বিদায়ী বছরে সাহিত্যাঙ্গনে হারানো বিশিষ্টজনরা

সালতামামি

Printed Edition

আবুল কালাম

আর একদিন পর বিদায় নেবে, ’২৫ সাল। ভোরের নতুন সূর্য উদয়ের সাথে সূচনা হবে নতুন বছরের। সে সাথে বিদায়ী বছরের বিশিষ্টজনদের চলে যাওয়া আনন্দ বেদনার কাব্য হয়ে সাহিত্যাঙ্গনে স্মরণীয় থাকবে।

চলতি বছরে সাহিত্যাঙ্গন থেকে চিরবিদায় নিয়েছেন অনেক কবি, লেখক, গবেষক ও বুদ্ধিজীবী। তার মধ্যে রয়েছেন ড. আ জ ম ওবায়েদুল্লাহ, আব্দুল কুদ্দুস ফরিদী, ছড়াকার আশরাফুল মান্নান, দাউদ হায়দার, সন্জীদা খাতুন, যতীন সরকার, বদরুদ্দীন উমর, শ্বেতা শতাব্দী এষ ও রকিব হাসান।

ড. আ জ ম ওবায়েদুল্লাহ ১০ মে দিবাগত রাত ১টার দিকে চট্টগ্রাম নগরের একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। ড. ওবায়েদুল্লাহর জন্ম ভোলার চরফ্যাসনে। পড়াশোনা করেছেন চট্টগ্রাম ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। এ ছাড়াও কমনওয়েলথ এক্সিকিউটিভ এমবিএ ডিগ্রিও অর্জন করেন তিনি। সাহিত্য ও সংস্কৃতির পৃষ্ঠপোষক হিসেবে তার ভূমিকা ছিল উল্লেখযোগ্য। কর্মজীবনে তিনি বাংলাদেশ শিশুকল্যাণ পরিষদের ভাইস চেয়ারম্যান ছিলেন। পাশাপাশি বয়েজ স্কাউট ও রেড ক্রিসেন্টসহ নানা সংগঠনে যুক্ত থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন।

মোটিভেশনাল স্পিকার হিসেবে পরিচিত, আ জ ম ওবায়েদুল্লাহ পেশাগত জীবনে সাহিত্য-সংস্কৃতির পৃষ্ঠপোষক ছিলেন। তিনি মাসিক অঙ্গীকার ডাইজেস্টের সম্পাদক এবং হুইল বিজনেস ম্যাগাজিনের প্রধান সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। তার রচিত জনপ্রিয় দু’টি বই হলো, ‘তরুণ তোমার জন্য’ ও ‘স্বপ্নের ঠিকানা’। তিনি আন্তর্জাতিক ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয়-চট্টগ্রামের প্রতিষ্ঠাকালীন রেজিস্ট্রার হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। সবশেষ তিনি বিশ্ববিদ্যালয়টির পরিচালক হিসেবে কর্মরত ছিলেন।

‘নন্দিত সুন্দর’ খ্যাত কবি আব্দুল কুদ্দুস ফরিদী ৭ ডিসেম্বর ইন্তেকাল করেন। তিনি কবিতা, গল্প, প্রবন্ধ ও ছড়া রচনার পাশাপাশি জ্যোতির্বিজ্ঞান ও উদ্ভিদ ও প্রাণীর প্রজাতি, বাংলা ভাষার শব্দ, কবি নজরুলের কবিতা-গানে অলঙ্কার বিষয়ে গবেষণা করতেন। প্রকাশিত গ্রন্থগুলোর মধ্যে রয়েছে- নীল সাগরের ডাক, নন্দিত সুন্দর, পারিজাত, রূপঝলমল প্রজাপতি ও রুবাই জলসা। প্রকাশের অপেক্ষায় ছিল অন্তত ১২টি গ্রন্থ। ফরিদী দৈনিক নয়া দিগন্ত, মাসিক মদীনা ও মুসলিম জাহানে দীর্ঘদিন সম্পাদনা সহযোগী হিসেবে কাজ করেছেন। দেশের আলোচিত ও শীর্ষ কবি-সাহিত্যিকদের সাথে তার ছিল নিবিড় ঘনিষ্ঠতা।

খ্যাতিমান ছড়াকার, কবি, গীতিকার ও শিশুসাহিত্যিক আশরাফুল মান্নান ১৪ নভেম্বর ঢাকার বনশ্রীতে ফরায়েজি হাসপাতালে কিডনি জটিলতাজনিত রোগে আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ইন্তেকাল করেন।

বহুগুণে গুণান্বিত এই ছড়াকার ছন্দব্যবহারে বিশেষ দক্ষতা দেখিয়েছেন। জামালপুরের আঞ্চলিক ভাষাকে অসামান্য দক্ষতায় ব্যবহার করে অনেক সমৃদ্ধ ছড়া সৃষ্টি করেছেন। অন্যায় অবিচারের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে বলিষ্ঠ ভাষায় উচ্চারণ করেছেন। সমসাময়িক ঘটনা ও বিষয়কে নিয়ে লিখেছেন দুর্বিনীত ছড়া! যে কারণে তার ছড়া হয়ে উঠেছে বহুমাত্রিক। সাদাকে সাদা, কালোকে কালো বলার সাহস ছিল তার অতুলনীয়।

