হরমুজের বিকল্প কি সৌদি আমিরাত ও ইরাকের তিন পাইপলাইন
আলজাজিরা এক্সপ্লেইনার
Printed Edition
নয়া দিগন্ত : এ মুহূর্তে হরমুজ প্রণালীতে অন্তত দুই হাজার জাহাজ আটকা পড়ে আছে। আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দর ব্যারেল ছাড়িয়েছে ১১৬ ডলার। তাই হরমুজ প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচলে বাধার কারণে তেলের ঘাটতি পূরণে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো পাইপলাইনের মাধ্যমে তেল রফতানি বাড়িয়েছে। সৌদি, সংযুক্ত আরব আমিরাত, ইরাকের তিনটি পাইপলাইন কি হরমুজ প্রণালী থেকে আরো বেশি পরিমাণ তেল বের করে আনতে সাহায্য করতে পারে? যুদ্ধের কারণে বিকল্প এ তেল পরিবহনে শঙ্কা থাকলেও বিষয়টি নিয়ে চিন্তাভাবনা চলছে। কারণ এই সপ্তাহান্তে ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইল যুদ্ধ চতুর্থ সপ্তাহে প্রবেশ করায়, হরমুজ প্রণালীর মধ্য দিয়ে জাহাজ চলাচলে মারাত্মক বিঘœ এবং উপসাগরীয় অঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি স্থাপনাগুলোতে এবং তার আশপাশে হামলার কারণে তেল ও গ্যাসের বাজারের ওপর চাপ ক্রমাগত বাড়ছে।
শান্তিকালীন বিশ্বের ২০ শতাংশ তেল ও গ্যাস উপসাগরীয় অঞ্চলের উৎপাদক দেশগুলো হরমুজ প্রণালীর মাধ্যমে রফতানি করে যার মধ্যে প্রতিদিন দুই কোটি ব্যারেল তেল অন্তর্ভুক্ত। এই প্রণালী বন্ধ হয়ে যাওয়ার ফলে সৃষ্ট ঘাটতি পূরণের জন্য মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো জ্বালানি রফতানির বিকল্প পথ খুঁজতে যেয়ে তিনটি প্রধান পাইপলাইনের সম্ভাবনা খতিয়ে দেখছে।
বিকল্প ৩ পাইপলাইন
তেল পরিবহনের একমাত্র বিকল্প হলো স্থলপথে বা সমুদ্রের নিচ দিয়ে পাইপলাইনের মাধ্যমে তা পরিবহন করা। হরমুজ প্রণালীর বিকল্প পথ হিসেবে তিনটি তেল পাইপলাইন কাজ করতে পারে, যার মধ্যে রয়েছে :
সৌদি আরবের পূর্ব-পশ্চিম পাইপলাইন
পূর্ব-পশ্চিম পাইপ লাইনটি পেট্রলাইন নামেও পরিচিত এবং এটি সৌদি তেল জায়ান্ট আরামকো পরিচালনা করে। আরামকো বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম কোম্পানি, যার বাজার মূলধন ১.৭ ট্রিলিয়ন ডলারের বেশি এবং বার্ষিক আয় ৪৮০ বিলিয়ন ডলার। এই তেল জায়ান্টটি বৈশ্বিক তেল উৎপাদনের ১২ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করে, যার উৎপাদন ক্ষমতা দৈনিক ১২ মিলিয়ন ব্যারেলেরও বেশি। আরামকোর পেট্রলাইনটি ১,২০০ কিলোমিটার (৭৪৫ মাইল) দীর্ঘ পাইপলাইন, যা সৌদি আরবের পারস্য উপসাগরের নিকটবর্তী আবকাইক তেল প্রক্রিয়াকরণ কেন্দ্র থেকে সৌদি আরবের অপর প্রান্তে লোহিত সাগরের ইয়ানবু বন্দর পর্যন্ত বিস্তৃত। তবে হরমুজ পাইপলাইন বন্ধ থাকার ঘাটতি পুরোপুরি পূরণ করার মতো সক্ষমতা এই পাইপলাইনের নেই। জাতিসঙ্ঘের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে হরমুজ প্রণালী দিয়ে দৈনিক প্রায় দুই কোটি ব্যারেল (বিপিডি) তেল প্রবাহিত হয়েছে। এর মধ্যে ১.৪ কোটি ব্যারেল ছিল অপরিশোধিত তেল ও কনডেনসেট এবং বাকি ৬০ লাখ ব্যারেল ছিল পেট্রলিয়াম। সৌদির পূর্ব-পশ্চিম পাইপলাইনটির দৈনিক সর্বোচ্চ ৭০ লাখ ব্যারেল তেল পরিবহনের ক্ষমতা রয়েছে। আরামকো বলছে, এর মধ্যে প্রায় ৫০ লাখ ব্যারেল রফতানি করা যেতে পারে এবং বাকিটা স্থানীয় শোধনাগারগুলোতে সরবরাহ করা হবে।
