সভাপতির যোগ্যতা বাতিলে তীব্র প্রতিক্রিয়া

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে রাজনৈতিক প্রভাব ও বিশৃঙ্খার আশঙ্কা

Printed Edition

শাহেদ মতিউর রহমান

বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ম্যানেজিং কমিটি কিংবা গভর্নিং বডিতে সভাপতির শিক্ষাগত যোগ্যতা ন্যূনতম স্নাতক পাশের শর্ত বাতিল করা প্রস্তাবে দেশজুড়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া শুরু হয়েছে। অনেকে সরকারের এই সিদ্ধান্তকে একটি ভুল পদক্ষেপ হিসেবে সমালোচনাও করছেন। বিশেষ করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিচালনার ক্ষেত্রে সভাপতি হিসেবে যিনি নির্বাচিত হবেন তার শিক্ষাগত যোগ্যতা বাতিলের এই প্রস্তাবকে খোদ বিএনপির লোকজনই ভালোভাবে দেখছেন না। কিছু অসৎ ও সুবিধাভোগী নেতাকর্মীদের সাময়িক কোনো সুবিধা কিংবা রাজনৈতিক কোনো ফায়দা হাসিলের জন্যই এমন উদ্ভট ও অযৌক্তিক সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে বলেও অভিযোগ করছেন তারা। একই সাথে সরকারের শিক্ষামন্ত্রীকে জনআকাক্সক্ষার বিপরীতে নেয়া সিদ্ধান্তটি পুনর্বিবেচনারও দাবি জানিয়েছেন তারা। অন্যথায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পূর্বের আওয়ামী লীগের সরকারের আমলের মতোই নিয়োগ বাণিজ্য এবং দলীয় প্রভাবে শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশের বিঘœ ঘটারও আশঙ্কা করা হচ্ছে।

এদিকে সম্প্রতি দেশের ৩৮ হাজার বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ম্যানেজিং কমিটি বা গভর্নিং বডির সভাপতির ন্যূনতম শিক্ষাগত যোগ্যতা স্নাতক পাস থাকার নিয়মে পরিবর্তন আনার ঘোষণা দিয়েছেন শিক্ষামন্ত্রী। নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী কমিটির সভাপতি হতে আর কোনো শিক্ষাগত যোগ্যতার বাধ্যবাধকতা থাকছে না। যে কেউই যেকোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সভাপতি বা অন্য যেকোনো পদের পরিচালকও হতে পারবেন। এ নিয়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশের পর ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে। বিভিন্নজন ভিন্ন ভিন্নভাবে বিষয়টিকে দেখছেন।

বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিষয়টি নিয়ে তীব্র সমালোচনা শুরু করেছেন নেটিজেনরা। পাশাপাশি সচেতন মহলও এ সিদ্ধান্ত থেকে সরকার তথা শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে সরে আসার আহ্বান জানাচ্ছে।

সম্প্রতি বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে গভর্নিং বডি ও ম্যানেজিং কমিটি প্রবিধানমালা-২০২৪’ রিভিউ সংক্রান্ত এক সভা শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে অনুষ্ঠিত হয়। এতে প্রধান অতিথি ছিলেন শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন। সভাপতিত্ব করেন মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিব আব্দুল খালেক।

ঐ দিনের সভায় আলোচনার পর সিদ্ধান্ত গৃহীত হয় যে, বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি বা গভর্নিং বডির চেয়ারম্যান পদে শিক্ষাগত যোগ্যতা শিথিল করা হবে। এক্ষেত্রে বর্তমান প্রবিধানমালায় থাকা ‘ন্যূনতম স্নাতক পাস’ শিক্ষাগত যোগ্যতা বাতিল করে আগের নিয়মে ফেরানো হবে। অর্থাৎ কমিটির সভাপতি বা বডির চেয়ারম্যান হতে নির্দিষ্ট কোনো শিক্ষাগত যোগ্যতা প্রয়োজন হবে না। সভায় আরো সিদ্ধান্ত হয় যে, ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি বা গভর্নিং বডির চেয়ারম্যান নিয়োগে সংসদ সদস্যের ক্ষমতা থাকবে না। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রধান (প্রধান শিক্ষক/অধ্যক্ষ/সুপার), ইউএনও, ডিসি, বিভাগীয় কমিশনার হয়ে শিক্ষা বোর্ডগুলোর চেয়ারম্যানের কাছে তিনজনের নামের তালিকা পাঠাবেন। সেখান থেকে একজনকে কমিটির প্রধান বা সভাপতি করবে শিক্ষা বোর্ড।