জার্মানিতে নির্বাসিত চিরকুমার কবি, লেখক ও কলামিস্ট দাউদ হায়দার ২৬ এপ্রিল রাতে জার্মানির বার্লিনের একটি বৃদ্ধাশ্রমে মারা যান। বয়স হয়েছিল ৭৩ বছর। তিনি ছিলেন একাধারে কবি, লেখক ও সাংবাদিক। সত্তর দশকের শুরুর দিকে তিনি দৈনিক সংবাদের সাহিত্য পাতার সম্পাদক ছিলেন। ১৯৭৩ সালে লন্ডন সোসাইটি ফর পোয়েট্রি তার এক কবিতাকে ‘দ্য বেস্ট পোয়েম অব এশিয়া’ সম্মানে ভূষিত করে।

বাংলাদেশের সাহিত্য-সংস্কৃতি অঙ্গনের অগ্রণী ব্যক্তিত্ব ও ছায়ানটের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা সন্জীদা খাতুন ২৫ মার্চ একটি বেসরকারি হাসপাতালের আইসিইউতে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। সনজীদা খাতুন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৫৪ সালে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে স্নাতক, ১৯৫৫ সালে ভারতের বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর এবং ১৯৭৮ সালে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন। শিক্ষকতা দিয়েই তার কর্মজীবন শুরু হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে দীর্ঘকাল পড়িয়েছেন তিনি।

স্বাধীনতা পুরস্কারপ্রাপ্ত লেখক, শিক্ষাবিদ ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব অধ্যাপক যতীন সরকার ১৩ আগস্ট ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।

তিনি ময়মনসিংহের নাসিরাবাদ কলেজের বাংলা বিভাগের সাবেক শিক্ষক সুদীর্ঘকাল ধরে মননশীল সাহিত্যচর্চা, বামরাজনীতি এবং প্রগতিশীল আন্দোলনের সাথে জড়িত ছিলেন। লেখক হিসেবে যতীন সরকার ২০১০ সালে স্বাধীনতা পুরস্কার, ২০০৭ সালে বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার, ২০০৫ সালে প্রথম আলো বর্ষসেরা গ্রন্থ পুরস্কার, ড. এনামুল হক স্বর্ণপদক, খালেকদাদ চৌধুরী সাহিত্য পুরস্কার, মনিরুদ্দীন ইউসুফ সাহিত্য পুরস্কারসহ অসংখ্য সম্মাননা লাভ করেন।

লেখক-গবেষক, রাজনীতিক ও জাতীয় মুক্তি কাউন্সিলের সভাপতি বদরুদ্দীন উমর ৭ সেপ্টেম্বর রাজধানীর শ্যামলীর বাংলাদেশ স্পেশালাইজড হাসপাতালে মারা যান।

তিনি বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (মার্কসবাদী- লেনিনবাদী) নেতা ছিলেন। তিন খণ্ডে উমর রচিত পূর্ব বাংলার ভাষা আন্দোলন ও তৎকালীন রাজনীতি (১৯৭০, ১৯৭৬, ১৯৮১) বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস রচনায় পথিকৃৎ হিসেবে বিবেচিত। ২০২৫ সালে তিনি বাংলাদেশের সর্বোচ্চ বেসামরিক পুরস্কার স্বাধীনতা পুরস্কারে ভূষিত হন। কিন্তু তিনি তা গ্রহণে অস্বীকৃতি জানান।

ক্যান্সারে তরুণ কবি শ্বেতা শতাব্দী এষ ১২ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ ক্যান্সার সোসাইটি অ্যান্ড ওয়েলফেয়ার হাসপাতালে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগ থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেছিলেন। অসুস্থতা সত্ত্বেও লিখেছেন একের পর এক কাব্যগ্রন্থ। ২০২৫ সালের বইমেলায় প্রকাশিত হয় ‘হাওয়া ও হেমন্ত’।

জনপ্রিয় কিশোর গোয়েন্দা সিরিজ তিন গোয়েন্দার স্রষ্টা, লেখক ও অনুবাদক রকিব হাসান ১৫ অক্টোবর শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তার প্রথম বই প্রকাশিত হয় ছদ্মনামে।

স্বনামে প্রথম প্রকাশ অনুবাদগ্রন্থ ব্রাম স্টোকারের ‘ড্রাকুলা’ দিয়ে। কিশোরদের জন্য বই লিখে, অনুবাদ করে তিনি খ্যাতি অর্জন করেন। থ্রিলার এবং গোয়েন্দা গল্প লেখার আগে তিনি অন্যান্য কাজেও যুক্ত ছিলেন।

রহস্যপত্রিকার সহকারী সম্পাদক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি কেবল তিন গোয়েন্দারই ১৬০টি বই লিখেছেন। এ ছাড়া ৩০টি বই অনুবাদ করেছেন।