ইসলামী ব্যাংকে সুশাসন ও স্বচ্ছতা চান অবসরপ্রাপ্ত ব্যাংকাররা
Printed Edition
বিশেষ সংবাদদাতা
দেশের ইসলামী ব্যাংকিং খাতে সুশাসন, স্বচ্ছতা ও পেশাদারিত্ব ফিরিয়ে আনার আহ্বান জানিয়েছে অবসরপ্রাপ্ত ইসলামী ব্যাংকারদের সংগঠন ‘অ্যাসোসিয়েশন অব রিটায়ার্ড ইসলামী ব্যাংকার্স’ (এরিব)। সংগঠনটির কার্যনির্বাহী কমিটির এক সভায় ব্যাংকিং খাত, বিশেষ করে ইসলামী ব্যাংকগুলোর সাম্প্রতিক পরিস্থিতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়। সভায় বক্তারা বলেন, দীর্ঘদিন ধরে জনগণের আস্থা ও ভালোবাসায় গড়ে ওঠা ইসলামী ব্যাংকিং ব্যবস্থা গত এক দশকে নজিরবিহীন লুটপাট, অনিয়ম ও দুর্নীতির শিকার হয়েছে। এমতাবস্থায় লুটেরারা দেশের ব্যাংকিং খাতে ফিরে আসতে পারে এমন অপচেষ্টা বন্ধ করতে তারা সরকারের প্রতি আহ্বান জানান।
অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি নূরুল ইসলাম খলিফার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় উপস্থিত ছিলেন ইসলামী ব্যাংকের সাবেক উপব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ আবদুল্লাহ মোহাম্মদ সালেহ, ইঞ্জিনিয়ার আবুল বাশার, আবদুর রাজ্জাক ভূঁইয়া, এ এ এম হাবিবুর রহমান, আল আরাফাহ ইসলামী ব্যাংকের সাবেক এক্সিকিউটিভ ভাইস প্রেসিডেন্ট ইঞ্জিনিয়ার মুহাম্মদ গোলাম সারওয়ার এবং মুজিবুর রহমান, ইসলামী ব্যাংকের সাবেক এক্সিকিউটিভ ভাইস প্রেসিডেন্ট এ কে এম শহীদুল হক খন্দকার, মো: ফাইজুল কবীর, তোফাজ্জল হোসাইন খান এবং ব্যাংকের ভাইস প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ জালাল উদ্দিন।
সভায় বলা হয়, ১৯৮৩ সালে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে দেশে ইসলামী ব্যাংকিংয়ের যাত্রা শুরু হয়। পরবর্তীতে এ খাত দ্রুত সম্প্রসারিত হয়ে দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে সক্ষম হয়। ২০১৬ সাল পর্যন্ত ইসলামী ব্যাংকিং খাত ছিল দেশের সবচেয়ে দ্রুত বিকাশমান আর্থিক খাতগুলোর একটি। সে সময় দেশে ১০টি পূর্ণাঙ্গ ইসলামী ব্যাংক এবং ২৫টিরও বেশি প্রচলিত ব্যাংকের ইসলামী ব্যাংকিং শাখা ও উইন্ডো কার্যক্রম চালু ছিল। বিশেষ করে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসি এককভাবে দেশের প্রায় ৩০ শতাংশ রেমিট্যান্স আহরণ করত এবং বিশ্বের সেরা এক হাজার ব্যাংকের তালিকায়ও স্থান করে নেয়।
এরিবের নেতারা অভিযোগ করেন, গত ফ্যাসিস্ট সরকারের আমলে কয়েকটি ইসলামী ব্যাংকে সঙ্ঘবদ্ধভাবে লুটপাট চালানো হয়। ভুয়া ঋণ বিতরণ, আর্থিক অনিয়ম এবং হিসাব জালিয়াতির মাধ্যমে হাজার হাজার কোটি টাকা পাচার করা হয়েছে। এসব অনিয়মের ফলে ব্যাংকগুলোর প্রকৃত আর্থিক অবস্থা গোপন রাখতে কৃত্রিমভাবে মুনাফা দেখানো হয় এবং সেই ভিত্তিতে লভ্যাংশও বিতরণ করা হয়, যা মূলত আমানতকারীদের অর্থ থেকেই দেয়া হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তারা।
