সিলেটে তাবলিগ আমির হত্যা
ম্যাজিস্ট্রেটের রুমে নারী পুলিশ, জবানবন্দী অবৈধ হওয়ায় ১১ বছর পর খালাস
Printed Edition
- জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের বিচার
- মানবতাবিরোধী অপরাধ
এক দশকেরও বেশি সময় আগে সিলেটে নিজ বাড়িতে খুন হন তাবলিগ জামাতের স্থানীয় আমির ইব্রাহিম আবু খলিল। এই ঘটনায় দায়ের করা হত্যা মামলায় বিচারিক আদালত ও হাইকোর্টে মৃত্যুদণ্ডাদেশ পাওয়া তার স্ত্রী ফাতিহা মাশকুরাকে সম্পূর্ণ খালাস দিয়েছেন সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ। গতকাল বুধবার প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন চার সদস্যের আপিল বেঞ্চ এই রায় ঘোষণা করেন।
১১ বছর কারাভোগের পর (যার মধ্যে ১০ বছরই তিনি কনডেমড সেলে মৃত্যুর প্রহর গুনেছেন) ফাতিহা মাশকুরার মুক্তিতে এখন আর কোনো আইনি বাধা নেই। এই রায় ও নেপথ্যের আইনি লড়াইয়ের বিস্তারিত নিয়ে নয়া দিগন্তের সাথে কথা বলেছেন আপিলকারী পক্ষের সিনিয়র আইনজীবী এস এম শাহজাহান।
তিনি বলেন, ‘বিচারিক আদালত ফাতিহাকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছিলেন, যা হাইকোর্ট বহাল রাখেন। এর বিরুদ্ধে আমরা ২০২৪ সালে আপিল করি। বুধবার আপিল বিভাগ আমাদের আপিল মঞ্জুর করে বিচারিক আদালত ও হাইকোর্টের আগের সব রায় বাতিল করে দিয়েছেন। আপিলকারীকে সম্পূর্ণ নির্দোষ সাব্যস্ত করে খালাস দেয়া হয়েছে।’ তিনি জানান, ফাতিহা বর্তমানে কারা হেফাজতে জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। তার শারীরিক অবস্থা বিবেচনা করে আদালত দ্রুত মুক্তির জন্য একটি অগ্রিম আদেশ দিয়েছেন।
মামলাটির দুর্বলতা ও খালাস পাওয়ার মূল আইনি ভিত্তি ব্যাখ্যা করে এস এম শাহজাহান বলেন, ‘আমরা পুরো মামলা পর্যালোচনা করে দেখেছি, এই হত্যাকাণ্ডে ফাতিহার বিরুদ্ধে কোনো এভিডেন্স ছিল না। সাক্ষ্য আইনের ৩ ধারা মতে, আদালতে দাঁড়িয়ে যখন একজন সাক্ষী সাক্ষ্য দেন, তাকে ‘কম্পিটেন্ট উইটনেস’ বলা হয়। এই সাক্ষ্য ডাইরেক্ট (প্রত্যক্ষ), ইনডাইরেক্ট (পরোক্ষ), অকিউলার (চাক্ষুষ) কিংবা সার্কামস্টানশিয়াল (পারিপার্শ্বিক) যেকোনো ধরনের হতে পারত। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে, এই মামলায় কোনো ধরনের কোনো এভিডেন্স বা চাক্ষুষ সাক্ষী ছিল না।’
তিনি নেপথ্যের ঘটনা তুলে ধরে বলেন, ‘২০১৫ সালের ১৭ মে রাতের বেলা ঘটনা ঘটে। ১৮ মে সকালে পুলিশ গিয়ে তাকে বাসা থেকে নিয়ে আসে। এরপর ১৮ তারিখ সারাদিন তাকে পুলিশ কাস্টোডিতে (হেফাজতে) রাখা হয়। সেখানে রেখে পুলিশ তার একটি বক্তব্য ভিডিও রেকর্ড করে। এরপর ১৯ তারিখে তাকে ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে পাঠানো হয় তথাকথিত স্বীকারোক্তি রেকর্ড করার জন্য। এই একটি মাত্র জিনিসকেই প্রসিকিউশন পক্ষ তাকে শাস্তি দেয়ার একমাত্র উপকরণ হিসেবে ব্যবহার করেছিল। এই কনফেশনাল স্টেটমেন্ট (স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দী) ছাড়া এই মামলায় আর কিছু ছিল না।’
সিনিয়র এই আইনজীবী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘আসামি প্রথম সুযোগেই (আর্লিয়েস্ট অপরচুনিটি) আদালত ও জেলখানা থেকে লিখিতভাবে এই স্বীকারোক্তি প্রত্যাহারের আবেদন জমা দিয়েছিলেন। ট্রায়াল কোর্ট বা হাইকোর্ট কেন এটি বিবেচনায় নেননি, তা নিয়ে আমি মন্তব্য করব না। তবে আমরা আপিল বিভাগে এটি বিস্তারিত বুঝিয়েছি।’
