বইয়ের মান যাচাইয়ের রিপোর্টে প্রেস মালিকদের আপত্তি

শাহেদ মতিউর রহমান
Printed Edition
  • তদন্ত করতে এনসিটিবির সাত সদস্যের কমিটি
  • আগামীতে পিএলআই বাতিলের চিন্তা

বিনামূল্যের পাঠ্যবইয়ের মান যাচাইয়ের রিপোর্ট নিয়ে বিতর্ক শুরু হয়েছে। চলতি ২০২৫ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থীদের হাতে ইতঃমধ্যে যেসব বই পৌঁছে গেছে সেই বইয়ের মান যাচাই করতে বিভিন্ন জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের স্কুল থেকে (প্রাথমিক, মাধ্যমিক, মাদরাসা ও কারিগরি) বই সংগ্রহ করে রিপোর্ট দিয়েছে পিএলআই (পোস্ট ল্যান্ডিং ইনস্পেকশন) এজেন্ট। এই রিপোর্টের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে আপত্তি তুলেছেন কয়েকজন প্রেস মালিক। তারা এই একপেশে রিপোর্ট প্রত্যাখ্যান করে যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করে পুন:তদন্তের জন্য জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডে (এনসিটিবি) লিখিত আবেদন করেছেন। এরই প্রেক্ষিতে গতকাল রোববার সাত সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। আগামী পাঁচ কর্মদিবসের মধ্যে (চলতি সপ্তাহেই) এই কমিটি পাঠ্যবইয়ের মান যাচাইয়ের রিপোর্ট তদন্ত করে প্রতিবেদন দেবে। এনসিটিবি’র একাধিক সূত্র নয়া দিগন্তকে এসব তথ্য জানিয়েছে।

সূত্র জানায়, চলতি বছরের পাঠ্যবইয়ের যথাযথ মান নিশ্চিত করা হয়েছে কি না তা যাচাই করতে বেসরকারি এজেন্ট (পিএলআই) হাইটেক সার্ভেয়ার বিডি নামে একটি প্রতিষ্ঠান দায়িত্ব পায়। তারা বিভিন্ন প্রেসের মুদ্রিত পাঠ্যবইয়ের নমুনা সংগ্রহ করে সেগুলোর মান পরীক্ষা নিরীক্ষা করে একটি প্রতিবেদন এনসিটিবিতে জমা দিয়েছে। মান যাচাইয়ের ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানটি তাদের দেয়া শর্ত মোতাবেক টেকনিক্যাল স্পেসিফিকেশন অনুযায়ী (এনেক্সার এ, ধারা ৫ অনুসারে) ছয়টি বিষয়ে অনুসন্ধান বা পরীক্ষা নিরীক্ষা করে রিপোর্ট প্রস্তুত করা হয়েছে বলে দাবি করেছে। সেখানে স্পষ্টত কভার পেজের জিএসএম বা কাগজের পুরুত্ব, ইনার পেজের জিএসএম, বইয়ের পৃষ্ঠার দৈর্ঘ ও প্রস্থের মেজারমেন্ট, বাইন্ডিং এবং বইয়ের ছাপা বা মুদ্রণ কোয়ালিটি বিবেচনায় নিয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ রিপোর্ট এনসিটিবিতে জমাও দিয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির প্রতিবেদনে ২০২৫ শিক্ষাবর্ষে ২৮টি প্রেসের মোট ১৫ লাখ ৯২ হাজার ৮৪২ কপি বই ত্রুটিপূর্ণ পেয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

