ইইউর ‘নিরাপদ’ দেশের তালিকায় বাংলাদেশ
অ্যাসাইলামের আশায় স্পেনমুখী বাংলাদেশীরা বাড়ছে অনিয়মিত অভিবাসনের ঝুঁকি
Printed Edition
শাহ আলম নূর ফ্রান্স থেকে ফিরে
ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) সম্প্রতি বাংলাদেশকে ‘নিরাপদ উৎস দেশ’ হিসেবে তালিকাভুক্ত করেছে। এই সিদ্ধান্তের ফলে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশীদের রাজনৈতিক আশ্রয় বা অ্যাসাইলাম আবেদন আরো কঠোর যাচাই-বাছাইয়ের মুখে পড়েছে। এমন পরিস্থিতির মধ্যেই ইউরোপে প্রবেশের পর তুলনামূলক সহজে বৈধ হওয়ার সুযোগের কারণে স্পেনের প্রতি আগ্রহ বাড়ছে বাংলাদেশীদের। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অ্যাসাইলামের মাধ্যমে ইউরোপে প্রবেশ এবং পরবর্তীতে স্পেনে গিয়ে বৈধ হওয়ার কৌশল এখন অনেক অভিবাসীর কাছে আকর্ষণীয় বিকল্প হয়ে উঠেছে।
অভিবাসন বিশ্লেষকরা বলছেন, বাংলাদেশকে নিরাপদ দেশ হিসেবে চিহ্নিত করার অর্থ হলো বাংলাদেশী নাগরিকদের অধিকাংশ অ্যাসাইলাম আবেদনকে প্রাথমিকভাবে দুর্বল দাবি হিসেবে বিবেচনা করা হবে। ফলে আশ্রয় পাওয়ার সম্ভাবনা কমে যাবে এবং আবেদন নিষ্পত্তির প্রক্রিয়াও দ্রুত হবে। এর ফলে ইউরোপে অবস্থান বৈধ করার নতুন পথ খুঁজছেন অনেক বাংলাদেশী। আর সেই সুযোগের কারণেই আলোচনায় উঠে এসেছে স্পেন।
সম্প্রতি স্পেন সরকার নথিহীন অভিবাসীদের জন্য একটি বিশেষ বৈধকরণ কর্মসূচি অনুমোদন করেছে। দেশটির সরকার জানিয়েছে, দীর্ঘ দিন ধরে স্পেনে বসবাসরত এবং নির্দিষ্ট শর্ত পূরণকারী প্রায় পাঁচ লাখ অনিয়মিত অভিবাসী বৈধতার জন্য আবেদন করতে পারবেন। এই কর্মসূচির আওতায় বাংলাদেশীসহ বিভিন্ন দেশের অভিবাসীরা উপকৃত হওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, বর্তমানে স্পেনে প্রায় ৭৫ হাজার বাংলাদেশী বসবাস করছেন। এর মধ্যে প্রায় ১৫ হাজারের মতো ব্যক্তি বিভিন্ন কারণে বৈধ কাগজপত্র ছাড়াই অবস্থান করছেন। নতুন কর্মসূচির কারণে তাদের একটি বড় অংশ আইনি স্বীকৃতি পাওয়ার সুযোগ পেতে পারেন বলে আশা করা হচ্ছে।
অভিবাসন খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, স্পেন দীর্ঘ দিন ধরেই অভিবাসীবান্ধব দেশ হিসেবে পরিচিত। ইউরোপের অনেক দেশের তুলনায় সেখানে বসবাস, কাজের সুযোগ এবং নির্দিষ্ট সময় পর বৈধতা অর্জনের প্রক্রিয়া তুলনামূলক সহজ। এ কারণে ইতালি, গ্রিস কিংবা ফ্রান্সে অবস্থানরত অনেক বাংলাদেশীও পরবর্তীতে স্পেনে চলে যাওয়ার চেষ্টা করেন।
অভিবাসন বিশেষজ্ঞ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ড. ইমতিয়াজ আহমেদ নয়া দিগন্তকে বলেন, বাংলাদেশকে নিরাপদ উৎস দেশ হিসেবে বিবেচনা করার ফলে রাজনৈতিক আশ্রয়ের আবেদন আগের চেয়ে বেশি চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে। ইউরোপীয় দেশগুলো এখন আশ্রয় নীতিকে আরো কঠোর করছে। ফলে যারা অ্যাসাইলামের ওপর নির্ভর করে ইউরোপে যাওয়ার পরিকল্পনা করছেন, তাদের জন্য পরিস্থিতি আগের মতো থাকবে না।
তিনি বলেন, স্পেনে বৈধ হওয়ার কিছু সুযোগ থাকলেও সেটিকে কেন্দ্র করে অতিরিক্ত আশাবাদী হওয়ার কারণ নেই। অনেক সময় দালালচক্র ভুল তথ্য দিয়ে মানুষকে ঝুঁকিপূর্ণ পথে ইউরোপে পাঠানোর চেষ্টা করে। বাস্তবতা হলো বৈধতা পেতে হলে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয় এবং বিভিন্ন আইনি শর্ত পূরণ করতে হয়।
