ফুটপাথে উচ্ছেদ অভিযান : চলাচলে স্বস্তি এলেও অনিশ্চয়তায় হকাররা
Printed Edition
হাবিবুল বাশার
জীবিকার তাগিদ ও নগর শৃঙ্খলার প্রয়োজন-এই দুইয়ের টানাপোড়েনে রাজধানীর ফুটপাথ এখন এক জটিল বাস্তবতার মুখোমুখি। সাম্প্রতিক উচ্ছেদ অভিযানে পথচারীদের চলাচলে স্বস্তি এলেও আয়ের উৎস হারিয়ে অনিশ্চয়তায় পড়েছেন হাজারো হকার।
সম্প্রতি ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন ও ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন রাজধানীর মিরপুর-১, মতিঝিল, বায়তুল মোকাররম, পল্টন ও গুলিস্তানসহ বিভিন্ন এলাকায় উচ্ছেদ অভিযান চালিয়ে কয়েক শতাধিক ফুটপাথের দোকান সরিয়ে দেয়। দীর্ঘদিন ধরে এসব এলাকায় ব্যবসা করে আসা হকাররা হঠাৎ করেই কর্মহীন হয়ে পড়েন।
জুরাইনের সুমন (ছদ্মনাম) এখন লুকিয়ে-চুরিয়ে ফুটপাথে শরবত বিক্রি করছেন। প্রতিটি গ্লাস ৫ টাকায় বিক্রি করে দিনে যা আয় হয়, তা দিয়ে কোনোমতে সংসার চলে।
‘কিছুক্ষণ পরপর পুলিশ আসে, আবার সরে যেতে হয়। আগের মতো স্থির হয়ে বসে ব্যবসা করা যায় না,’- বলছিলেন তিনি।
দুই বছর মালয়েশিয়ায় কাজ করে প্রত্যাশা পূরণ না হওয়ায় দেশে ফিরে বাবার পেশাতেই যুক্ত হন সুমন। এক বছর আগে বাবার মৃত্যুর পর চিকিৎসা খরচে প্রায় সাত লাখ টাকা ব্যয় হওয়ায় পরিবারের সব সঞ্চয় শেষ হয়ে যায়। বর্তমানে দুই ভাই মিলে তিন কক্ষের একটি বাসায় থাকেন; ভাড়া ১৩ হাজার টাকা, বিদ্যুৎ বিল চার হাজার ৫০০ থেকে পাঁচ হাজার টাকা। বাড়তি খরচের চাপে সংসার চালানোই কঠিন হয়ে উঠেছে।
‘এটা ব্যবসা নয়, জীবনযুদ্ধ’
গুলিস্তানের এক প্রবীণ হকার, নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক, প্রায় ৩৫ বছর ধরে ফুটপাথে ব্যবসা করছেন। তার ভাষায়, ‘এটা কোনো ব্যবসা না, এটা জীবনযুদ্ধ। রোদ-বৃষ্টি, উচ্ছেদ- সবকিছুর সাথে লড়াই করেই চলতে হয়।’
তিনি জানান, ফুটপাথের আয়ে কেবল ন্যূনতম জীবিকা নির্বাহ সম্ভব, এর বেশি কিছু করা যায় না।
টিকাটুলীর সেলিম উদ্দিন দীর্ঘদিন ধরে ফল বিক্রি করেন। পরিবারের একমাত্র উপার্জনকারী হিসেবে দায়িত্ব তার কাঁধে। তিনি বলেন, ‘পুলিশ নাম-ঠিকানা লিখে নিলেও ভয় পাই না। জেলে নিলেও পরিবারসহ যাব- ওখানে অন্তত খাবারের নিশ্চয়তা থাকবে।’
পথচারীদের স্বস্তি, কিন্তু নতুন সমস্যা
অন্য দিকে, ফুটপাথ আংশিক হকারমুক্ত হওয়ায় পথচারীরা কিছুটা স্বস্তি পাচ্ছেন। জুরাইনের এক পথচারী বলেন, ‘হাঁটা সহজ হয়েছে, তবে সড়কে সিএনজি ও অটোরিকশার স্ট্যান্ড বেড়ে যাওয়ায় যানজট আবার বাড়ছে।’
সরেজমিন দেখা গেছে, অনেক পথচারী যানজটের জন্য ফুটপাথ দখল, অবৈধ পার্কিং এবং অনিয়ন্ত্রিত অটোরিকশা চলাচলকে দায়ী করছেন।
রাজধানীতে হকারের সুনির্দিষ্ট সংখ্যা নিয়ে নির্ভরযোগ্য তথ্য নেই। তবে সংশ্লিষ্টদের মতে, এই অনানুষ্ঠানিক খাতে কয়েক লাখ মানুষ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে যুক্ত। ফলে উচ্ছেদ অভিযান কেবল নগর ব্যবস্থাপনার বিষয় নয়, এটি একটি বড় সামাজিক ও অর্থনৈতিক ইস্যু।
পুনর্বাসন নিয়ে অনিশ্চয়তা, সমাধান কোথায়?
এ বিষয়ে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের জনসংযোগ কর্মকর্তা মো: রাসেল রহমান জানান, উচ্ছেদ হওয়া হকারদের পুনর্বাসনের বিষয়ে আলোচনা চলছে। তবে এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, টেকসই সমাধানের জন্য প্রয়োজন সমন্বিত পরিকল্পনা- নির্দিষ্ট হকার জোন, সময়ভিত্তিক ব্যবসার অনুমতি এবং বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা। তা না হলে উচ্ছেদ ও পুনর্দখলের চক্র অব্যাহত থাকবে, আর এর মধ্যেই ভোগান্তি বাড়বে নগরবাসী ও প্রান্তিক মানুষের।