সুইজারল্যান্ডে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান বৈঠক চূড়ান্ত চুক্তির পথে ‘বড় অগ্রগতি’
Printed Edition
নয়া দিগন্ত ডেস্ক
দীর্ঘ কয়েক দশকের বৈরিতা এবং সাম্প্রতিক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধাবস্থার অবসান ঘটাতে অবশেষে বড় ধরনের কূটনৈতিক ও কৌশলগত অগ্রগতি অর্জন করেছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান। সুইজারল্যান্ডের বুর্গেনস্টক রিসোর্টে অনুষ্ঠিত দুই দেশের শীর্ষ কর্মকর্তাদের মধ্যকার প্রথম দফার ১৮ ঘণ্টার নিবিড় ম্যারাথন আলোচনা সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে। চরম উত্তেজনা ও যুদ্ধাতঙ্কের মধ্য দিয়ে শুরু হওয়া এই দ্বিপক্ষীয় বৈঠক শেষে আগামী ৬০ দিনের মধ্যে একটি চূড়ান্ত ও স্থায়ী শান্তি চুক্তিতে পৌঁছানোর ঐতিহাসিক ‘রোডম্যাপ’ তৈরিতে পারস্পরিকভাবে সম্মত হয়েছে উভয় পক্ষ। খবর বিবিসি, রয়টার্স ও আলজাজিরার।
এই ইতিবাচক অগ্রগতির অংশ হিসেবে মার্কিন প্রশাসন ইরানের ওপর থেকে কয়েক দশকের পুরনো নিষেধাজ্ঞা সাময়িকভাবে শিথিল করে দেশটিকে আন্তর্জাতিক বাজারে তেল বিক্রির আনুষ্ঠানিক অনুমতি দিয়েছে। এর বিপরীতে তেহরান তাদের বন্ধ থাকা পরমাণু কেন্দ্রগুলোতে আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ) পরিদর্শকদের পুনরায় প্রবেশাধিকার দিতে এবং বিশ্ব বাণিজ্যের লাইফলাইন খ্যাত হরমুজ প্রণালীতে সব ধরনের বাণিজ্যিক জাহাজের অবাধ ও উন্মুক্ত চলাচল নিশ্চিত করতে সম্মত হয়েছে। মধ্যস্থতাকারী দেশ পাকিস্তান ও কাতারের পক্ষ থেকে এই সফলতার বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে।
বৈঠকের শুরুতেই উত্তেজনা
এবারের শীর্ষ বৈঠকের শুরুটা হয়েছিল চরম বৈরী ও উত্তেজনাকর পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে। আলোচনার শুরুর দিকেই তেহরানের পক্ষ থেকে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের প্রধান নৌপথ হরমুজ প্রণালী আবারো সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেয়ার আকস্মিক ঘোষণা আসে। এর জবাবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানকে কড়া হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, হরমুজ প্রণালী আবার বন্ধ করার চেষ্টা করলে কঠোর জবাব দেয়া হবে এবং প্রয়োজনে মার্কিন সামরিক বাহিনী এই নৌপথটির সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নেবে।
ইরানের আধা-সরকারি সংবাদ সংস্থা তাসনিম নিউজ এজেন্সি জানায়, ট্রাম্পের ওই কড়া সামরিক হুমকি প্রকাশের পর ইরানি প্রতিনিধিদল ক্ষুব্ধ হয়ে সরাসরি বৈঠককক্ষে ফিরতে অস্বীকৃতি জানায় এবং মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে বার্তা আদান-প্রদান করতে থাকে। তেহরানের অভিযোগ, লেবাননে সঙ্ঘাত বন্ধে যুক্তরাষ্ট্র তার পূর্বপ্রতিশ্রুতি পূরণ করতে পারেনি বলেই তারা হরমুজ প্রণালীতে নৌচলাচলে নতুন করে বিধিনিষেধ আরোপ করেছে। তবে আলোচনায় অংশ নেয়া এক মার্কিন কূটনীতিক রয়টার্সকে জানান, শেষ পর্যন্ত কোনো পক্ষই আলোচনা ছেড়ে যায়নি। গভীর রাত পর্যন্ত দুই দেশের প্রতিনিধিরা টেবিলে উপস্থিত ছিলেন।
হুমকি সত্ত্বেও বড় অগ্রগতি : জেডি ভ্যান্স
আমেরিকার ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স গত রোববার সুইজারল্যান্ডে ইরানি কর্মকর্তাদের সাথে সরাসরি সংলাপে বসেন এবং সোমবারের ভোররাতে এই দীর্ঘ আলোচনাটি শেষ হয়। বৈঠক শেষে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমরা চূড়ান্ত চুক্তির দিকে অনেক বড় অগ্রগতি অর্জন করেছি।’
