সীমান্ত সমস্যা সমাধানের আশা দীনেশ ত্রিবেদীর
পর্যটন ভিসা চালুর ঘোষণা
Printed Edition
কূটনৈতিক প্রতিবেদক
রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিনের কাছে পরিচয়পত্র পেশ করে বাংলাদেশে ভারতের হাইকমিশনার হিসেবে গতকাল আনুষ্ঠানিকভাবে দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন দীনেশ ত্রিবেদী। একই দিন দীনেশ ত্রিবেদীকে কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভার পূর্ণ মন্ত্রীর মর্যাদা দিয়েছে ভারত সরকার। স্বাধীনতার পর এই প্রথমবারের মতো একজন রাজনীতিককে কূটনৈতিক মিশন প্রধানের দায়িত্ব দিয়ে ঢাকা পাঠিয়েছে দিল্লি। বঙ্গভবনে রাষ্ট্রপতির কাছে পরিচয়পত্র পেশের আনুষ্ঠানিকতা শেষে নবনিযুক্ত হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী রাজধানীর যমুনা ফিউচার পার্কে অবস্থিত ভারতীয় ভিসা আবেদন কেন্দ্র পরিদর্শন করেন। তিনি ভিসাপ্রার্থীদের সাথে মতবিনিময় করেন এবং তাদের সুযোগ-সুবিধা বাড়ানোর উপায় নিয়ে আলোচনা করেন। হাইকমিশনার বাংলাদেশীদের জন্য প্রায় দুই বছর ধরে বন্ধ থাকা ভারতের পর্যটন ভিসা চালুর ঘোষণা দেন। আগামী ২৮ জুন থেকে ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, খুলনা ও সিলেটের ভিসা কেন্দ্র থেকে একযোগে ভারতের পর্যটন ভিসা দেয়ার কার্যক্রম শুরু হবে।
বঙ্গভবনে রাষ্ট্রীয় আনুষ্ঠানিকতায় পরিচয়পত্র পেশের পর রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিনের সাথে সৌজন্য বৈঠক করেন হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী। বৈঠকের আলোচনার বিষয়বস্তু তুলে ধরে রাষ্ট্রপতির প্রেস সচিব মোহাম্মদ সরওয়ার আলম বলেন, দুই দেশের জনগণের মধ্যে যোগাযোগ বৃদ্ধি এবং সীমান্ত সমস্যাসহ অমীমাংসিত ইস্যু সমাধানে ইতিবাচক উদ্যোগের ওপর রাষ্ট্রপতি গুরুত্বারোপ করেছেন। সীমান্ত সমস্যা সম্পর্কে হাইকমিশনার বলেছেন, সম্প্রতি বিএসএফ ও বিজিবির উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তাদের মধ্যে ফলপ্রসূ আলোচনা হয়েছে। দুই দেশের সীমান্তরী বাহিনী ও কর্মকর্তাদের মধ্যে স্থানীয় ও উচ্চপর্যায়ে এ ধরনের বৈঠক নিয়মিতভাবে হওয়া প্রয়োজন। সীমান্ত সমস্যা দ্রুত সমাধান হবে বলে হাইকমিশনার আশা প্রকাশ করেন।
নবনিযুক্ত ভারতীয় হাইকমিশনারকে স্বাগত জানিয়ে রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিন বলেন, নিকটতম প্রতিবেশী এবং গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য ও উন্নয়ন অংশীদার হিসেবে ভারতের সাথে সম্পর্ককে বাংলাদেশ বিশেষ গুরুত্ব দেয়। সার্বভৌম সমতা, জাতীয় স্বার্থ ও মর্যাদা এবং জনগণের কল্যাণকে সমুন্নত রেখে ভারতের সাথে সম্মানজনক ও ভবিষ্যৎমুখী অংশীদারিত্ব বজায় রাখতে বাংলাদেশ প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। তিনি আশা প্রকাশ করেন, হাইকমিশনারের কর্মকাল বাংলাদেশ-ভারত পারস্পরিক সম্পর্ককে আরো সুদৃঢ়, ফলপ্রসূ ও জনকল্যাণমুখী করতে সহায়ক হবে। বাংলাদেশের নতুন সরকারের শপথ অনুষ্ঠানে ভারতের লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লার অংশগ্রহণের কথা রাষ্ট্রপতি কৃতজ্ঞতার সাথে স্মরণ করেন।
