সাক্ষী মারুফের জবানবন্দী

রক্তে ভিজেছিল শরীর, বাঁচাতে পারিনি বন্ধুকে

নিজস্ব প্রতিবেদক
Printed Edition
  • জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের বিচার
  • মানবতাবিরোধী অপরাধ

জুলাই-আগস্টের গণ-আন্দোলন চলাকালে রাজধানীর রামপুরায় ২৮ জনকে হত্যার অভিযোগে দায়ের করা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে অত্যন্ত আবেগঘন ও লোমহর্ষক জবানবন্দী দিয়েছেন প্রত্যক্ষদর্শী সাক্ষী মো: মারুফ হোসেন। পাওয়ার গ্রিড অব বাংলাদেশ কোম্পানির অ্যাসিস্ট্যান্ট মার্কেটিং ম্যানেজার হিসেবে কর্মরত ২৬ বছর বয়সী মারুফ গতকাল মঙ্গলবার ট্রাইব্যুনাল-১-এর বিচারপতি মো: শফিউল আলম মাহমুদ এবং অবসরপ্রাপ্ত জেলা ও দায়রা জজ মো: মোহিতুল হক এনাম চৌধুরীর বেঞ্চে দাঁড়িয়ে সেদিনের সেই ভয়াবহ স্মৃতিচারণ করেন।

জবানবন্দীতে মারুফ জানান, গত ১৮ জুলাই ২০২৪ তারিখে অফিস ভবনের ১৩ তলা থেকে তিনি নিজ চোখে দেখেন যে, কোটা সংস্কার আন্দোলনে অংশ নেয়া ছাত্রদের ওপর র‌্যাবের হেলিকপ্টার থেকে নির্বিচারে গুলি বর্ষণ করা হচ্ছে। পরদিন ১৯ জুলাই সকালে সারা দেশে ইন্টারনেট বন্ধ থাকার প্রেক্ষাপটে তার সহকর্মী রাকিব তার বাসায় আসেন। অফিসে ইন্টারনেট সচল আছে কি না তা দেখতে তারা দুইজন আফতাবনগরের অফিসে যান। সেখানেও ইন্টারনেট না পেয়ে ফেরার পথে তারা দেখেন ছাত্ররা মিছিল নিয়ে রামপুরা মেইন রোডের দিকে অগ্রসর হচ্ছে। সহকর্মী রাকিবের আহ্বানে সাড়া দিয়ে মারুফও ছাত্রদের সাথে আন্দোলনে যোগ দেন।

মারুফ হোসেন বলেন, তারা যখন আফতাবনগর গেট পার হয়ে রামপুরা ব্রিজের দিকে এগোচ্ছিলেন, তখন দেখতে পান ওয়াসা গেট দিয়ে বিজিবি ও পুলিশ অস্ত্রসহ এগিয়ে আসছে। রামপুরা ব্রিজ এলাকা থেকে পুলিশ ও বিজিবি আন্দোলনকারীদের লক্ষ্য করে নির্বিচারে গুলি ছুড়তে শুরু করলে তারা পিছু হটে একটি যাত্রী ছাউনির নিচে আশ্রয় নেন। এরপর রাকিব মেইন রোডের একটি বটগাছের আড়াল থেকে মোবাইলে ভিডিও করার চেষ্টা করামাত্রই বিজিবি ও পুলিশের গুলিতে বিদ্ধ হয়ে পেছনের দিকে পড়ে যান। মারুফ দ্রুত তার কাছে গিয়ে দেখতে পান রাকিবের তলপেট দিয়ে ফিনকি দিয়ে রক্ত বের হচ্ছে।

সাক্ষী আরো জানান, গুলিবিদ্ধ রাকিবকে কোলে জড়িয়ে ধরে তিনি যখন সাহায্য খুঁজছিলেন, তখন একটি রিকশা পেলেও বিজিবি ও পুলিশের পুনরায় গুলিবর্ষণের শব্দে রিকশাচালক ভয়ে রিকশা রেখে পালিয়ে যান। পরে স্থানীয়দের সহায়তায় রাকিবকে নিকটস্থ নাগরিক হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে অবস্থার অবনতি হলে ডাক্তাররা তাকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তরের পরামর্শ দেন। এরই মধ্যে রাকিবের পরিবারকে খবর দিলে তার মা ও দুলাভাই হাসপাতালে আসেন এবং তাকে অ্যাম্বুলেন্সে ঢাকা মেডিক্যালে নিয়ে যান। মারুফ জানান, নিজের শরীরে বন্ধুর রক্তের দাগ লেগে থাকায় তিনি তখন সাথে যেতে পারেননি। ওই দিন জুমার নামাজে বন্ধুর জন্য শেষবার দোয়া করেছিলেন তিনি, কিন্তু নামাজ শেষে বাসায় ফিরেই দুঃসংবাদ পান যে রাকিব মারা গেছেন। বিজিবির সাবেক কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কর্নেল রেদোয়ানুল ইসলামসহ চারজনের বিরুদ্ধে চলা এই বিচার প্রক্রিয়ায় মারুফ হোসেনের দেয়া এই সাক্ষ্য ছিল এক জ্বলন্ত দলিল।