অনলাইন প্রতারণার জাল বাড়ছে ভুক্তভোগীর সংখ্যা
Printed Edition
শাহ আলম নূর
দেশে অনলাইন ও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মভিত্তিক প্রতারণা উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। মোবাইল ব্যাংকিং, ই-কমার্স, সোশ্যাল মিডিয়া এবং চাকরির প্রলোভন- সব মিলিয়ে বহুমাত্রিক প্রতারণার ফাঁদে পড়ছে সাধারণ মানুষ। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রযুক্তির দ্রুত বিস্তারের সাথে তাল মিলিয়ে নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা শক্তিশালী না হওয়ায় প্রতারক চক্র আরো সক্রিয় হয়ে উঠছে এবং প্রতারণার ধরনও ক্রমাগত পরিবর্তিত হচ্ছে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তথ্যে দেখা যায়, গত পাঁচ বছরে অনলাইন প্রতারণা সংক্রান্ত অভিযোগ কয়েকগুণ বেড়েছে। সাইবার অপরাধ দমন ইউনিটের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, শুধু ২০২৫ সালেই কয়েক হাজার অভিযোগ তাদের কাছে এসেছে, যার বড় অংশ মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস) এবং ই-কমার্স প্রতারণা সংক্রান্ত। তবে বাস্তব সংখ্যা আরো বেশি, কারণ অনেক ভুক্তভোগী সামাজিক লজ্জা, আইনি জটিলতা কিংবা অর্থ ফেরত পাওয়ার অনিশ্চয়তার কারণে অভিযোগই করেন না।
তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, বর্তমানে প্রতারণা সবচেয়ে বেশি দেখা যায় এমন ক্ষেত্রগুলো হলো- মোবাইল ব্যাংকিং জালিয়াতি, অগ্রিম টাকা নিয়ে পণ্য সরবরাহ না করা, ভুয়া চাকরির বিজ্ঞাপন, অনলাইন বিনিয়োগ স্ক্যাম এবং ফিশিংয়ের মাধ্যমে ব্যাংক তথ্য হাতিয়ে নেয়া। প্রতারকরা এখন ভুয়া ওয়েবসাইট, নকল অ্যাপ, এমনকি বিশ্বাসযোগ্য দেখাতে ভুয়া রিভিউ ব্যবহার করছে। এতে সাধারণ মানুষ সহজেই বিভ্রান্ত হচ্ছে।
ঢাকার মিরপুর এলাকার বাসিন্দা আব্দুল হালিম নয়া দিগন্তকে জানান, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি পেজ থেকে কম দামে ফ্রিজ কেনার প্রলোভনে পড়ে তিনি ২৫ হাজার টাকা অগ্রিম দেন। পরে বিক্রেতার সাথে আর কোনো যোগাযোগ করতে পারেননি। একই ধরনের অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন সিরাজগঞ্জের আব্দুল কাদের। তিনি নয়া দিগন্তকে বলেন, তিনি বিদেশে চাকরির প্রতিশ্রুতি পেয়ে এক লাখ টাকা দেন, কিন্তু পরে বুঝতে পারেন সেটি একটি প্রতারণার ফাঁদ ছিল।
সংশ্লিষ্টদের মতে, ভুক্তভোগীদের একটি বড় অংশ মধ্যবিত্ত ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত শ্রেণির। দ্রুত লাভ বা সাশ্রয়ী কেনাকাটার আশায় তারা ঝুঁকি নেন, যা প্রতারকদের জন্য সুযোগ তৈরি করে। একাধিক গবেষণায় দেখা গেছে, উন্নয়নশীল দেশগুলোতে অনলাইন প্রতারণার আর্থিক ক্ষতি তুলনামূলক বেশি এবং এই ধরনের অপরাধের বড় অংশই রিপোর্ট হয় না।
বাংলাদেশের আইনে প্রতারণা দণ্ডনীয় অপরাধ হলেও বাস্তবে বিচার প্রক্রিয়া দীর্ঘ ও জটিল হওয়ায় ভুক্তভোগীরা দ্রুত প্রতিকার পান না। দণ্ডবিধির ৪২০ ধারায় প্রতারণার শাস্তির বিধান থাকলেও ডিজিটাল প্রতারণার ক্ষেত্রে প্রমাণ সংগ্রহ একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সাইবার অপরাধ কর্মকর্তারা বলছেন, প্রতারকরা প্রায়ই বিদেশী সার্ভার ব্যবহার করে এবং দ্রুত তথ্য মুছে ফেলে, ফলে তদন্তে সময় লাগে এবং অনেক ক্ষেত্রে অপরাধী শনাক্ত করাই কঠিন হয়ে পড়ে।
