ফিলিস্তিনি সাংবাদিকদের সাথে তাদের পরিবারকে লক্ষ্যবস্তু করছে ইসরাইল

Printed Edition

নয়া দিগন্ত ডেস্ক

  • গাজায় প্রায় ৭০৬ জন সাংবাদিকের আত্মীয় নিহত হয়েছেন
  • শক্তিশালী ঝড়ে হাজার হাজার তাঁবু প্লাবিত
  • পশ্চিম তীরে ইসরাইলি তাণ্ডব

ফিলিস্তিনি সাংবাদিক ইউনিয়ন জানিয়েছে, ইসরাইলি বাহিনীর হামলা এখন শুধু সাংবাদিকদের হত্যা, আহত করা, গ্রেফতার কিংবা সংবাদ কভারেজে বাধা দেয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই; বরং পরিকল্পিতভাবে তাদের পরিবারের সদস্যদেরও লক্ষ্যবস্তু করা হচ্ছে। শনিবার প্রকাশিত এক রিপোর্টে ইউনিয়নটি জানায়, সাংবাদিকদের আত্মীয়স্বজনদের ওপর হামলা বাড়ছে, যা সাংবাদিকতাকে একটি অস্তিত্ব সঙ্কটের মুখে ঠেলে দেয়ার উদ্দেশ্যে পরিচালিত হচ্ছে। এতে সাংবাদিকদের পরিবারকেই প্রিয়জনের পেশার মূল্য দিতে হচ্ছে। আলজাজিরা।

ইউনিয়নের ফ্রিডমস কমিটির নথিভুক্ত তথ্যের ভিত্তিতে রিপোর্টে বলা হয়, ২০২৩, ২০২৪ ও ২০২৫ সালে সাংবাদিকদের পরিবারের ওপর হামলা একটি পুনরাবৃত্তি ও সংগঠিত ধারায় পরিণত হয়েছে। এই সময়ে গাজা উপত্যকায় প্রায় ৭০৬ জন সাংবাদিকের আত্মীয় নিহত হয়েছেন বলে কমিটি নথিভুক্ত করেছে। এতে জোর দিয়ে বলা হয়, হামলার ব্যাপকতা ও ধারাবাহিকতা প্রমাণ করে যে এগুলো কোনো এলোমেলো যুদ্ধপরিস্থিতির ফল নয়।

কমিটির তথ্য মতে, ২০২৩ সালে প্রায় ৪৩৬ জন সাংবাদিকের আত্মীয় নিহত হন, ২০২৪ সালে এই সংখ্যা দাঁড়ায় প্রায় ২০৩ জনে এবং ২০২৫ সালে এ পর্যন্ত অন্তত ৬৭ জন নিহত হয়েছেন। এ সময় বহু পরিবার জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত হয়ে তাঁবু বা অস্থায়ী আশ্রয়ে বসবাস করতে বাধ্য হয়েছে। রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়, সর্বশেষ ঘটনায় কয়েক দিন আগে উদ্ধারকর্মীরা সাংবাদিক হিবা আল-আবাদলা, তার মা এবং আল-আস্তাল পরিবারের প্রায় ১৫ জন সদস্যের লাশ উদ্ধার করেন। প্রায় দুই বছর আগে খান ইউনুসের পশ্চিমে তাদের বাড়িতে ইসরাইলি বিমান হামলা চালানো হয়েছিল।

ফিলিস্তিনি সাংবাদিক ইউনিয়ন বলেছে, এই পরিসংখ্যান প্রমাণ করে যে শত শত শিশু, নারী ও বৃদ্ধ মানুষ শুধু পরিবারের একজন সদস্যের সাংবাদিকতা পেশার কারণে নিহত হয়েছেন। তারা একে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার ও মানবিক আইনের চরম লঙ্ঘন বলে উল্লেখ করেছে।

শক্তিশালী ঝড়ে হাজার হাজার তাঁবু প্লাবিত

গাজা উপত্যকায় ঝড়ের কারণে একটি ভবন ধসে একজন ফিলিস্তিনি নারী নিহত হয়েছেন। সেই সাথে অঞ্চলজুড়ে বাস্তুচ্যুত হাজার হাজার তাঁবু অলাবিত হয়েছে। চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, রোববার শহরের আল-রিমাল এলাকায় ইসরাইলি হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত একটি বাড়ির দেয়াল ৩০ বছর বয়সী এক নারীর তাঁবুর ওপর পড়ে যায়। এতে তার পরিবারের বেশ কয়েকজন সদস্য আহত হন।