সোস্যাল মিডিয়ায় ইরানি প্রতিনিধিদলের ওয়াকআউটের হুমকির বিষয়ে ভ্যান্স কিছুটা রসাত্মক সুরে বলেন, ‘তারা টুইটারে ওয়াকআউটের হুমকি দিলেও শেষ পর্যন্ত রাত ১টার পরও আলোচনা চালিয়ে গেছে। তাদের টেকনিক্যাল টিম এখনো আমাদের দলের সাথে কাজ করছে। টেবিলে কিছুটা হুমকি আর ঘ্যানঘ্যান থাকলেও দিনশেষে আমরা বড় সাফল্য পেয়েছি।’ তিনি আরো যোগ করেন, ‘আমরা ইরানিদের স্পষ্ট বলেছি, আপনারা যখন ‘ট্র্যাশ টক’ বা কটূক্তি করবেন, তখন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট চুপ থাকবেন- এমনটা আশা করা ভুল।’ লেবানন পরিস্থিতি নিয়ে ভ্যান্স বলেন, সেখানে সহিংসতা পুরোপুরি বন্ধ না হলেও পরিস্থিতির উন্নতির দিকে দৃশ্যমান অগ্রগতি হচ্ছে।
৬০ দিনের রোডম্যাপ
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের এই নড়বড়ে শান্তি প্রক্রিয়াকে সফল করতে কাতার ও পাকিস্তান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাহ শরিফ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেয়া এক পোস্টে এই আলোচনা সফল হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান, অত্যন্ত ইতিবাচক ও গঠনমূলক পরিবেশে এই আলোচনা শেষ হয়েছে, যা একটি চূড়ান্ত চুক্তির পথ সুগম করেছে। এই রোডম্যাপের অধীনে রাজনৈতিকভাবে বিষয়টি তদারকি করতে একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করা হয়েছে।
কাতারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে প্রকাশিত দাফতরিক বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে যে, মূল নেতাদের বৈঠক শেষ হলেও সুইজারল্যান্ডের বুর্গেনস্টক রিসোর্টে চলতি সপ্তাহজুড়ে দুই দেশের বিশেষজ্ঞদের উপস্থিতিতে কারিগরি বা টেকনিক্যাল পর্যায়ের আলোচনাটি নিরবচ্ছিন্নভাবে অব্যাহত থাকবে। যৌথ বিবৃতিতে সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, উভয় পক্ষই লেবানন সীমান্তে চলমান সামরিক সঙ্ঘাত ও রক্তক্ষয়ী লড়াই পুরোপুরি বন্ধ করার বিষয়ে একমত হয়েছে। এর পাশাপাশি হরমুজ প্রণালিতে দুই দেশের সামরিক বাহিনীর মধ্যে একটি স্থায়ী যোগাযোগ ব্যবস্থা বা ‘হটলাইন’ চালু করার সিদ্ধান্ত ঘোষণা করা হয়েছে।
আইএইএ পরিদর্শকদের প্রত্যাবর্তন
চুক্তির শর্তাবলী ও তেহরানের প্রতিশ্রুতি যাচাই করতে আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ) পারমাণবিক পরিদর্শকরা চলতি সপ্তাহের মধ্যেই ইরানে প্রবেশ করবেন। জেডি ভ্যান্স জানান, ‘আমাদের আশা আমরা একটি চূড়ান্ত ও স্থায়ী মীমাংসায় পৌঁছাব। তবে পরমাণু পরিদর্শকরা যে দ্রুত কাজ শুরু করছেন, এটিই আমাদের প্রথম বড় উদ্যাপন।’ এই অগ্রগতির কথা জানাতে তিনি ভোররাত ২টায় জাতিসঙ্ঘ পরিদর্শকদের ফোন করেছিলেন উল্লেখ করে রসিকতার ছলে বলেন, ‘রাত ২টায় সাধারণত কেউ ফোন ধরে না, তবে আজ-কালের মধ্যেই আইএইএ-এর সাথে আনুষ্ঠানিক যোগাযোগ সম্পন্ন হবে।’
অবরুদ্ধ তহবিল নিয়ে ‘আমেরিকান ভুট্টা’ ফর্মুলা
আন্তর্জাতিক ব্যাংকে আটকে থাকা ইরানের শত কোটি ডলারের ফ্রিজড বা অবরুদ্ধ তহবিল ছাড়করণের বিষয়ে একটি অভিনব ও নিরাপদ সমাধানের কথা জানান জেডি ভ্যান্স। তিনি জানান, ডোনাল্ড ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনার কাতারের মধ্যস্থতায় একটি আকর্ষণীয় প্রস্তাব এনেছেন। প্রস্তাব অনুযায়ী, ইরান যদি তাদের অবরুদ্ধ ফান্ড ফেরত পায়, তবে সেই অর্থ কোনো নগদ ডলারে তেহরানে যাবে না। সেই অর্থ দিয়ে তারা সরাসরি মার্কিন করপোরেট বাজার থেকে ‘আমেরিকান ভুট্টা ও গম’ কিনতে পারবে। এর ফলে কাতার ও যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ নিয়ন্ত্রণে সেই অর্থ সরাসরি ইরানি জনগণের খাদ্য ও কল্যাণে ব্যবহৃত হবে এবং তা দিয়ে কোনো সশস্ত্র বা সন্ত্রাসী গোষ্ঠী অর্থায়ন করার সুযোগ থাকবে না।
