চট্টগ্রামে ভয়াবহ লোডশেডিং : সংকটে শিল্প, সাধারণ মানুষের নাভিশ্বাস
গ্যাস-কয়লা ও পানির স্তর সঙ্কটে বিদ্যুৎ উৎপাদন নেমেছে অর্ধেকে
Printed Edition
নূরুল মোস্তফা কাজী, চট্টগ্রাম ব্যুরো
বন্দর নগরী চট্টগ্রামের বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর উৎপাদন অর্ধেকের কাছাকাছি নেমে এসেছে। গ্যাস ও কয়লার সঙ্কটে বিভিন্ন বিদ্যুৎকেন্দ্রের ইউনিটগুলো এবং কাপ্তাই পানি বিদ্যুৎকেন্দ্রের চারটি ইউনিট প্রায় বন্ধ। পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়াতে এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। তা ছাড়া পিডিবির মালিকানাধীন ফার্নেস অয়েলনির্ভর বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতেও সক্ষমতার তুলনায় উৎপাদন কম। ফলে বিদ্যুতের লোডশেডিং ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। বিদ্যুৎ একবার গেলে যেন আর আসতেই চায় না। তীব্র তাপদাহ, ভ্যাপসা গরম ও বিদ্যুতের আসা যাওয়ার ভেল্কিবাজিতে বন্দর নগরী চট্টগ্রামে বিদ্যুৎ যন্ত্রণা অসহনীয় পর্যায়ে চলে যাচ্ছে। খোদ বিদ্যুৎ বিভাগই বলছে ২৬০ মেগাওয়াট লোড শেডিংয়ের কথা। তবে বাস্তবে শেডিং অনেক বেশি বলে দাবি ভুক্তভোগীদের।
সরকারি বেসরকারি মিলিয়ে বন্দর নগরী চট্টগ্রামে বিদ্যুৎকেন্দ্রের সংখ্যা ২৩টি। এসবের বর্তমান উৎপাদনক্ষমতা চার হাজার ৮৪৯ মেগাওয়াট। কিন্তু গতকাল বৃহস্পতিবার দিনের বেলায় এসব বিদ্যুৎকেন্দ্রে ২০৯৮ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপন্ন হয় যা থেকে জাতীয় গ্রিডেও সরবরাহ করা হয়ে থাকে। বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন- গ্যাস সঙ্কট, কয়লার সঙ্কট, পিডিবির মালিকানাধীন বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে চাহিদা অনুযায়ী জ্বালানি তেল সরবরাহ না থাকা এবং কাপ্তাই হ্রদের পানির স্তর নেমে যাওয়ায় বিদ্যুৎ উৎপাদন কমে গেছে।
বিদ্যুৎ সঙ্কটে চট্টগ্রামের শিল্প কারখানার উৎপাদনে যেমনি বেহাল অবস্থা বিরাজ করছে, তেমনি জনমনে তীব্র অস্বস্তি শুরু হয়েছে। তীব্র তাপদাহের মধ্যে বিদ্যুতের অভাবে হাসফাঁস পরিস্থিতিতে নানা রোগ বালাইও ছড়াচ্ছে।
পেট্রোবাংলার তথ্য বলছে, চট্টগ্রামের বৃহত বিদ্যুৎকেন্দ্র ২১০ মেগাওয়াট উৎপাদন ক্ষমতা সম্পন্ন রাউজান তাপ বিদ্যুৎকেন্দ্রের দু’টি ইউনিট, শিকলবাহা ৪০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং বাড়বকুণ্ড ২২ মেগাওয়াট বিদ্যুৎকেন্দ্র গ্যাস সঙ্কটে শাটডাউনে রয়েছে। ইরানে মার্কিন-ইসরাইলী হামলার পর হতেই গ্যাস সঙ্কটের কারণে এসব বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ হয়ে যায়। এ ছাড়া শিকলবাহা ১৫০ মেগাওয়াট পিকিং বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদনও শূন্যের ঘরে। পেট্রোবাংলার তথ্য অনুসারে চট্টগ্রামের চারটি বিদ্যুৎকেন্দ্রের বেশ ক’টি ইউনিট মিলে গ্যাসের চাহিদা রয়েছে ১৮৫ মিলিয়ন ঘনফুট। অথচ গতকাল চট্টগ্রামে সব মিলিয়ে গ্যাস সরবরাহ দেয়া হয়েছে ১৯১ মিলিয়ন ঘনফুট। ফলে শিকলবাহা ২২৫ মেগাওয়াট বিদ্যুৎকেন্দ্রে ৩৬.৭ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ দিয়ে কোনো রকমে চালু রাখা হয়েছে। বিপরীতে বন্ধ রাখা হয়েছে গ্যাসনির্ভর বৃহৎ সারকারখানা রাষ্ট্র্রায়ত্ত সিইউএফএল এবং বহুজাতিক কাফকো।