আনাদোলুর একজন সংবাদদাতা এবং প্রত্যক্ষদর্শী জানিয়েছেন, রাত থেকে ভারী বৃষ্টিপাত এবং তীব্র বাতাসের কারণে গাজাজুড়ে হাজার হাজার বাস্তুচ্যুত তাঁবু প্লাবিত হয়েছে এবং উপড়ে পড়েছে। শহরের দক্ষিণে খান ইউনুসের সমুদ্র সৈকতে স্থাপিত বাস্তুচ্যুত মানুষের জন্য শত শত তাঁবুও নি¤œচাপের কারণে উত্থিত সমুদ্র ঢেউয়ে প্লাবিত হয়। ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে ইসরাইলি হামলার শিকার অঞ্চলটিতে হাজার হাজার মানুষ জীর্ণ তাঁবুতে অথবা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত উচ্চ-ঝুঁকিপূর্ণ ভবনে বসবাস করছেন। তীব্র আবহাওয়ার পরিস্থিতি বাস্তুচ্যুত ফিলিস্তিনিদের জন্য বড় বিপদ ডেকে আনছে।

গাজায় ইসরাইলি নৃশংস হামলায় নিহতের সংখ্যা ৭১ হাজার ২০০ জন ছাড়িয়ে গেছে, যাদের বেশির ভাগই নারী ও শিশু। আহত হয়েছে আরো ১ লাখ ৭১ হাজার ২০০ জনেরও বেশি। এই হামলায় গাজাও ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে।

হামাসকে তহবিল জোগানোর অভিযোগে ইতালিতে গ্রেফতার ৯

ইতালিভিত্তিক দাতব্য প্রতিষ্ঠানগুলোর মাধ্যমে ফিলিস্তিনি স্বাধীনতাকামী সংগঠন হামাসকে তহবিল জোগাচ্ছেন, এমন সন্দেহে ৯ জনকে গ্রেফতার করেছে দেশটির কর্তৃপক্ষ। শনিবার ইতালীয় কৌঁসুলিরা জানিয়েছেন, মাফিয়াবিরোধী ও সন্ত্রাসবিরোধী ইউনিটগুলোর সমন্বয়ে চালানো এক অভিযানে সন্দেহভাজনদের গ্রেফতার করেছেন তারা। ইতালির উত্তরাঞ্চলীয় শহর জেনোয়ার সরকারি কৌঁসুলিরা এক বিবৃতিতে জানিয়েছেন, সন্দেহভাজনরা ফিলিস্তিনি সংগঠনটির ‘অন্তর্গত এবং তাদের তহবিল যুগিয়েছে’ বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন হামাসকে একটি সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে চিহ্নিত করেছে। বিবৃতিতে তারা জানান, যাদের গ্রেফতার করা হয়েছে তারা হামাসের সাথে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোতে ঘুর পথে প্রায় ৭০ লাখ ইউরো পাঠিয়েছে বলে অভিযোগ। এসব অর্থ গত দুই বছর ধরে মানবিক উদ্দেশের জন্য সংগ্রহ করা হয়েছিল। পুলিশ জানিয়েছে, অভিযানে ৮০ লাখ ইউরোর বেশি সম্পদ জব্দ করা হয়েছে। রয়টার্স জানিয়েছে, সন্দেহজনক আর্থিক লেনদেন চিহ্নিত হওয়ার পর এ নিয়ে তদন্ত শুরু হয়েছিল আর তা নেদারল্যান্ডস ও ইইউভুক্ত অন্য দেশগুলোর সহযোগিতায় বিস্তৃত হয়। ইইউয়ের বিচার বিভাগীয় সংস্থা ইউরোজাস্টের মাধ্যমে তদন্তের সব দিক সমন্বয় করা হয়।

বিষয়টি নিয়ে মন্তব্যের জন্য রয়টার্সের জানানো অনুরোধে ইতালির প্রধানমন্ত্রীর দফতর তাৎক্ষণিকভাবে সাড়া দেয়নি। গাজায় হামাসের সাথে দুই বছর ধরে যুদ্ধ চলার সময় ইতালির প্রধানমন্ত্রী মেলোনি ইসরাইলকে সমর্থন দিয়েছেন। তার এই সমর্থনের প্রতিক্রিয়ায় ইতালিজুড়ে রাস্তায় রাস্তায় বারবার বড় ধরনের বিক্ষোভ হয়েছে।

