস্তাফিজ ৫/৪৫, নাহিদ রানা ২/৩৭, মিরাজ ২/৩৬, তানভীর ০/৭০)।
ফল : বাংলাদেশ ৫৫ রানে জয়ী
ম্যাচ সেরা : নাজমুল হোসেন শান্ত।
সিরিজ সেরা : নাহিদ রানা।
সিরিজ : ২-১ এ সিরিজ জয় বাংলাদেশের।