বিশ্বব্যাংক ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন এ বিষয়ে নয়া দিগন্তকে বলেন, এই ধরনের প্রতারণা ব্যক্তিগত ক্ষতির পাশাপাশি সামগ্রিক অর্থনীতির ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। তিনি বলেন, যখন মানুষ বারবার প্রতারণার শিকার হয়, তখন তারা অনলাইন লেনদেনে আস্থা হারায়, যা ডিজিটাল অর্থনীতির প্রবৃদ্ধিকে বাধাগ্রস্ত করে। প্রতারণার মাধ্যমে অর্থ উৎপাদনশীল খাত থেকে সরে গিয়ে অপরাধী চক্রের হাতে চলে যায়, যা অর্থনীতির ভারসাম্য নষ্ট করে বলে তিনি মনে করেন।
তথ্যে দেখা যায়, বাংলাদেশে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে এবং মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসের মাধ্যমে প্রতিদিন হাজার কোটি টাকার লেনদেন হচ্ছে। এই বিশাল ডিজিটাল অর্থনীতিকে কেন্দ্র করে প্রতারণার ঝুঁঁকিও বাড়ছে। বাংলা ভাষায় ভুয়া কনটেন্ট ও রিভিউ শনাক্ত করা কঠিন হওয়ায় প্রতারণার সুযোগ আরো বৃদ্ধি পাচ্ছে।
বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের সূত্রে জানা যায়, ভুয়া ওয়েবসাইট ও নম্বর শনাক্ত করে নিয়মিত ব্লক করা হচ্ছে, তবে প্রতারকরা দ্রুত নতুন কৌশল নিয়ে ফিরে আসে। এদিকে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতরের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ই-কমার্স খাতে প্রতারণা ঠেকাতে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে এবং অভিযোগের ভিত্তিতে ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে। তারা বলছেন, অনেক প্রতারণা চক্র আন্তঃদেশীয় হওয়ায় আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ছাড়া এগুলো পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়।
খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ডিজিটাল সচেতনতার অভাব, দ্রুত লাভের আকাক্সক্ষা, আইন প্রয়োগে সীমাবদ্ধতা এবং প্রযুক্তির অপব্যবহার এই চারটি প্রধান কারণে প্রতারণা বাড়ছে। প্রতারকরা মানুষের মনস্তত্ত্ব ব্যবহার করে প্রথমে বিশ্বাস তৈরি করে, এরপর আর্থিক ক্ষতি ঘটায়। প্রতিরোধের জন্য বিশেষজ্ঞরা জাতীয় পর্যায়ে একটি সমন্বিত ডাটাবেস তৈরির ওপর জোর দিয়েছেন, যেখানে সব ধরনের সাইবার প্রতারণার তথ্য সংরক্ষণ করা হবে। পাশাপাশি দ্রুত অভিযোগ নিষ্পত্তি ব্যবস্থা চালু করা, সাধারণ মানুষের মধ্যে ডিজিটাল নিরাপত্তা সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি, এবং কঠোর আইন প্রয়োগের কথাও বলা হচ্ছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ডিজিটাল অর্থনীতির সম্ভাবনা কাজে লাগাতে হলে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি। অন্যথায় মানুষের আস্থা কমে গেলে ই-কমার্স ও অনলাইন আর্থিক সেবার প্রবৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হবে। প্রযুক্তির অগ্রগতির সাথে সাথে প্রতারণার ধরন আরো জটিল হওয়ার আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও ডিপফেক প্রযুক্তি ব্যবহার করে ভবিষ্যতে আরো বিশ্বাসযোগ্য প্রতারণা ঘটতে পারে বলে তারা সতর্ক করেছেন। তারা বলছেন, সরকার, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান এবং সাধারণ জনগণের সম্মিলিত উদ্যোগ ছাড়া এই সমস্যা মোকাবেলা করা সম্ভব নয়। এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে অনলাইন প্রতারণা আরো বড় সামাজিক ও অর্থনৈতিক সঙ্কটে পরিণত হতে পারে বলে খাত সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।