এ প্রসঙ্গে হাইকমিশনার বলেন, আমাদের দু’টি সার্বভৌম রাষ্ট্রের মধ্যে বন্ধুত্বপূর্ণ ও সৌহার্দ্যময় সম্পর্ক বিদ্যমান, আর এটাই স্বাভাবিক।
দীনেশ ত্রিবেদী ভারতের প্রেসিডেন্ট ও নেতৃত্বের শুভেচ্ছা রাষ্ট্রপতির কাছে পৌঁছে দেন এবং দ্বিপীয় সহযোগিতা আরো জোরদারে ভারতের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন।
রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিন হাইকমিশনারের মাধ্যমে ভারতের প্রেসিডেন্টের প্রতি শুভেচ্ছা জানান। হাইকমিশনার বাংলাদেশে তার দায়িত্ব পালনে রাষ্ট্রপতি ও বাংলাদেশের জনগণের সার্বিক সহযোগিতা কামনা করেন।
বঙ্গভবনের আনুষ্ঠানিকতা শেষে যমুনা ফিউচার পার্কে ভারতীয় ভিসা আবেদন কেন্দ্রে এসে হাইকমিশনার বলেন, গত ১২ জুন যখন বেনাপোল হয়ে আমি বাংলাদেশে এলাম, তখন সাংবাদিকরা শুরুতেই আমাকে ভিসা নিয়ে প্রশ্ন করেছিলেন। তাই ওই জিনিসটা আমার মাথায় ছিল।
হাইকমিশনার হিসেবে দায়িত্ব শুরুর দিনই পর্যটন ভিসা চালুর ঘোষণা দিতে পারায় নিজের আনন্দের কথা জানিয়ে দীনেশ ত্রিবেদী বলেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ধানমন্ডিতে ইন্দিরা গান্ধী সাংস্কৃতিক কেন্দ্র লুণ্ঠন ও অগ্নিসংযোগের শিকার হয়। বাংলাদেশের বিভিন্ন শহরে পাঁচটি ভারতীয় ভিসা আবেদন কেন্দ্র হামলার শিকার হয়। দেশে বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে কর্মরত ভারতীয় কর্মকর্তারা হুমকির মুখে পড়েন। নিরাপত্তাজনিত হুমকি, হাইকমিশনের স্থাপনা ও সংশ্লিষ্ট কেন্দ্রগুলোর ওপর হামলার কারণে বাংলাদেশে ভারতীয় হাইকমিশন ভিসা কার্যক্রম সীমিত করতে বাধ্য হয়। তিনি বলেন, ভিসার জন্য আবেদনকারী অনেকেই গুরুতর রোগের চিকিৎসার জন্য ভারতে যান। সেই মানবিক প্রয়োজনের কথা বিবেচনায় রেখে নিরাপত্তাজনিত প্রতিকূলতা সত্ত্বেও ভারতীয় হাইকমিশন ঢাকা, চট্টগ্রাম, খুলনা, সিলেট ও রাজশাহীতে ভিসা কেন্দ্রগুলোর কার্যক্রম অব্যাহত রেখেছে। এ সময়ে ভারত পর্যটন ভিসা ছাড়া প্রতিদিন দেড় হাজারের বেশি অন্যান্য ভিসা ইস্যু করেছে, যাতে চিকিৎসা সংক্রান্ত ভিসাকে অগ্রাধিকার দেয়া হয়েছে।
প্রসঙ্গত, ৫ আগস্টের গণ-অভ্যুত্থানের আগে বাংলাদেশ থেকে পর্যটন, চিকিৎসা, শিক্ষাসহ নানাবিধ কাজে প্রচুর বাংলাদেশী ভারতে যাতায়াত করত। বিশ্বের অনেক দেশের দূতাবাস বা হাইকমিশন দিল্লি থেকে বাংলাদেশের কার্যক্রম পরিচালনা করে। এসব মিশন থেকে ভিসা নিতে বাংলাদেশীদের দিল্লি যাওয়ার প্রয়োজন হয়; কিন্তু ভারত পর্যটন ভিসা বন্ধ করে দেয়ায় বাংলাদেশীদের জন্য বাড়তি সমস্যার সৃষ্টি হয়। এ ছাড়া সময়মতো ভিসা না পাওয়ায় ভারতে অধ্যয়নরত অনেক বাংলাদেশী শিক্ষার্থীও বিপাকে পড়ে। বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে সংখ্যালঘু নির্যাতনের ধারাবাহিক প্রোপাগান্ডার কারণে ভারতের সাথে সম্পর্কে গুরুতর অবনতি হয়। এ পর্যায়ে হিন্দুত্ববাদী সংগঠনগুলো আগরতলায় অবস্থিত বাংলাদেশের সহকারী হাইকমিশনে হামলা চালায় এবং দিল্লি হাইকমিশন ও কলকাতা উপ হাইকমিশনের সামনে বিক্ষোভ প্রদর্শন করে। এর পরিপ্রেক্ষিতে ভারতীয়দের জন্য ভিসা ইস্যু বন্ধ করে দেয় বাংলাদেশ। বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর এসব মিশন থেকে ভারতীয়দের জন্য ভিসা ইস্যু আবারো শুরু হয়েছে।