মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের প্রভাবমুক্ত হতে পারছে না পুঁজিবাজার

টানা দ্বিতীয় দিন সূচকের অবনতি

Printed Edition

অর্থনৈতিক প্রতিবেদক

ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে শুরু হওয়া মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের এক মাস অতিক্রান্ত হলেও এখনো যুদ্ধের স্থায়িত্ব নিয়ে নিশ্চিত কোনো ধারণা করতে পারছে না বাকি বিশ^। তবে এ যুদ্ধ আরো সম্প্রসারিত হতে যাচ্ছে এ ব্যাপারে অনেকেই নিশ্চিত। আর ধীরে হলেও বিশে^র অর্থনীতিতে এর প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। এরই অংশ হিসাবে বিশে^র সবগুলো পুঁজিবাজার এ মুহূর্তে টানা পতনের মধ্য দিয়ে পার করছে। গত ক’দিন আগে প্রাথমিক ধাক্কা কাটিয়ে বাজারগুলো ঘুরে দাঁড়ালেও নতুন করে আবারও পতনের শিকার হচ্ছে। আর স্বাভাবিকভাবেই বাংলাদেশের পুঁজিবাজারও এর প্রভাবমুক্ত থাকতে পারছে না। দেশের পুঁজিবাজার বিশ্লেষকদের একটি অংশ শুরুতে এটিকে সাময়িক মনে করলেও এ মুহূর্তে তাদের আশঙ্কা এ যুদ্ধ সামনের দিনগুলোতে আরো সম্প্রসারিত হতে পারে।

পুঁজিবাজার সংশ্লিষ্টদের মতে, যুদ্ধের প্রভাবকে সাথে নিয়েই অন্যান্য দেশগুলোর মতো আমাদেরও চলতে হবে। আর এ ধরনের বিশেষ সময়ে বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করেই আমাদের বিনিয়োগ সিদ্ধান্ত নিতে হবে। এক্ষেত্রে বিনিয়োগকারীদের ঝুঁকিপূর্ণ বিনিয়োগ পরিহার করা হলে পুঁজির সুরক্ষা নিশ্চিত হবে বলে মনে করেন তারা। চলমান পরিস্থিতিতে দেশের পুঁজিবাজারের আচরণ কেমন হতে পারে জানতে চাইলে বিশিষ্ট পুঁজিবাজার বিশ্লেষক ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ মুসা নয়া দিগন্তকে বলেন, যুদ্ধ এখন যে পর্যায়ে চলছে তাতে আমেরিকা যদি তাদের সিদ্ধান্তে অটল থেকে সমঝোতার পথ পরিহার করে তাহলে বাজারের জন্য ভালো কোনো খবর নেই। তবে যেহেতু বহির্বিশে^র সাথে আমাদের পুঁজিবাজারের সম্পৃক্ততা কম সে হিসাবে বিশে^র অন্যান্য বাজারের তুলনায় আমাদের পুঁজিবাজারে এখনো তেমন বেশি পতন ঘটেনি। কিন্তু যুদ্ধ যত দীর্ঘায়িত হবে এর প্রভাব বাজারে পড়বে।

বিনিয়োগকারীদের উদ্দেশে তিনি বলেন, এ মুহূর্তে তারা চাইলে মৌলভিত্তিসম্পন্ন কোম্পানির মধ্যে যেগুলোর মূল্যস্তর কম সেগুলোকে বিনিয়োগের জন্য বেছে নিতে পারেন। আবার নিজেদের ঝুঁকি কমাতে চাইলে কিছুটা কনজারভেটিভ আচরণও করা যায়। যেমন যেসব কোম্পানিতে লোকসান গুনতে হচ্ছে না সেগুলো বিক্রি করে পুঁজিকে নগদায়ন করে নিতে পারেন যাতে ভবিষ্যতে বড় পতনের সময় এ ফান্ড ব্যবহার করা যায়। তবে তিনি মনে করেন, এ পরিস্থিতিতে ধৈর্যের বিকল্প নেই।

এ দিকে গতকাল নিয়ে টানা দ্বিতীয় দিনের মতো দরপতনের শিকার হলো পুঁজিবাজার। গতকাল দেশের প্রধান পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) প্রধান সূচক ডিএসইএক্স ৪১ দশমিক ৩০ পয়েন্ট অবনতির শিকার হয়েছে। এর আগে রোববার বাজারটি ওই সূচকের ৪৪ দশমিক ১৭ পয়েন্ট হারায়। সে হিসাবে গত দু’দিনে ডিএসই প্রধান সূচকটির ৮৫ পয়েন্টের বেশি হারায় যা প্রায় ২ শতাংশ। গতকাল বাজারটির দুই বিশেষায়িত সূচক ডিএসই-৩০ ও ডিএসই শরিয়াহ হারায় যথাক্রমে ১৯ দশমিক ০৫ ও ৫ দশমিক ০৩ পয়েন্ট। দেশের দ্বিতীয় পুঁজিবাজার চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জে (সিএসই) রোববার সূচকের বড় পতন ঘটলেও গতকাল তেমনটি ঘটেনি। লেনদেনের মাঝামাঝি সময়ে এসে সিএসইতে গতকাল সূচকের অবনতি ঘটে নামমাত্র।