ইরানের তেল বিক্রির অনুমোদন
বৈঠকের সিদ্ধান্তের আলোকেই মার্কিন ট্রেজারি বিভাগ আজ একটি অস্থায়ী সাধারণ লাইসেন্স জারি করেছে, যার মাধ্যমে আগামী ২১ আগস্ট পর্যন্ত (৬০ দিন) ইরান অপরিশোধিত তেল ও পেট্রোকেমিক্যাল পণ্য উৎপাদন এবং বিশ্ববাজারে সরবরাহ করতে পারবে। গত সপ্তাহে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে স্বাক্ষরিত দ্বিপক্ষীয় সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) অনুযায়ী, ব্যাংকিং লেনদেন, বীমা ও পরিবহনসহ সব ধরনের সেবা এই লাইসেন্সের আওতাভুক্ত থাকবে এবং ডলার-ডিনোমিনেটেড ফান্ডে এই পেমেন্ট করা যাবে। তবে কিউবা, উত্তর কোরিয়া ও ক্রিমিয়া এই বিশেষ লাইসেন্সের আওতার বাইরে থাকবে।
মার্কিন ট্রেজারি সেক্রেটারি স্কট বেসেন্ট সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এক্সে লিখেছেন, ‘সুইজারল্যান্ড সংলাপের শর্ত অনুযায়ী ইরান হরমুজ প্রণালীতে মুক্ত নৌচলাচল ও আইএইএ পরিদর্শকদের দেশে ঢোকার অনুমতি দিতে সম্মত হয়েছে। এর পরিপ্রক্ষিতেই ট্রেজারি বিভাগ এই ৬০ দিনের লাইসেন্স ইস্যু করেছে।’
ইরানের প্রতিক্রিয়া ও তেলের বাজারে স্বস্তি
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাকচি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেয়া এক পোস্টে এই আলোচনাকে ইতিবাচক আখ্যা দিয়ে জানান, তেহরান এই আলোচনার মাধ্যমে তাদের তেল ও পেট্রোরাসায়নিকের ওপর থেকে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, আন্তর্জাতিক ব্যাংকে ফ্রিজ থাকা ইরানি অর্থ অবমুক্ত করা এবং দেশের ভঙ্গুর অর্থনীতি সচল করতে একটি বড় ধরনের পুনর্গঠন ও উন্নয়ন পরিকল্পনা শুরু করার সুনির্দিষ্ট প্রতিশ্রুতি আদায় করতে পেরেছে। তবে এই বিষয়ে হোয়াইট হাউজের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো মন্তব্য করা হয়নি।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরান ও মার্কিন-ইসরাইল যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর ইরান হরমুজ প্রণালী অবরোধ করলে বিশ্ববাজারে তেলের দাম রেকর্ড পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়েছিল এবং আলোচনার নড়বড়ে পরিস্থিতির কারণেও সম্প্রতি তা ব্যারেল প্রতি ৮১ দশমিক ৬৬ ডলারে পৌঁছেছিল। তবে আজ দুই দেশের মধ্যে এই ঐতিহাসিক সমঝোতা ও তেল বিক্রির খবর ছড়িয়ে পড়ার পর বিশ্ববাজারে তেলের দাম যুদ্ধপূর্ববর্তী সময়ের চেয়েও নিচে নেমে এসেছে, যা বৈশ্বিক অর্থনীতির জন্য বড় স্বস্তি এনে দিয়েছে।
লেবাননে শান্তি ও ঘরমুখী মানুষের ঢল
দীর্ঘদিনের যুদ্ধ ও বাস্তুচ্যুতির পর এই চুক্তির প্রভাবে লেবাননে বড় কোনো সঙ্ঘাতের খবর পাওয়া যায়নি। দক্ষিণ লেবাননের প্রধান মহাসড়কগুলোতে বাস্তুচ্যুত বাসিন্দাদের গাড়ির বহর নিয়ে নিজ নিজ ঘরবাড়িতে ফিরতে দেখা গেছে, যাদের অনেকের হাতেই হিজবুল্লাহর পতাকা শোভা পাচ্ছিল।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানকে চীনের বার্তা
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের শীর্ষ মধ্যস্থতাকারীদের এই বৈঠকের পর দেশ দু’টিকে ‘ইতিবাচক ফলের জন্য একই পথে কাজ করার’ আহ্বান জানিয়েছে চীন। বেইজিংয়ে সাংবাদিকদের সাথে আলাপকালে চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র গুও জিয়াকুন এই আহ্বান জানান। তিনি বলেন, ‘বেইজিং আশা করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান আলোচনার এই ভালো ধারা অব্যাহত রাখবে।’ একই সাথে পাকিস্তান, কাতার এবং সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের মধ্যস্থতার এই প্রচেষ্টাকে চীন স্বাগত ও সমর্থন জানায় বলে তিনি উল্লেখ করেন।