সংস্কারের এজেন্ডা সামনে রেখে জামায়াতের জোটসঙ্গী হলো এনসিপি

Printed Edition

নিজস্ব প্রতিবেদক

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মধ্যে গঠিত নির্বাচনী জোট ও আসন সমঝোতা দেশের রাজনীতিতে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। কয়েক সপ্তাহ ধরে চলা আনুষ্ঠানিক ও অনানুষ্ঠানিক বৈঠক, অভ্যন্তরীণ মতামত সংগ্রহ এবং কেন্দ্রীয় পর্যায়ের আলোচনা শেষে এনসিপির কেন্দ্রীয় কমিটির সংখ্যাগরিষ্ঠ নেতার সমর্থনে জামায়াতের সাথে জোটে যাওয়ার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়েছে দলটি।

রোববার সন্ধ্যায় রাজধানীর বাংলামোটরে এনসিপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আয়োজিত এক জরুরি সংবাদ সম্মেলনে জোটের বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করেন দলের আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম। তিনি জানান, নির্বাহী বডির সদস্যদের সম্মতিক্রমেই এই সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। তবে এই সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করে দলের একটি অংশ ইতোমধ্যে পদত্যাগ করেছে, যা এনসিপির অভ্যন্তরে আদর্শিক দ্বন্দ্বকে প্রকাশ্যে এনেছে।

কেন জোটে গেল এনসিপি : সংবাদ সম্মেলনে নাহিদ ইসলাম বলেন, এনসিপি শুরু থেকেই আসন্ন নির্বাচনে এককভাবে অংশগ্রহণের প্রস্তুতি নিচ্ছিল। ৩০০ আসনে প্রার্থী দেয়ার লক্ষ্য নিয়ে দেশব্যাপী মনোনয়ন আহ্বান করা হয়েছিল। একইসাথে সংস্কার প্রশ্নে সমমনা আরো দু’টি দলের সাথে একটি রাজনৈতিক বোঝাপড়াও হয়েছিল।

তবে শরিফ ওসমান হাদির শাহাদতের পর দেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বড় ধরনের পরিবর্তন আসে বলে মন্তব্য করেন তিনি। নাহিদ ইসলামের ভাষায়, ‘এই হত্যাকাণ্ড আমাদের দেখিয়ে দিয়েছে যে গণ-অভ্যুত্থানে পরাজিত আধিপত্যবাদী ও আগ্রাসনী শক্তি এখনো সক্রিয়। তারা নির্বাচন বানচাল করতে এবং সংস্কার ও নতুন বাংলাদেশের অগ্রযাত্রা থামিয়ে দিতে চক্রান্ত করছে।’ তিনি বলেন, ‘আজ ওসমান হাদির গায়ে গুলি লেগেছে, আগামীকাল হয়তো আপনার গায়ে লাগবে, পরশুদিন আমার গায়ে লাগবে। এই জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে অংশ নেয়া তরুণ, নাগরিক, শহীদ পরিবার ও আহত যোদ্ধারাই এখন টার্গেটে।’ এই পরিবর্তিত বাস্তবতায় নির্বাচনকে সুষ্ঠু, প্রতিযোগিতাপূর্ণ এবং নিরাপদ করতে বৃহত্তর রাজনৈতিক ঐক্যের প্রয়োজন অনুভূত হয়েছে বলেও জানান তিনি।

এই প্রেক্ষাপটেই জামায়াতে ইসলামী এবং তাদের সমমনা আট দলের সাথে নির্বাচনী জোট ও আসন সমঝোতার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে বলে জানান এনসিপির আহ্বায়ক।

সংস্কার ও বিচার প্রশ্নে অবস্থান অপরিবর্তিত : নাহিদ ইসলাম বলেন, এই সমঝোতা কেবল নির্বাচনী হিসাব নয়; বরং সংস্কার, বিচার, দুর্নীতি ও আধিপত্যবাদবিরোধী রাজনীতির প্রশ্নে এনসিপির অবস্থান অটুট থাকবে। ‘গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী বাংলাদেশের যে আকাক্সক্ষা, সেটি যাতে ব্যাহত না হয়, সে লক্ষ্যেই আমরা বৃহত্তর ঐক্যের পথে এসেছি,’ বলেন তিনি। তিনি আরো জানান, আজই (সোমবার) সমঝোতার ভিত্তিতে চূড়ান্ত প্রার্থীদের নাম ঘোষণা করা হবে এবং সেই প্রার্থীরাই মনোনয়নপত্র জমা দেবেন। যেখানে এনসিপির প্রার্থী থাকবে না, সেখানে জোটভুক্ত প্রার্থীদের পক্ষে এনসিপির নেতাকর্মীরা প্রচারে অংশ নেবেন।