সভায় আরো বলা হয়, ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের পর কয়েকটি ব্যাংকের আর্থিক হিসাব পুনঃনিরীক্ষা করতে হয়েছে। এতে পূর্বে প্রকাশিত আর্থিক প্রতিবেদনের সাথে বড় ধরনের অসঙ্গতি ধরা পড়ে। একই সাথে রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে মেধা ও যোগ্যতা যাচাই ছাড়াই নির্দিষ্ট একটি অঞ্চলের হাজার হাজার মানুষকে ব্যাংকগুলোতে চাকরি দেয়া হয়েছে বলেও অভিযোগ তোলা হয়। এতে দেশের অন্যান্য অঞ্চলের শিক্ষিত বেকার তরুণদের সাংবিধানিক অধিকার ক্ষুণœ হয়েছে বলে মনে করেন বক্তারা।
এরিবের নেতারা বলেন, দেশের ব্যাংকিং খাতে এমন ভয়াবহ নৈরাজ্য ও লুটপাট বিশ্ব ইতিহাসেও বিরল। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বিভিন্ন তদন্ত, ফরেনসিক অডিট এবং গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্যের কারণে সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্যাংকিং খাত নিয়ে আস্থাহীনতা তৈরি হয়েছে। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে অন্তর্বর্তী সরকার পাঁচটি ইসলামী ব্যাংককে একীভূত করার উদ্যোগ নিতে বাধ্য হয়েছে। কিন্তু এসব ব্যাংকের ভবিষ্যৎ কী হবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়। ফলে আমানতকারীদের মধ্যে উদ্বেগ ও অনিশ্চয়তা বাড়ছে।
সভায় ইসলামী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ওমর ফারুককে সাম্প্রতিক সময়ে ছুটিতে পাঠানোর ঘটনাও আলোচনায় আসে। বক্তারা বলেন, দীর্ঘদিন ধরে সুনামের সাথে দায়িত্ব পালন করা এই ব্যাংকারের নেতৃত্বে ব্যাংকটি ধীরে ধীরে স্থিতিশীলতার পথে ফিরছিল। কিন্তু হঠাৎ করে কোনো কারণ উল্লেখ ছাড়াই তাকে ছুটিতে পাঠানোয় গ্রাহক ও শুভানুধ্যায়ীদের মধ্যে নতুন করে উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে। তারা আশঙ্কা প্রকাশ করেন, এর মাধ্যমে অতীতে লুটপাটে সহায়তাকারী কিছু কর্মকর্তাকে পুনর্বহালের চেষ্টা চলছে।
সভায় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ভূমিকাও প্রশ্নবিদ্ধ করা হয়। বক্তারা বলেন, অতীতের অনিয়ম ও লুটপাট নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতার দায় বাংলাদেশ ব্যাংক এড়াতে পারে না। তাই নতুন করে এমন কোনো সিদ্ধান্ত নেয়া উচিত হবে না, যা জনগণের আস্থার সঙ্কট আরো বাড়িয়ে দিতে পারে।
সভা থেকে পাঁচ দফা দাবি জানানো হয়। দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে- ব্যাংক রেজুলেশন আইনের ১৮(ক) ধারা বাতিল, ব্যাংক পরিচালনা থেকে লুটেরাদের অপসারণ, পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনার কার্যকর উদ্যোগ, দায়ীদের বিচারের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা এবং ইসলামী ব্যাংকের প্রকৃত মালিকদের কাছে মালিকানা ফিরিয়ে দেয়া।