ব্রিটেনের কারাগারে ফিলিস্তিনপন্থী কর্মীদের নির্যাতন

ইরান যুদ্ধের আড়ালে অনিশ্চিত গাজা শান্তি প্রক্রিয়া

Printed Edition

নয়া দিগন্ত ডেস্ক

গাজা উপত্যকায় আনুষ্ঠানিকভাবে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার প্রায় ছয় মাস অতিবাহিত হলেও ফিলিস্তিনি জনপদে শান্তির সম্ভাবনা ক্রমেই ফিকে হয়ে আসছে। ২০২৫ সালের ১০ অক্টোবর ঘোষিত সেই যুদ্ধবিরতির পর থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত গাজায় নিহতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭২ হাজার ২৬৮ জনে। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যে ইরান ও ইসরাইলের মধ্যে নতুন করে শুরু হওয়া সরাসরি সঙ্ঘাতের ফলে বিশ্ববাসীর মনোযোগ গাজা থেকে সরে যাওয়ায় পরিস্থিতি আরো জটিল আকার ধারণ করেছে।

এক দিকে ইসরাইলি বাহিনীর অব্যাহত বিমান হামলা ও স্থল অভিযান, অন্য দিকে গাজার বাজারে নিত্যপণ্যের তীব্র সঙ্কট ও আকাশচুম্বী মূল্যবৃদ্ধি সাধারণ মানুষের জীবনকে এক চরম অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিয়েছে। সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ঘোষিত ২০ দফা শান্তি পরিকল্পনা নিয়ে যখন আন্তর্জাতিক মহলে আলোচনা চলছে, ঠিক তখনই গাজার আল-শিফা হাসপাতালে রক্তের তীব্র সঙ্কট এবং পশ্চিমতীরে ইসরাইলি বসতি স্থাপনকারীদের পরিকল্পিত সহিংসতা এক ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়ের ইঙ্গিত দিচ্ছে।

শান্তির সম্ভাবনা নিয়ে অনিশ্চয়তা বাড়ছে

গাজায় দীর্ঘস্থায়ী শান্তির যে আশা নিয়ে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়েছিল, তা এখন কেবল কাগজ-কলমেই সীমাবদ্ধ বলে মনে করছেন স্থানীয় বাসিন্দা ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। বিবিসির প্রতিবেদন অনুযায়ী, গাজার বাজারে আবার পণ্যের ঘাটতি ও উচ্চমূল্য দেখা দিয়েছে। ইসরাইল থেকে পণ্য সরবরাহ ব্যবস্থা নতুন আঞ্চলিক যুদ্ধের প্রভাবে মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। গাজার সাধারণ মানুষ এখন প্রশ্ন তুলছেন, ইরান-ইসরাইল সঙ্ঘাতের সাথে তাদের ভাগ্য কেন জড়িয়ে ফেলা হচ্ছে। হাসান ফাকাওয়ি নামক এক স্থানীয় বাসিন্দা বিবিসিকে জানান, বাজারে পণ্যের দাম দ্বিগুণ হয়ে গেছে এবং পণ্য সরবরাহ প্রায় বন্ধের পথে। গাজাবাসীর অভিযোগ, বিশ্ব এখন ইরান সঙ্কট নিয়ে ব্যস্ত থাকায় গাজা কার্যত উপেক্ষিত হয়ে পড়েছে।

এ দিকে ডোনাল্ড ট্রাম্পের ২০ দফা শান্তি পরিকল্পনার একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে এসে থমকে গেছে পুরো প্রক্রিয়া। জাতিসঙ্ঘ নিরাপত্তা পরিষদে উপস্থাপিত এক প্রস্তাবে ফিলিস্তিনি সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর নিরস্ত্রীকরণের বিনিময়ে পুনর্গঠন কার্যক্রম শুরুর কথা বলা হলেও হামাস তা প্রত্যাখ্যান করতে পারে বলে প্রবল ধারণা করা হচ্ছে। আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো বলছে, প্রয়োজনীয় জ্বালানি, পানি ও অবকাঠামো মেরামতের সরঞ্জাম প্রবেশ করতে না পারায় গাজার পুনর্গঠন কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়েছে। যদিও ইসরাইলি কর্তৃপক্ষ এর দায় হামাসের ওপর চাপাচ্ছে, তবে গাজার মানুষ ক্রমেই সন্দিহান হয়ে পড়ছে যে এই শান্তি পরিকল্পনা আদৌ বাস্তবায়িত হবে কি না।