এদিকে পিএলআই প্রদত্ত রিপোর্টকে অগ্রহণযোগ্য ও অবাস্তব বলে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়ে এনসিটিবিকে আবারো তদন্তের আবেদন করেছে মাস্টার সিমেক্স পেপার লি:। প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে ইমরান হোসেন জানিয়েছেন, এই রিপোর্ট যথাযথ নিয়ম ও প্রক্রিয়া অনুসরণ করে তৈরি করা হয়নি। এ ছাড়া যে দুটি নির্দিষ্ট বই থেকে স্যাম্পল নিয়ে তারা পরীক্ষা করে আমাদের প্রেসের বইয়ের বিষয়ে নেগেটিভ রিপোর্ট তৈরি করেছে সেটির প্রক্রিয়াও সঠিক হয়নি। আমরা লিখিতভাবে আবেদন জানিয়েছি ওই বই দুটি যেহেতু এনসিটিবিতে এখনো জমা রয়েছে কাজেই বিশেষজ্ঞ টিমের মাধ্যমে আবারো যথাযথ প্রক্রিয়ায় রিপোর্ট তৈরি করা হোক। তিনি বলেন, বিগত ২০ বছরের অভিজ্ঞতায় আমাদের প্রেসের মুদ্রিত বই নিয়ে কোনো সময়েই নেতিবাচক কোনো রিপোর্ট ছিল না। এই রিপোর্ট অগ্রহনযোগ্য ও উদ্দেশ্যমূলক।

অপর দিকে এনসটিবি সূত্র জানিয়েছে, এ বছর পিএলআই রিপোর্ট নিয়ে একটু ঝামেলা হয়েছে। গত বৃহস্পতিবার হাইটেক সার্ভেয়ার লি: এর সত্বাধিকারী আবদুস সালাম মোল্লা এনসিটিবিতে এসেছিলেন। তার সাথে কয়েকজন প্রেস মালিক অসৌজন্যমূলক আচরণ করেছেন এমন অভিযোগ লিখিতভাবে তিনি (এজেন্ট মালিক আসদুস সালাম মোল্লা) আজ (রোববার) এনসিটিবিকে জানিয়েছেন। আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি যেহেতু পিএলআই রিপোর্ট নিয়ে আপত্তি এসেছে এবং এ নিয়ে বিতর্কও শুরু হয়েছে তাই এনসিটিবি নিজস্ব কর্মকর্তাদের দিয়ে বিষয়টি তদন্ত করবে। ইতঃমধ্যে সাত সদস্যের কমিটিও গঠন করা হয়েছে। কমিটির সদস্যরা হলেন এনসিটিবির বিশেষজ্ঞ ড. মো: ইকবাল হাওলাদার (আহ্বায়ক), গবেষণা কর্মকর্তা মু: আবদুল্লাহ আল যোবায়ের, বিশেষজ্ঞ মোহাম্মদ হুমায়ুন কবির, সম্পাদনা বিভাগের (দাখিল) রেজাউল করিম, হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা মো: রেজাউল ইসলাম, উর্ধ্বতন বিশেষজ্ঞ মো: মোস্তফা সাইফুল আলম এবং বিশেষজ্ঞ মো: আহসানুল আরেফিন চৌধুরী। আগামী বৃহস্পতিবারের মধ্যে পিএলআই রিপোর্টের পুন:তদন্ত প্রতিবেদন এনসিটিবিতে জমা দেয়ার জন্য এই কমিটিকে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।

এনসিটিবির প্রধান সম্পাদক অধ্যাপক মুহাম্মদ ফাতিহুল কাদীর এই প্রতিবেককে বলেন, আগামীতে পিএলআই রিপোর্ট বাতিল করার বিষয়ে চিন্তা করা হচ্ছে। কেননা প্রতি বছরই এই রিপোর্ট নিয়ে প্রেস মালিকদের মধ্যে আপত্তি থাকে। আবার স্কুল পর্যায় থেকে বই সংগ্রহ করে সেগুলোর মান যথাযথ প্রক্রিয়ায় যাচাই করাও জটিল। প্রেসে থাকা অবস্থায় মুদ্রিত বইয়ের পিডিআই (প্রি ডেলিভারী ইনস্পেকশন) রিপোর্ট করার পরে এনসিটিবি’র নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় পিএলআই রিপোর্ট তৈরি করা হবে। অবশ্য প্রথমবারের মতো এ বছরই এমনটি করা হয়েছে। আগামীতে তাই পিএলআই রিপোর্ট আর থাকবে না। আমরা সেভাবেই প্রস্তুতি নিচ্ছি।