তিনি সুপ্রিম কোর্টের শুনানির অভিজ্ঞতা শেয়ার করে বলেন, ‘আমি মাননীয় প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বাধীন পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চের কাছে অত্যন্ত কৃতজ্ঞ যে উনারা প্রচুর মামলার চাপের মাঝেও আমাদের দীর্ঘ সময় ধরে ধৈর্য সহকারে শুনেছেন। আমি কোর্টকে বুঝিয়েছি যে, ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে পাঠানোর আগে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা (আইও) কর্তৃক আসামির বক্তব্য ভিডিও করার কোনো নজির গত ৫০ বছরের ইতিহাসে বাংলাদেশে নেই। এটা করা হয়েছিল আসামির ওপর এক ধরনের মনস্তাত্ত্বিক হুমকি তৈরি করতে, যাতে সে ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে গিয়ে পুলিশের শিখিয়ে দেয়া কথার বাইরে কিছু না বলে।’
আলাপকালে এস এম শাহজাহান মামলার সবচেয়ে বড় আইনি মোড় ঘুরিয়ে দেয়া পয়েন্টটি উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, ‘নথিপত্র পড়তে পড়তে আমরা ও মাননীয় বিচারপতির একজন খেয়াল করলাম যে, যখন ম্যাজিস্ট্রেটের রুমে ফাতিহার স্বীকারোক্তি রেকর্ড করা হচ্ছিল, তখন সেখানে একজন নারী পুলিশ কনস্টেবল উপস্থিত ছিলেন এবং নথিতে তার স্বাক্ষরও রয়েছে। বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের ‘ক্রিমিনাল রুলস অ্যান্ড অর্ডারস’ অনুযায়ী যে ফরম্যাটে স্বীকারোক্তি নিতে হয়, সেখানে আসামিকে চিন্তাভাবনা করার জন্য তিন ঘণ্টা সময় দিতে হবে এবং এই সময়ে সে ম্যাজিস্ট্রেটের পিয়ন বা স্টাফের কাস্টোডিতে থাকবে। সেখানে পুলিশের উপস্থিতি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। যদি পুলিশ উপস্থিত থাকে, তবে সেই কনফেশনের আইনি যোগ্যতা ও মূল্য পুরোপুরি নষ্ট হয়ে যায়।’
হত্যাকাণ্ডের পারিপার্শ্বিকতা তুলে ধরে এই সিনিয়র আইনজীবী বলেন, ‘নিহত ইব্রাহিম আবু খলিল ছিলেন ৫২ বছর বয়সী একজন সুঠাম দেহী পুরুষ। আর আসামি ফাতিহা তিন সন্তানের মা, যার হার্টে দুইবার রিং পরানো হয়েছে এবং তিনি গুরুতর হৃদরোগী। চার্জশিটে বলা হয়েছে, ওই নারী একাই নাকি স্বামীকে প্রথমে রেললাইনের স্লিপার দিয়ে মাথায় আঘাত করেছেন, তারপর পেটে তিনটি ছুরিকাঘাত করেছেন এবং শেষে জবাই করেছেন। শুধু তা-ই নয়, জবাই করার আগে নাকি হাত-পাও রশি দিয়ে বেঁধেছেন। একজন মানুষ জেগে থাকা অবস্থায় বা ঘুমের ঘোরেও একজন অসুস্থ নারী একাকী হাত-পা বাঁধছেন আর পুরুষটি চুপ করে আছেন এটি একেবারেই অসম্ভব। উপরন্তু সুরতহাল রিপোর্টে ঘরের টিনের চাল খোলা থাকার কথা উল্লেখ ছিল, যা প্রমাণ করে কোনো বহিরাগত বা ঘাতক চক্র এই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে, যেখানে ওই নারী অন্য ঘরে তার সন্তানসহ ঘুমাচ্ছিলেন।’
মামলার শেষ মুহূর্তের নাটকীয়তা নিয়ে এস এম শাহজাহান বলেন, মঙ্গলবার যখন মাননীয় বিচারপতি রেজাউল হক সাহেব রাষ্ট্রপক্ষকে এই পুলিশ কনস্টেবলের উপস্থিতির বিষয়ে জবাব দিতে বললেন, তখন বুধবার সকালে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল অনীক আর হক অত্যন্ত পেশাদারিত্বের সাথে স্বীকার করে নেন যে, এই কনফেশনটি আইনত অগ্রহণযোগ্য। যেহেতু এই কনফেশন ছাড়া মামলায় আর কোনো প্রমাণ নেই, তাই রাষ্ট্রপক্ষ আর বহাল রাখার আবেদন করেনি। ফলে আদালত আপিল মঞ্জুর করে আসামিকে খালাস দেন।’
২০১৫ সালের ১৭ মে সিলেট নগরের সওদাগরটুলায় নিজ বাড়ি থেকে ইব্রাহিম আবু খলিলের গলাকাটা লাশ উদ্ধার করা হয়। ১৯ মে পুলিশ বাদি হয়ে কোতোয়ালি থানায় মামলা করে। ২০১৬ সালের ৬ জুন সিলেটের বিচারিক আদালত খলিলের প্রথম স্ত্রী ফাতিহাকে মৃত্যুদণ্ড দেন, যা ২০২২ সালের ৩১ জানুয়ারি হাইকোর্টেও বহাল থাকে।