ইসরাইলি হামলায় দুই ভাই নিহত

যুদ্ধবিরতির শর্ত লঙ্ঘন করে গাজা উপত্যকায় ইসরাইলি হামলা থামছে না। ফিলিস্তিনি বার্তা সংস্থা ওয়াফার বরাতে জানা গেছে, গাজা সিটির পূর্বাঞ্চলীয় শামা এলাকায় ইসরাইলি বিমান হামলায় ফাহমি ও সাঈদ ওমর কাদ্দুম নামের দুই ভাই নিহত হয়েছেন। এই ঘটনায় আরো বেশ কয়েকজন বেসামরিক নাগরিক আহত হয়েছেন। স্থানীয় সূত্রগুলো জানিয়েছে, ইসরাইলি বাহিনী আবাসিক এলাকায় সরাসরি গুলি ও গোলাবর্ষণ করেছে। এ ছাড়া জেইতুন, শুজাইয়া ও তুফাহ এলাকায় ট্যাংক থেকে ছোড়া গোলার আঘাতে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। ২০২৫ সালের ১০ অক্টোবর থেকে কার্যকর হওয়া যুদ্ধবিরতির পরও নিয়মিত এই ধরনের হামলার ঘটনা গাজায় স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার প্রচেষ্টাকে নস্যাৎ করছে এবং বেসামরিক মানুষের জীবনকে চরম ঝুঁকির মধ্যে ফেলছে।

পশ্চিমতীরে বসতি স্থাপনকারীদের হামলা

গাজার পাশাপাশি অধিকৃত পশ্চিমতীরেও সহিংসতা ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। ইসরাইলি দৈনিক হারেটজের এক চাঞ্চল্যকর প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, প্রায় ২০০ ইসরাইলি রিজার্ভ সেনা দেশটির প্রতিরক্ষামন্ত্রী ও সেনাপ্রধানকে চিঠি দিয়ে বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। সেনাদের অভিযোগ, অনেক ক্ষেত্রে ফিলিস্তিনিদের ওপর হামলার আগাম তথ্য থাকা সত্ত্বেও সেনাবাহিনী সময়মতো হস্তক্ষেপ করে না। বরং হামলা শেষ হওয়ার পর ঘটনাস্থলে পৌঁছে তারা বসতি স্থাপনকারীদের রক্ষার চেষ্টা করে এবং উল্টো ফিলিস্তিনিদেরই আটক করে। একজন সেনা জানিয়েছেন, ফিলিস্তিনিরা হামলার শিকার হলেও তাদের ওপরই কখনো কখনো গুলি চালানো হয়েছে। গাজা যুদ্ধের সময় দেখা যাওয়া ‘অতিরিক্ত সহিংসতা ও ধ্বংসের প্রবণতা’ এখন পশ্চিমতীরেও ছড়িয়ে পড়েছে, যা ওই অঞ্চলের নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে আরও নাজুক করে তুলছে।

বাড়ি-ঘর গুঁড়িয়ে দিলো ইসরাইলি বাহিনী

ইসরাইলি বাহিনীর শাস্তিমূলক পদক্ষেপের অংশ হিসেবে পশ্চিমতীরের নাবলুসে ফিলিস্তিনিদের বাড়িঘর ধ্বংসের প্রক্রিয়া অব্যাহত রয়েছে। গত বুধবার নাবলুসের হালাওয়া সড়কে মাহমুদ আল-আক্কাদের পরিবারের বাড়ি বিস্ফোরক দিয়ে গুঁড়িয়ে দেয়া হয়েছে। মাহমুদ আল-আক্কাদ গত বছরের সেপ্টেম্বরে ইসরাইলি বাহিনীর গুলিতে নিহত হয়েছিলেন। বাড়ি ধ্বংসের আগে আশপাশের এলাকা থেকে বাসিন্দাদের সরিয়ে নেয়া হয় এবং পুরো এলাকাটি ঘিরে ফেলা হয়। এ সময় ওসারিন এলাকায় একাধিক বাড়িতে তল্লাশি ও বাসিন্দাদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। ফিলিস্তিনি মানবাধিকার সংগঠনগুলো এই ধরনের ঘরবাড়ি ধ্বংস করাকে আন্তর্জাতিক আইনের পরিপন্থী ও সমষ্টিগত শাস্তি হিসেবে আখ্যায়িত করেছে।