পশ্চিম তীরে ইসরাইলি তাণ্ডব

অধিকৃত পশ্চিম তীরের কাবাতিয়া শহরে ইসরাইলি বাহিনী ব্যাপক তাণ্ডব চালিয়েছে। বাড়ি দখল, গণগ্রেফতার ও পূর্ণ কারফিউ জারি করেছে। ইসরাইলের প্রতিরক্ষামন্ত্রীর নির্দেশে পরিচালিত এই তাণ্ডবের দ্বিতীয় দিনে শনিবার শহরের প্রবেশপথগুলো সিলগালা করা হয়। আলজাজিরা এ খবর জানিয়েছে। স্থানীয় সূত্রের বরাতে আলজাজিরা জানায়, ইসরাইলি বাহিনী কাবাতিয়ায় ঢুকে বহু বাসিন্দাকে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করে।

ফিলিস্তিনি বার্তা সংস্থা ওয়াফা জানিয়েছে, একাধিক আবাসিক বাড়িকে সাময়িকভাবে সামরিক জিজ্ঞাসাবাদ কেন্দ্রে রূপান্তর করা হয়েছে। ফলে সেখানকার পরিবারগুলোকে ঘর ছাড়তে বাধ্য করা হয়েছে। ইসরাইলের আর্মি রেডিও জানিয়েছে, শহরটিতে পূর্ণ কারফিউ কার্যকর রয়েছে।

এই তাণ্ডব শুরু হয় ইসরাইলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরাইল কার্টজের দেয়া নির্দেশের পর। তিনি দাবি করেন, উত্তর ইসরাইলে সংঘটিত ছুরিকাঘাত ও গাড়িচাপা দেয়ার হামলার সাথে জড়িত এক ফিলিস্তিনির বাড়ি কাবাতিয়ায়। ইসরাইলি সেনাবাহিনী জানিয়েছে, একাধিক ডিভিশনের সেনা, সীমান্ত পুলিশ এবং শিন বেতের সদস্যরা যৌথভাবে এতে অংশ নিয়েছে। সন্দেহভাজনের বাড়িতে তল্লাশি চালানো হয়েছে এবং সেটি ভাঙার প্রস্তুতিও নেয়া হচ্ছে।

মানবাধিকার সংগঠনগুলো দীর্ঘদিন ধরেই ফিলিস্তিনিদের অভিযুক্ত আত্মীয়দের বাড়ি গুঁড়িয়ে দেয়ার নীতিকে অবৈধ সমষ্টিগত শাস্তি হিসেবে নিন্দা করে আসছে। ইসরাইলি সেনাবাহিনী বলেছে, তারা কাবাতিয়ার আরো এলাকায় তল্লাশি চালাবে, চিহ্নিত ব্যক্তিদের গ্রেফতার এবং অস্ত্র উদ্ধারের চেষ্টা করবে। এক বাসিন্দা আলজাজিরাকে বলেন, শহরে আতঙ্ক বিরাজ করছে। হুমকি ও উসকানি চলছে। ওয়াফা জানায়, একই দিনে রামাল্লাহ ও হেবরনের আশপাশের কয়েকটি গ্রামেও ইসরাইলি অভিযান চালানো হয়। হেবরনের কাছের দুরা, আবদা ও ইমরেইশ এলাকা থেকে অন্তত আটজনকে আটক করা হয়েছে।

গাজায় চলমান ইরাইলি আগ্রাসনের প্রেক্ষাপটে পশ্চিম তীরে ইসরাইলি সামরিক অভিযান ও হামলা প্রায় নিয়মিত ঘটনায় পরিণত হয়েছে। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের পর থেকে প্রায় ২১ হাজার ফিলিস্তিনিকে গ্রেফতার করা হয়েছে। ডিসেম্বরের শুরু পর্যন্ত ইসরাইলের কারাগারে প্রায় ৯,৩০০ ফিলিস্তিনি বন্দী ছিলেন, যাদের এক-তৃতীয়াংশের বেশি কোনো অভিযোগ ছাড়াই আটক। বন্দীদের ওপর নির্যাতন, যৌন নিপীড়ন ও হেফাজতে মৃত্যুর অভিযোগও উঠেছে।