বিবিসির বিশ্লেষণে ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কের ৫ ব্যারোমিটার
Printed Edition
নয়া দিগন্ত ডেস্ক
অন্তর্বর্তী সরকারের দেড় বছরের শাসনামলে প্রতিবেশী ভারতের সাথে বাংলাদেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে যে এক ধরনের স্থবিরতা বা শীতলতা বিরাজ করছিল, সাম্প্রতিক সময়ে তাতে পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেখা যাচ্ছে। গত ১২ ফেব্রুয়ারির সাধারণ নির্বাচন আন্তর্জাতিক মহলে গ্রহণযোগ্যতা পাওয়ার পর, দুই-তৃতীয়াংশের বেশি সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে বিএনপি সরকার গঠন করেছে। এর ফলে দীর্ঘদিনের ‘পজ’ বা বিরতির অবসান ঘটিয়ে দিল্লি আবার ঢাকার সাথে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার দিকে এগোচ্ছে-এমন আভাস পাওয়া যাচ্ছে বিভিন্ন কূটনৈতিক সূত্রে।
একসময় বিএনপির সাথে ভারতের সম্পর্ক অস্বস্তিকর হিসেবে বিবেচিত হলেও, বর্তমান প্রেক্ষাপটে সেই অতীত যেন বড় বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে না। বরং বরফ গলার এই মুহূর্তে প্রশ্ন উঠছে-নতুন করে শুরু হওয়া এই সম্পর্ক কি শেষ পর্যন্ত প্রত্যাশিত গন্তব্যে পৌঁছাবে?
বাস্তবতা হলো, বাংলাদেশ ও ভারতের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে উভয় পক্ষেরই গভীর স্বার্থ জড়িত। একইসাথে দুই দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও একে অপরের প্রভাব সুস্পষ্ট। বাংলাদেশের রাজনীতিতে যেমন ‘ইন্ডিয়া ফ্যাক্টর’ গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি ভারতের পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোতেও বাংলাদেশ একটি প্রাসঙ্গিক রাজনৈতিক ইস্যু। ফলে অর্থনৈতিক বাস্তবতা নাকি অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক চাপ, কোনটি সম্পর্ক নির্ধারণে বেশি ভূমিকা রাখবে, সেটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হয়ে উঠেছে।
এই প্রেক্ষাপটে বিবিসি বাংলার বিশ্লেষণে ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ ‘ব্যারোমিটার’ বা সূচক চিহ্নিত করা হয়েছে।
১. ভিসা কার্যক্রম স্বাভাবিক হবে কি?
বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরেই ভারতের জন্য অন্যতম বৃহৎ পর্যটক উৎস। কোভিড-পূর্ব সময়ে প্রতি বছর প্রায় ২০ লাখ বাংলাদেশী চিকিৎসা, পর্যটন, ব্যবসা বা কেনাকাটার উদ্দেশ্যে ভারতে যেতেন।
কিন্তু ২০২৪ সালের আগস্টে ভারত বাংলাদেশে তাদের ভিসাকার্যক্রম কার্যত বন্ধ করে দিলে সেই প্রবাহ হঠাৎ করেই থেমে যায়। গত দেড় বছরে কেবল জরুরি ও চিকিৎসা ভিসা এবং সীমিত আকারে ডাবল এন্ট্রি ভিসা দেয়া হয়েছে।
তবে সম্প্রতি ঢাকায় নিযুক্ত ভারতীয় কূটনীতিকরা ইঙ্গিত দিয়েছেন, ধীরে ধীরে ভিসাকার্যক্রম স্বাভাবিক করা হবে, এমনকি পর্যটন ভিসাও আবার চালু হতে পারে। যদি তা বাস্তবে রূপ নেয়, তাহলে এটি হবে সম্পর্ক উষ্ণ হওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ সঙ্কেত।
২. প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রথম বিদেশ সফর
নতুন সরকারপ্রধানের প্রথম বিদেশ সফরের গন্তব্য একটি দেশের কূটনৈতিক অগ্রাধিকারের স্পষ্ট বার্তা দেয়। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তার প্রথম দ্বিপক্ষীয় সফরে কোন দেশকে বেছে নেন, সেটি তাই বিশেষ গুরুত্ব বহন করে।
যদি তার প্রথম সফর দিল্লিতে হয়, তাহলে এটি হবে ভারতের সাথে সম্পর্ক পুনর্গঠনের স্পষ্ট ইঙ্গিত। অন্যদিকে সৌদি আরব, চীন, যুক্তরাষ্ট্র বা আঞ্চলিক অন্য কোনো দেশে সফর করলেও সেটি ভিন্ন বার্তা বহন করবে।
অন্য একটি সম্ভাবনা হলো-তিনি নিজে আগে না গিয়ে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে বাংলাদেশ সফরে আমন্ত্রণ জানাতে পারেন। সে ক্ষেত্রে মোদি যদি নতুন সরকারের প্রথম উচ্চপর্যায়ের অতিথি হন, সেটিও অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ হবে।
উল্লেখ্য, নির্বাচনের ফল ঘোষণার পর মোদি ও তারেক রহমানের মধ্যে টেলিফোনে কথা হয়েছে, যদিও সম্ভাব্য সফর নিয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা এখনো আসেনি।
৩. ভারতীয় ক্রিকেট দলের বাংলাদেশ সফর
রাজনীতির প্রভাব যে ক্রীড়াক্ষেত্রেও পড়ে, তার বড় উদাহরণ ভারতীয় ক্রিকেট দলের বাংলাদেশ সফর স্থগিত হওয়া। ২০২৫ সালের আগস্টে নির্ধারিত তিনটি ওয়ানডে ও তিনটি টি-টোয়েন্টি ম্যাচের সিরিজ শেষ মুহূর্তে বাতিল করা হয়।
ভারতের ক্রিকেট বোর্ড বিসিসিআই তখন ‘অনিবার্য কারণ’ দেখালেও, এটি যে রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত ছিল তা অনেকটাই প্রকাশ্য গোপন বিষয়।
পরবর্তীতে এই সফর ২০২৬ সালের জুনে আয়োজনের প্রস্তাব দেয়া হয়। এখন প্রশ্ন- সেই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন হবে কি না?