এক মাসে ৪০০-এর বেশি হামলা

ফিলিস্তিনি ওয়াল অ্যান্ড সেটেলমেন্ট রেজিস্ট্যান্স কমিশনের তথ্যানুযায়ী, গত এক মাসে পশ্চিমতীরে ইসরাইলি বসতি স্থাপনকারীরা ৪৪৩টি পরিকল্পিত হামলা চালিয়েছে। এসব হামলায় অন্তত ৯ জন ফিলিস্তিনি প্রাণ হারিয়েছেন এবং ছয়টি বেদুইন সম্প্রদায়কে তাদের আদি নিবাস থেকে উচ্ছেদ করা হয়েছে। কমিশনের প্রধান মুয়াইয়াদ শাবান জানান, এই হামলাগুলো ছিল অত্যন্ত সংগঠিত, যেখানে গুলি ও অগ্নিসংযোগের মাধ্যমে সম্পত্তি ধ্বংস করা হয়েছে। এই এক মাসেই ১৪টি নতুন অবৈধ বসতি স্থাপনের চেষ্টা এবং এক হাজার ৩৯১ ডুনাম এলাকার গাছ উপড়ে ফেলার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। এই সহিংসতার ফলে নারী ও শিশুসহ অন্তত ৫৮টি পরিবার সম্পূর্ণ বাস্তুচ্যুত হয়ে পড়েছে।

রক্ত সঙ্কটে আল-শিফা হাসপাতাল

মানবিক সঙ্কটের চরম পর্যায়ে পৌঁছেছে গাজার বৃহত্তম চিকিৎসাকেন্দ্র আল-শিফা হাসপাতাল। গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এক জরুরি বিবৃতিতে জানিয়েছে, অব্যাহত অবরোধ ও সঙ্ঘাতের কারণে হাসপাতালের ব্লাড ব্যাংকে রক্তের মজুদ বিপজ্জনকভাবে কমে গেছে। সব ধরনের রক্তের জরুরি প্রয়োজন জানিয়ে সাধারণ মানুষকে রক্তদানের আহ্বান জানানো হয়েছে। চিকিৎসকরা বলছেন, আহত রোগীদের অস্ত্রোপচার ও জীবন বাঁচাতে এক ফোঁটা রক্তও এখন অত্যন্ত মূল্যবান। কিন্তু প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সরঞ্জাম ও জ্বালানির অভাবে স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা পুরোপুরি ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়েছে।

গাজায় বেড়েছে নিহতের সংখ্যা

গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া এই দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধে নিহতের মোট সংখ্যা ৭২ হাজার ২৬৮ জনে পৌঁছেছে। এর মধ্যে ২০২৫ সালের ১০ অক্টোবর কার্যকর হওয়া যুদ্ধবিরতির পরবর্তী সময়েও ৬৯২ জন নিহত হয়েছেন। বর্তমানে আহতের সংখ্যা এক লাখ ৭১ হাজার ৯৯৫ জন। তবে কর্মকর্তাদের আশঙ্কা, প্রকৃত নিহতের সংখ্যা আরো অনেক বেশি হতে পারে, কারণ এখনো হাজার হাজার মানুষ ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে রয়েছেন। উদ্ধার কার্যক্রমের প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি না থাকায় ধ্বংসস্তূপ থেকে লাশগুলো বের করে আনা সম্ভব হচ্ছে না। এই ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয় গাজার ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে এক গভীর সঙ্কটের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

ব্রিটেনে ফিলিস্তিনপন্থী কর্মীদের নির্যাতন

ফিলিস্তিনিদের পক্ষে প্রতিবাদ করতে গিয়ে ব্রিটেনের কারাগারে বন্দী হওয়া অ্যাক্টিভিস্টরা ভয়াবহ নির্যাতনের অভিযোগ তুলেছেন। প্যালেস্টাইন অ্যাকশনের কর্মী কামরান আহমেদ জানিয়েছেন, লন্ডনের এইচএমপি পেন্টনভিলে অনশন চলাকালে তাকে যথাযথ চিকিৎসা দেয়া হয়নি। এমনকি হাসপাতালে নেয়ার সময় এবং গোসলের সময়ও তাকে হাতকড়া পরিয়ে রাখা হতো। অন্য বন্দীদের অভিযোগ, তাদের ‘কুকুরের মতো শিকল দিয়ে’ বেঁধে রাখা হয়েছিল এবং মানসিক নির্যাতন করা হয়েছে।

যদিও যুক্তরাজ্যের বিচার মন্ত্রণালয় এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছে, তবে এই ঘটনা আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মহলে নতুন করে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। সামগ্রিকভাবে, গাজা ও পশ্চিমতীরের পরিস্থিতি বর্তমানে এক জটিল সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। এক দিকে আন্তর্জাতিক মহলের স্থবির শান্তি প্রক্রিয়া, অন্য দিকে মাঠ পর্যায়ে নিরন্তর সঙ্ঘাত ও মানবিক হাহাকার- এই দুইয়ের যাঁতাকলে পিষ্ট হচ্ছে সাধারণ ফিলিস্তিনিরা। ইরান-ইসরাইল যুদ্ধের নতুন সমীকরণ গাজার সমস্যাকে দীর্ঘায়িত করবে কি না, তা নিয়ে এখন জনমনে গভীর সংশয় দেখা দিয়েছে।