অন্য দিকে ম্যানেজিং কমিটিতে বিদ্যোৎসাহী সদস্য, দাতা সদস্য, শিক্ষানুরাগীদের যুক্ত করা হবে। এসব পদ মূলত স্থানীয় রাজনৈতিক নেতা অথবা তাদের অনুসারীরা দখলে নেন। ফলে অঘোষিতভাবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি পদে ফের রাজনৈতিক নেতাদের বসানোর বিষয়ে সিদ্ধান্ত হয়। যদিও এ সংক্রান্ত সংবাদ বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশের পর বিষয়টি সর্ব মহলেই দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এই সংবাদটি শেয়ার করে অসংখ্য নেটিজেন এ সিদ্ধান্তের প্রতিবাদও জানান। শিক্ষকদের মধ্যেও অনেকে বিষয়টি ভালোভাবে দেখছেন না। অনেকেই মনে করছেন ‘শিক্ষা মানেই সার্টিফিকেট নয়। শিক্ষা মানে জাতির বিবেক, আদর্শ আর নৈতিকতার মেলবন্ধন। সরকারের এ সিদ্ধান্ত মানেই আগের মতো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নোংরা রাজনীতির নতুন সমীকরণ।

এ বিষয়ে কুমিল্লা-৪ আসনের সংসদ সদস্য ও এনসিপির দক্ষিণাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক হাসনাত আব্দুল্লাহ তার ফেসবুক পেজে লিখেছেন, ‘এর চেয়ে বাজে সিদ্ধান্ত আর কিছু হতে পারে না। স্কুল দখল নিয়ে আবার শুরু হবে স্থানীয় রাজনীতির নোংরা খেলা। নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক শিক্ষক জানান, শিক্ষামন্ত্রীর চমক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি হতে ‘শিক্ষাগত যোগ্যতা লাগবে না’ মর্মে ঘোষণা। বলা চলে এ সংস্কার শিক্ষা ধ্বংসের জন্য যথেষ্ট। ২০২৬ সালে এসেও যদি শিক্ষাগত যোগ্যতা না লাগে তাহলে শিক্ষার উন্নতি করে লাভ কি?

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিচালনা কমিটির সভাপতিসহ সব পদের প্রার্থীর যোগ্যতা শিথিল নয়, বরং বাড়ানো উচিত বলে মনে করেন ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমিরেটাস অধ্যাপক ড. মনজুর আহমদ। তিনি জানান, ‘বিষয়টি দুঃখজনক। এটা গ্রহণযোগ্য নয়। এ সিদ্ধান্ত যদি বাস্তবায়ন হয়, তাহলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নোংরা রাজনীতি আবারো আষ্টেপৃষ্ঠে ধরবে। অধ্যাপক মনজুর আহমদ আরো বলেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিচালনা কমিটির সভাপতির স্নাতক পাস যোগ্যতা নির্ধারণ করা হয়েছিল। সেটি বাতিল কেন করতে হবে? এটা তো খারাপ কিছু নয়। এমনও না যে, এ যোগ্যতার লোক নেই। কমিটির সভাপতিসহ সব সদস্যের যোগ্যতা আরো বাড়ানো উচিত।

সংশ্লিষ্টরা জানান, ২০২৪ সালের মে মাসের আগে দেশের বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ম্যানেজিং কমিটি বা গভর্নিং বডির সভাপতি হতে কোনো শিক্ষাগত যোগ্যতার প্রয়োজন হতো না। তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার ২০২৪ সালের মে মাসে ‘বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে গভর্নিং বডি ও ম্যানেজিং কমিটি প্রবিধানমালা-২০২৪’ প্রণয়ন করে। ওই প্রবিধানমালায় ম্যানেজিং কমিটির সভাপতির যোগ্যতা বিষয়ে বলা হয়েছিল, এইচএসসি বা সমমান পরীক্ষায় অনুত্তীর্ণ কোনো ব্যক্তি ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি পদে নির্বাচিত হতে পারবেন না। এরপর উচ্চ আদালতের নির্দেশনায় অন্তর্বর্তী সরকার ২০২৫ সালের ৩১ আগস্ট প্রবিধানমালা সংশোধন করে ম্যানেজিং কমিটি বা গভর্নিং বডির ন্যূনতম শিক্ষাগত যোগ্যতা স্নাতক পাস নির্ধারণ করে গেজেট জারি করে। সেই নিয়ম বাতিল করে ২০২৪ সালের আগের নিয়মে ফিরতে চাচ্ছে সরকার।