সূচকের পতনে সূচকের দু’ধরনের আচরণ থাকলেও গতকাল উভয় পুঁজিবাজারেই লেনদেনের উন্নতি ঘটে। ঢাকা শেয়ারবাজারে গতকাল ৬৬৩ কোটি টাকার লেনদেন নিষ্পত্তি হয় যা আগের দিন অপেক্ষা ১৭ কোটি টাকা বেশি। রোববার ডিএসইর লেনদেন ছিল ৬৪৬ কোটি টাকা। চট্টগ্রাম শেয়ারবাজারে লেনদেন পৌঁছে যায় ৫৯ কোটি টাকায়। এটি দেশের আঞ্চলিক এই পুঁজিবাজারটির সাম্প্রতিক সময়ে সর্বোচ্চ লেনদেন। তবে গতকালের সংঘটিত এ লেনদেনের মধ্যে ৪০ কোটি ৫০ লাখ টাকার একক লেনদেন ছিল বীমা খাতের বেসরকারি খাতের সাধারণ বীমা কোম্পানি সিটি জেনারেল ইন্স্যুরেন্সের। বাজার সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, টানা পতনের মধ্যেও লেনদেনে একটি সম্মানজনক অবস্থান ধরে রাখাই প্রমাণ করে ঝুঁকির মধ্যেও বিনিয়োগকারীরা বাজারের সাথে থাকতে চান।

গতকালের বাজার আচরণ বিশ্লেষণে দেখা যায়, বিনিয়োগকারীরা আগের দিনের মতোই ঝুঁকিপূর্ণ কোম্পানিতে নিজেদের বিনিয়োগ অব্যাহত রেখেছেন। গতকালও লেনদেনের শীর্ষে উঠে আসে একমি পেস্টিসাইডস। দিনের শুরুতে কোম্পানিটির শেয়ারের বেশ কিছুটা মূল্যবৃদ্ধি ঘটলেও পতনের বাজারে তা ধরে রাখতে পারেনি। একই অবস্থা ছিল লেনদেনের দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা ওরিয়ন ইনফিউশনের। লেনদেনের দিক থেকে এগিয়ে থাকলেও দিনশেষে এটিও পতনের শিকার ছিল। অন্য দিকে মূল্যবৃদ্ধিতে ডিএসইর শীর্ষে উঠে আসা কোম্পানি হাক্কানি পেপার অ্যান্ড পাল্পের পিই রেশিও তথা মূল্য আয় অনুপাত গতকাল ছিল ১২৬৫ যা পুঁজিবাজারের সূত্র অনুসারে চরম ঝুঁকিতে। এভাবেই যুদ্ধের এ চরম মুহূর্তেও বিনিয়োগকারীদের একটি বড় অংশই ঝুঁকি মাথায় নিয়ে নিজেদের বিনিয়োগের মধ্যে রাখছেন।

গতকাল ডিএসইতে লেনদেনের শীর্ষে ছিল একমি পেস্টিসাইডস। ১৯ কোটি ৬২ লাখ টাকায় কোম্পানিটির ৯৭ লাখ ৭৫ হাজার শেয়ার হাতবদল হয় গতকাল। ১৮ কোটি ৯৭ লাখ টাকায় পাঁচ লাখ ৫৪ হাজার শেয়ার বেচাকেনা করে ওরিয়ন ইনফিউশন ছিল দ্বিতীয় অবস্থানে। ডিএসইর লেনদেন শীর্ষ দশ কোম্পানির অন্যগুলো ছিল যথাক্রমে ব্র্যাক ব্যাংক, ইনটেক অনলাইন, টেকনোড্রাগস, সানলাইফ ইন্স্যুরেন্স, হাক্কানি পেপার অ্যান্ড পাল্প, এশিয়াটিক ল্যাবরেটরিজ, সামিট অ্যালাইয়েন্স পোর্ট ও ফাইন ফুডস।

মূল্যবৃদ্ধিতে ডিএসইর শীর্ষ কোম্পানি ছিল হাক্কানি পেপারস অ্যান্ড পাল্প। কোম্পানিটির মূল্যবৃদ্ধির হার ছিল ৯ দশমিক ৯২ শতাংশ। ৯ দশমিক ৪৭ শতাংশ মূল্যবৃদ্ধি পেয়ে এ তালিকায় দ্বিতীয কোম্পানি ছিল তথ্যপ্রযুক্তি খাতের ইনটেক অনলাইন। ডিএসইর মূল্যবৃদ্ধিতে শীর্ষ দশ কোম্পানির অন্যগুলো ছিল যথাক্রমে আইএফআইসি ফার্স্ট মিউচুয়াল ফান্ড, ইনফরমেশন সার্ভিসেস নেটওয়ার্ক, এপেক্স ট্যানারি, এনার্জি প্যাক পাওয়ার জেনারেশন, সানলাইফ ইন্স্যুরেন্স, কপারটেক ইন্ডাস্ট্রিজ, ড্রাগন সোয়েটার অ্যান্ড স্পিনিং ও এশিয়াটিক ল্যাবরেটরিজ।

গতকাল ডিএসইতে দরপতনের শীর্ষ কোম্পানির বেশির ভাগই ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠান। বেশ কিছুদিন কোম্পানিগুলোর মূল্যবৃদ্ধি ঘটলেও গতকাল আবার দরপতনের শিকার হলো। দিনের সর্বোচ্চ দরপতনের শিকার ছিল প্রাইম ফিন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট। গতকাল ৯ দশমিক ২৫ শতাংশ দর হারায় কোম্পানিটি। ৮ দশমিক ৫৭ শতাংশ দর হারিয়ে এ তালিকায় দ্বিতীয ছিল এফএএস ফিন্যান্স। দরপতনে ডিএসইর শীর্ষ দশ কোম্পানির অন্যগুলো ছিল যথাক্রমে ফারইস্ট ফিন্যান্স, পিপল লিজিং অ্যান্ড ফিন্যান্স, বিআইএফসি, ইন্টারন্যাশনাল লিজিং অ্যান্ড ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস, প্রিমিয়ার লিজিং, ফ্যামিলিটেক্স ও বে-লিজিং।