ফেব্রুয়ারির শেষে ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন-ইসরাইলি যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে সৌদি আরব এই পাইপলাইনের মাধ্যমে তার তেলপ্রবাহ বাড়িয়ে দিয়েছে। ডেটা ও অ্যানালিটিক্স কোম্পানি কেপলারের তথ্য অনুযায়ী, জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারিতে পাইপলাইন দিয়ে গড়ে দৈনিক ৭৭০,০০০ ব্যারেল তেল প্রবাহিত হয়েছে। এই সপ্তাহের মঙ্গলবার নাগাদ তা বেড়ে গড়ে দৈনিক ২.৯ মিলিয়ন ব্যারেলে দাঁড়িয়েছে।
তবে, সৌদি পাইপলাইন ব্যবহারে এখনো ঝুঁকি রয়েছে।
ইরান-সমর্থিত ইয়েমেনি সশস্ত্র গোষ্ঠী হুথিরা, যাদের লোহিত সাগরে জাহাজের ওপর হামলা ২০২৩ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত গাজায় ইসরাইলের গণহত্যা যুদ্ধের সময় বিশ্বব্যাপী নৌপরিবহন ব্যবস্থায় বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করেছিল, তারা বাব আল-মানদেব প্রণালীকে লক্ষ্যবস্তু করতে পারে, যা লোহিত সাগরকে এডেন উপসাগরের সাথে এবং এর বাইরে ভারত মহাসাগরকে সংযুক্ত করে।
আমিরাতের আবুধাবি অপরিশোধিত তেলপাইপলাইন
আবুধাবি অপরিশোধিত তেল পাইপলাইনকে অ্যাডকপ বা হাবশান-ফুজাইরাহ পাইপলাইনও বলা হয়। ৩৮০ কিলোমিটার দীর্ঘ এই পাইপলাইনটি সংযুক্ত আরব আমিরাতের আবুধাবির দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের তেল ও গ্যাসক্ষেত্র হাবশান থেকে ওমান উপসাগরের ফুজাইরাহ বন্দর পর্যন্ত বিস্তৃত।
২০১২ সালে চালু হওয়া এই পাইপলাইনটির ধারণক্ষমতা দৈনিক প্রায় ১.৫ মিলিয়ন ব্যারেল (বিপিডি)। রয়টার্সকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে কেপলারের বিশ্লেষক ইয়োহানেস রাউবলের মতে, গত মাসে ফুজাইরাহ থেকে তেল রফতানি বেড়েছে বলে মনে হচ্ছে। ফেব্রুয়ারির ১.১৭ মিলিয়ন বিপিডির তুলনায় মার্চ মাসে এর গড় রফতানি ছিল ১.৬২ মিলিয়ন বিপিডি।
ইরাক-তুরস্ক অপরিশোধিত তেল পাইপলাইন
ইরাক-তুরস্ক অপরিশোধিত তেল পাইপলাইন, যা কিরকুক-জেহান পাইপলাইন নামেও পরিচিত, ইরাককে তুরস্কের ভূমধ্যসাগরীয় উপকূলের সাথে সংযুক্ত করে। দৈনিক ১৬ লাখ ব্যারেল ধারণক্ষমতার এই পাইপলাইনটি বর্তমানে দৈনিক প্রায় দুই লাখ ব্যারেল তেল পরিবহন করে।
এই পাইপলাইনগুলো কি হরমুজ প্রণালীর বিকল্প হতে পারে?
না। যদিও এই পাইপলাইনগুলো হরমুজের ক্ষমতার কিছুটা গ্রহণ করতে পারে, তবে এদের সম্মিলিত ক্ষমতা মাত্র প্রায় ৯০ লাখ ব্যারেল, যেখানে হরমুজ প্রণালীটির ক্ষমতা প্রায় দুই কোটি ব্যারেল। এ ছাড়াও এই পাইপলাইনগুলো স্থলভিত্তিক এবং ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের আওতার মধ্যে, যা চলমান সঙ্ঘাতে এগুলোকে প্রণালী দিয়ে চলাচলকারী জাহাজগুলোর মতোই হামলা ও ক্ষতির ঝুঁকিতে ফেলে। যুদ্ধ চলাকালীন, উপসাগরীয় অঞ্চলের সর্বত্র জ্বালানি অবকাঠামো হামলার শিকার হয়েছে।
অন্য কোনো বিকল্প আছে কি?
তাত্ত্বিকভাবে, ট্রাকের মাধ্যমে তেল পরিবহন করা সম্ভব, কিন্তু এটি ব্যয়বহুল, ধীর ও অদক্ষ। ট্রিপের সংখ্যার ওপর নির্ভর করে একটি সাধারণ ট্রাক প্রতিদিন ১০০ থেকে ৭০০ ব্যারেল পর্যন্ত বহন করতে পারে। চাহিদা মেটাতে কয়েক লাখ ব্যারেল তেলের প্রয়োজন হবে, যার জন্য হাজার হাজার ট্রাক লাগবে, যেগুলো হামলার লক্ষ্যবস্তুও হতে পারে।