জোটে গিয়ে যারা মনোনয়ন পেতে পারেন : জামায়াত ও এনসিপি সূত্রে জানা গেছে, আসন সমঝোতার অংশ হিসেবে জামায়াত এনসিপির জন্য অন্তত ২০ থেকে ৩০টি আসন ছাড়তে পারে। এর মধ্যে এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম, সদস্যসচিব আখতার হোসেন, সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক আরিফুল ইসলাম আদীব, যুগ্ম আহ্বায়ক সারোয়ার তুষার, ড. আতিক মুজাহিদ, হাসনাত আবদুল্লাহ, সারজিস আলম ও নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর মতো পরিচিত নেতাদের আসন প্রায় চূড়ান্ত বলে আলোচনা রয়েছে।

জামায়াতের একটি সূত্র জানিয়েছে, এনসিপির শীর্ষ পাঁচ নেতার আসন চূড়ান্ত হয়েছে এবং বাকি আসনগুলোর বিষয়ে যাচাই-বাছাই চলছে। শিগগিরই সংবাদ সম্মেলন বা আনুষ্ঠানিক বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে তালিকা প্রকাশ করা হতে পারে।

সংখ্যাগরিষ্ঠ সমর্থন, কিন্তু ভেতরে আপত্তি : এনসিপির কেন্দ্রীয় কমিটিতে মতামত সংগ্রহের পর দেখা গেছে, দলের সংখ্যাগরিষ্ঠ নেতা জামায়াতের সাথে জোটের পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। গত শনিবার প্রায় ১৭০ জন নেতা আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামকে চিঠি দিয়ে জোট ও আসন সমঝোতার পক্ষে মত দেন। তাদের যুক্তি- সংসদে শক্ত অবস্থান ছাড়া সংস্কার এজেন্ডা বাস্তবায়ন সম্ভব নয় এবং জামায়াতের সাংগঠনিক শক্তি ও ভোটভিত্তি এনসিপির জন্য সহায়ক হতে পারে। তবে এর বিপরীতে দলের একটি অংশ এই জোটকে এনসিপির ঘোষিত নাগরিক ও আধুনিক রাজনৈতিক দর্শনের সাথে সাংঘর্ষিক বলে মনে করছে। তাদের অভিযোগ, এই জোটে এনসিপির স্বতন্ত্র পরিচয় ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

এই আপত্তির ধারাবাহিকতায় ২৫ ডিসেম্বর এনসিপির কেন্দ্রীয় যুগ্ম সদস্যসচিব ও নির্বাহী কাউন্সিলের সদস্য মীর আরশাদুল হক পদত্যাগ করেন। তিনি মনোনয়ন পেলেও নির্বাচনে অংশ নেবেন না বলে ঘোষণা দেন। এর পর ২৭ ডিসেম্বর সিনিয়র যুগ্ম সদস্যসচিব ডা: তাসনিম জারা পদত্যাগ করেন। তার সাথে সংহতি জানিয়ে আরো কয়েকজন জ্যেষ্ঠ নেতা জোটের বিরোধিতা করেন। এর মধ্যে যুগ্ম আহ্বায়ক তাসনুভা জাবিন গতকাল পদত্যাগ করেছেন এবং যুগ্ম আহ্বায়ক মনিরা শারমিন নির্বাচন না করার ঘোষণা দিয়েছেন।

এ ছাড়া জামায়াতের সাথে জোট বা আসন সমঝোতার বিরোধিতা করে দলের ৩০ জন নেতা আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামকে চিঠি দিয়েছেন। চিঠিতে তারা অভিযোগ করেন, এত বড় সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত স্বচ্ছতা ও অন্তর্ভুক্তিমূলক আলোচনা হয়নি এবং আদর্শিক প্রশ্নগুলো যথাযথভাবে বিবেচনায় আনা হয়নি।

নতুন মেরুকরণের ইঙ্গিত : রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, জামায়াত-এনসিপি জোটের প্রভাব বহুমাত্রিক হতে পারে। একদিকে এটি এনসিপিকে সংসদে প্রতিনিধিত্বের সুযোগ এনে দিতে পারে এবং সংস্কারপন্থী রাজনীতিতে একটি শক্ত ব্লক গড়ে উঠতে পারে। অন্যদিকে, আদর্শিক বিভাজন ও অভ্যন্তরীণ পদত্যাগ দলটির জন্য ভবিষ্যতে চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে।

সব মিলিয়ে জামায়াত ও এনসিপির এই জোট কেবল একটি নির্বাচনী সমঝোতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এটি দেশের রাজনীতিতে নতুন মেরুকরণ সৃষ্টি করতে যাচ্ছে। সংখ্যাগরিষ্ঠের সমর্থনে এগোলেও ভেতরের বিরোধিতা এনসিপির রাজনীতিকে কোন পথে নিয়ে যায়- এখন সেটিই দেখার বিষয়।