এদিকে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় ক্রিকেট ঘিরে দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনাও তৈরি হয়েছিল। মোস্তাফিজকে আইপিএলের দল থেকে বাদ দেয়ার বিতর্ক এবং বিশ্বকাপে অংশগ্রহণ না করার সিদ্ধান্ত সম্পর্ককে আরো তিক্ত করে তোলে।
তাই ভারত যদি পুনর্নির্ধারিত সফরটি বাস্তবায়ন করে, সেটি হবে সম্পর্কের ইতিবাচক অগ্রগতির একটি শক্ত বার্তা।
৪. কানেক্টিভিটি প্রকল্পের অগ্রগতি
গত দেড় বছরে বাংলাদেশ-ভারত যোগাযোগ ব্যবস্থায় বড় ধরনের স্থবিরতা দেখা গেছে। কলকাতা-ঢাকা মৈত্রী এক্সপ্রেস, বন্ধন এক্সপ্রেস, মিতালি এক্সপ্রেসসহ সব যাত্রীবাহী ট্রেন চলাচল বন্ধ রয়েছে ২০২৪ সালের জুলাই থেকে।
আন্তর্জাতিক বাস পরিষেবাও বন্ধ ছিল, যদিও সম্প্রতি আগরতলা-ঢাকা রুটে সীমিত পরিসরে বাস চলাচল শুরু হয়েছে।
দুই দেশের জনগণের মধ্যে যোগাযোগ বৃদ্ধির জন্য এসব সংযোগ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে আগরতলা-আখাউড়া রেলসংযোগ প্রকল্পকে ভারত তার উত্তর-পূর্বাঞ্চলের জন্য ‘গেমচেঞ্জার’ হিসেবে বিবেচনা করে।
এই প্রকল্পের অধিকাংশ কাজ শেষ হলেও সামান্য অংশ এখনো বাকি। নতুন সরকারের আমলে এটি দ্রুত সম্পন্ন হলে তা দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের অগ্রগতির স্পষ্ট ইঙ্গিত দেবে।
৫. গঙ্গা পানি চুক্তির নবায়ন
১৯৯৬ সালে স্বাক্ষরিত গঙ্গা পানি বণ্টন চুক্তির মেয়াদ শেষ হচ্ছে ২০২৬ সালের ডিসেম্বরে। এই চুক্তি নবায়ন এখন দুই দেশের জন্য একটি বড় কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জ।
বর্তমানে কেবল প্রযুক্তিগত পর্যায়ের আলোচনা চলছে, কিন্তু রাজনৈতিক পর্যায়ের সিদ্ধান্ত এখনো হয়নি। অথচ সময়মতো চুক্তি নবায়ন না হলে পানি বণ্টন নিয়ে বড় ধরনের জটিলতা তৈরি হতে পারে।
এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ সরকার এবং নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বাধীন ভারতের সরকারের মধ্যে দ্রুত উচ্চপর্যায়ের আলোচনা শুরু হলে তা হবে ইতিবাচক সঙ্কেত।
এ ছাড়া পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতি বিশেষ করে তৃণমূল কংগ্রেসের অবস্থান-এই আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে, কারণ রাজ্যটির স্বার্থ এই চুক্তির সাথে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত।
বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্ক সবসময়ই বহুমাত্রিক-রাজনীতি, অর্থনীতি, নিরাপত্তা ও জনসম্পর্ক-সবকিছু মিলিয়ে এটি একটি জটিল সমীকরণ। বর্তমানে বরফ গলার যে ইঙ্গিত দেখা যাচ্ছে, তা বাস্তবে কতটা গভীরে পৌঁছাবে, সেটিই এখন মূল প্রশ্ন।
ভিসানীতি, উচ্চপর্যায়ের সফর, ক্রীড়া কূটনীতি, কানেক্টিভিটি ও পানি বণ্টন- এই পাঁচটি সূচকই আগামী দিনে ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কের গতিপথ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। এসব ক্ষেত্রে ইতিবাচক অগ্রগতি হলে দুই দেশের সম্পর্ক নতুন করে শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড়াতে পারে; আর ব্যর্থ হলে শীতলতা আবারো ফিরে আসার ঝুঁকি থেকেই যাবে।