বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ অপরিবর্তিত রেখে নতুন মুদ্রানীতি ঘোষণা আজ
Printed Edition
বিশেষ সংবাদদাতা
নতুন অর্থবছর ২০২৬-২৭-এর প্রথমার্ধের (জুলাই-ডিসেম্বর) জন্য আজ মঙ্গলবার নতুন মুদ্রানীতি ঘোষণা করতে যাচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংক। বিএনপি নেতৃত্বাধীন নবগঠিত সরকারের অধীনে এটিই হবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রথম মুদ্রানীতি। অর্থনীতির বর্তমান বাস্তবতায় মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়েই এবারো নীতি সুদহার (রেপো রেট) ১০ শতাংশে অপরিবর্তিত রাখা হতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন। একই সাথে দীর্ঘদিন ধরে স্থবির হয়ে থাকা বেসরকারি খাতের ঋণপ্রবাহ বাড়াতে এবং উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগ উৎসাহিত করতে কিছু লক্ষ্যভিত্তিক উদ্যোগেরও ঘোষণা আসতে পারে।
সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, গত প্রায় দুই বছর ধরে উচ্চ মূল্যস্ফীতির চাপ মোকাবেলায় বাংলাদেশ ব্যাংক ধারাবাহিকভাবে সঙ্কোচনমূলক মুদ্রানীতি অনুসরণ করে আসছে। বাজারে অতিরিক্ত তারল্য কমানো, ঋণের চাহিদা নিয়ন্ত্রণ এবং মূল্যস্ফীতির ওপর চাপ কমাতে ধাপে ধাপে নীতি সুদহার বাড়িয়ে ২০২৪ সালের অক্টোবরে ১০ শতাংশে উন্নীত করা হয়। এর পর থেকে একই অবস্থান বজায় রয়েছে। যদিও সাম্প্রতিক মাসগুলোতে মূল্যস্ফীতি দুই অঙ্কের ঘর থেকে কিছুটা নেমে এসেছে, তবুও তা এখনো কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাক্সিক্ষত লক্ষ্যমাত্রার অনেক ওপরে অবস্থান করছে। গত মে মাসে পয়েন্ট-টু-পয়েন্ট মূল্যস্ফীতি ছিল ৯ দশমিক ৪২ শতাংশ, আর ১২ মাসের গড় মূল্যস্ফীতি ৮ দশমিক ৬ শতাংশের বেশি। ফলে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কঠোর অবস্থান থেকে আপাতত সরে আসার সুযোগ দেখছেন না নীতিনির্ধারকরা। তবে নতুন মুদ্রানীতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হতে পারে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে নতুন গতি ফিরিয়ে আনার চেষ্টা। দীর্ঘদিন ধরে উচ্চ সুদের হার, ব্যবসায়িক অনিশ্চয়তা এবং ব্যাংকগুলোর সতর্ক ঋণনীতির কারণে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। এতে নতুন বিনিয়োগ, শিল্প সম্প্রসারণ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির গতি মন্থর হয়ে পড়েছে।
এ পরিস্থিতিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক উৎপাদনশীল খাতের জন্য বিশেষ পুনঃঅর্থায়ন স্কিম, লক্ষ্যভিত্তিক তারল্য সহায়তা এবং খাতভিত্তিক প্রণোদনার মতো ব্যবস্থা নিতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, এসব উদ্যোগের মাধ্যমে বাজারে অতিরিক্ত অর্থ সরবরাহ না করেও শিল্প, কৃষি, রফতানি ও ক্ষুদ্র-মাঝারি উদ্যোক্তাদের অর্থায়ন সহজ করা সম্ভব হবে। একই সাথে ব্যাংকগুলোর ঋণ ও আমানতের সুদের হারের ব্যবধান বা স্প্রেডের ওপর আবার সর্বোচ্চ ৪ শতাংশের সীমা আরোপের বিষয়টিও গুরুত্ব পাচ্ছে। ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, নীতি সুদহার স্থিতিশীল থাকলেও অনেক ব্যাংক এখনাে উচ্চ সুদে ঋণ দিচ্ছে, যার ফলে উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে। স্প্রেড সীমিত করা গেলে ঋণের খরচ কিছুটা কমবে এবং বিনিয়োগে ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
অর্থনীতিবিদরা অবশ্য মনে করছেন, শুধু মুদ্রানীতি দিয়ে বর্তমান মূল্যস্ফীতির সমস্যা পুরোপুরি সমাধান করা সম্ভব নয়। কারণ বাংলাদেশের মূল্যস্ফীতির বড় অংশই সরবরাহ ব্যবস্থার দুর্বলতা, আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি, টাকার অবমূল্যায়ন এবং বাজার ব্যবস্থাপনার সীমাবদ্ধতার সাথে জড়িত।
ব্যাংকারদেরও অভিমত, মূল্যস্ফীতির চাপ পুরোপুরি না কমা পর্যন্ত কেন্দ্রীয় ব্যাংক নীতি সুদহার কমানোর ঝুঁকি নেবে না। তবে অর্থনীতির গতি ফিরিয়ে আনতে নির্বাচিত খাতে অর্থায়ন সহজ করার পদক্ষেপ নেয়া হতে পারে। নতুন অর্থবছরে সরকার প্রবৃদ্ধি ও কর্মসংস্থান বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে। সেই লক্ষ্য বাস্তবায়নে বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন মুদ্রানীতিতে এক দিকে যেমন মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কঠোর অবস্থান বজায় থাকবে, অন্য দিকে উৎপাদনশীল খাতে লক্ষ্যভিত্তিক তারল্য সহায়তা, বিনিয়োগবান্ধব অর্থায়ন এবং ঋণের ব্যয় কমানোর উদ্যোগের মাধ্যমে অর্থনীতিতে ভারসাম্য আনার চেষ্টা করা হবে বলে আশা করা হচ্ছে।