এ ছাড়া বাঁশখালীর এসএস পাওয়ারের দু’টি ইউনিটের মধ্যে একটি ইউনিট কয়লার সঙ্কটে বন্ধ থাকায় সেখানকার সরবরাহও অর্ধেকে (৬১২ মেগাওয়াট) নেমে আসে।
এর বাইরে চট্টগ্রামে ফার্নেস অয়েল নির্ভর ১৩টি বিদ্যুৎকেন্দ্রের মধ্যে দু’টির মালিকানা পিডিবির। প্রাইভেট আইপিপিগুলোতে উৎপাদন স্বাভাবিক থাকলেও পিডিবির মালিকানাধীন দোহাজারি-কালিয়াইশ ১০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং হাটহাজারী ১০০ মেগাওয়াট পিকিং বিদ্যুৎকেন্দ্রে সক্ষমতার তুলনায় ৩০-৩৫ শতাংশ উৎপাদন কম হচ্ছে। জ্বালানি সঙ্কটেই এমন অবস্থা বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। এ ছাড়া মাতারবাড়ি ১১৫০ মেগাওয়াট ক্ষমতার বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদনও ৯৩৫ মেগাওয়াটে নেমেছে।
ফলে পরিস্থিতির তীব্র অবনতি হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
কাপ্তাই কর্নফুলী হাইড্রো পাওয়ার প্লান্টের পাঁচটি ইউনিটের মোট উৎপাদন ক্ষমতা ২৩০ মেগাওয়াট। কিন্তু পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ায় চারটি ইউনিটের উৎপাদন বন্ধ হয়ে যায়। ফলে বাকি একটি ইউনিটে ৪০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপন্ন হয় বলে সূত্র জানায়।
পিডিবি সূত্র জানিয়েছে, চট্টগ্রামে প্রায় ১৬শ’ মেগাওয়াটের কাছাকাছি অফিসিয়ালি বিদ্যুতের চাহিদা রয়েছে। যদিও এর সাথে একমত নন খোদ পিডিবিরই নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক কর্মকর্তা। গতকাল বৃহস্পতিবার দিনের বেলায় বিদ্যুৎ সরবরাহ মিলে ১৩শ’ ৮১ মেগাওয়াট। সূত্রমতে, এর মধ্যে আবার শিল্প কারখানার জন্য প্রায় ৩শ’ মেগাওয়াট রিজার্ভ রাখে পিডিবি। তবুও রফতানিমুখী গার্মেন্ট কারখানাগুলোর ৮ ঘণ্টায় ৪/৫ ঘণ্টা বিদ্যুৎ না থাকার অভিযোগ মিলেছে। বিদ্যুতের চাহিদা ও সরবরাহ নিয়ে পিডিবির হিসাবের সাথে বাস্তবতার মাঝে বড় ধরনের ফারাক দেখা যাচ্ছে।
ভুক্তভোগী নাগরিকরা বলছেন, দিনে গড়ে ১০ ঘণ্টার বেশি বিদ্যুৎ থাকে না। একবার গেলে দীর্ঘক্ষণ বিদ্যুৎ আর আসে না। তা ছাড়া জ্বালানি তেলের সঙ্কটের কারণে দীর্ঘক্ষণ জেনারেটর চালু রাখতে হিমশিম অবস্থা। এতে বহুতল ভবনগুলোর বাসিন্দাদের চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে।
তৈরি পোশাক রফতানিকারকদের সংগঠন বিজিএমইএ’র পরিচালক সাইফ উল্লাহ মানসুর নয়া দিগন্তকে বলেন, ৮ ঘণ্টা ফ্যাক্টরি খোলা রাখা অবস্থায় ৪/৫ ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকছে না। গার্মেন্ট কারখানাগুলোর সব মেশিনারিজ বিদ্যুৎনির্ভর। এতে জেনারেটর চালিয়ে সময়মতো উৎপাদন ঠিক রাখা যেমনি কঠিন হয়ে পড়েছে, তেমনি ছোট কারাখানাগুলোর জন্য মড়ার উপর খাঁড়ার ঘায়ের মতো অবস্থা। কোনোভাবেই কস্ট মিনিমাইজ করা যাচ্ছে না। চট্টগ্রামের তিন শতাধিক গার্মেন্ট কারখানা সঙ্কটে রয়েছে বলেও তিনি জানান।