এ দিকে মানবাধিকার সংঠনগুলো বলছে, স্পেনে বৈধ হওয়ার সুযোগ থাকলেও বিষয়টি যতটা সহজ মনে করা হয়, বাস্তবে ততটা নয়। আবেদনকারীদের দীর্ঘ সময় ধরে দেশটিতে বসবাসের প্রমাণ, কর্মসংস্থানের তথ্য এবং অপরাধমূলক রেকর্ড না থাকার মতো শর্ত পূরণ করতে হয়। তবুও অন্যান্য ইউরোপীয় দেশের তুলনায় স্পেনে বৈধ হওয়ার পথ অপেক্ষাকৃত উন্মুক্ত থাকায় অভিবাসীদের আগ্রহ বাড়ছে।
অভিবাসন ও উন্নয়নবিষয়ক গবেষক ড. তাসনিম সিদ্দিকী নয়া দিগন্তকে বলেন, বাংলাদেশী তরুণদের একটি অংশ এখনো মনে করেন ইউরোপে পৌঁছাতে পারলেই কোনো না কোনোভাবে বৈধ হওয়া সম্ভব। এই ধারণা সব ক্ষেত্রে সত্য নয়। ইউরোপীয় ইউনিয়নের অভিবাসন নীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। বাংলাদেশকে নিরাপদ দেশের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার সিদ্ধান্ত সেই পরিবর্তনেরই অংশ।
তিনি বলেন, স্পেনের বৈধকরণ কর্মসূচি মূলত দীর্ঘদিন ধরে দেশটিতে অবস্থানরত ব্যক্তিদের জন্য সুযোগ তৈরি করেছে। এটি নতুন অভিবাসীদের জন্য উন্মুক্ত আমন্ত্রণ নয়।
কিন্তু দালালচক্র এই বিষয়টিকে ভিন্নভাবে উপস্থাপন করে মানুষকে বিভ্রান্ত করছে।
বাংলাদেশের জনশক্তি রফতানি খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, ইউরোপের শ্রমবাজারে এখনো দক্ষ কর্মীর চাহিদা রয়েছে। নির্মাণ, কৃষি, পরিচর্যা, পর্যটন ও সেবাখাতে কর্মী সঙ্কট রয়েছে অনেক দেশে। কিন্তু বৈধ কর্মসংস্থানের পরিবর্তে অনেকে অ্যাসাইলামভিত্তিক অভিবাসনের পথ বেছে নিচ্ছেন, যা দীর্ঘমেয়াদে ঝুঁকিপূর্ণ। তারা বলছেন, সরকারিভাবে শ্রমবাজার সম্প্রসারণ, ভাষা প্রশিক্ষণ এবং দক্ষতা উন্নয়নের মাধ্যমে ইউরোপে বৈধ কর্মী পাঠানোর উদ্যোগ আরো জোরদার করা প্রয়োজন। এতে একদিকে অনিয়মিত অভিবাসন কমবে, অন্যদিকে প্রবাসী আয়ও বাড়বে।
স্পেনে বসবাসরত বাংলাদেশী কমিউনিটি নেতারা বলছেন, গত কয়েক বছরে দেশটিতে বাংলাদেশীদের সংখ্যা দ্রুত বেড়েছে। বিশেষ করে যারা অ্যাসাইলাম আবেদন করে ইউরোপে প্রবেশ করেন, তাদের অনেকেই পরবর্তীতে স্পেনে গিয়ে স্থায়ীভাবে বসবাসের চেষ্টা করেন। কারণ স্পেনে দীর্ঘমেয়াদে বৈধতা পাওয়ার সম্ভাবনা অন্যান্য অনেক দেশের তুলনায় বেশি বলে তারা মনে করেন।
স্পেনে বসবাসরত আব্দুস সাত্তার নয়া দিগন্তকে বলেন, নতুন বৈধকরণ কর্মসূচির খবর ছড়িয়ে পড়ার পর বাংলাদেশ থেকে অনেকেই তাদের সাথে যোগাযোগ করছেন। কেউ জানতে চাইছেন কীভাবে স্পেনে যাওয়া যায়, আবার কেউ অ্যাসাইলাম আবেদন করে পরে স্পেনে বৈধ হওয়ার সম্ভাবনা সম্পর্কে তথ্য জানতে চাইছেন। তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারিত অনেক তথ্যই বিভ্রান্তিকর।
তিনি বলেন, ইউরোপে অভিবাসন নিয়ে সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে ভুল তথ্যের বিস্তার। অনেকেই মনে করেন ইউরোপে পৌঁছাতে পারলেই শেষ পর্যন্ত বৈধতা পাওয়া সম্ভব। কিন্তু বাস্তবে অনিয়মিত অভিবাসীরা বছরের পর বছর অনিশ্চয়তার মধ্যে জীবনযাপন করেন। অনেক ক্ষেত্রে কাজের সুযোগ সীমিত থাকে, সামাজিক সুরক্ষা পাওয়া যায় না এবং বহিষ্কারের ঝুঁকিও থেকে যায়।
স্পেনে বসবাসরত অপর বাংলাদেশী মরিয়ম রহমান নয়া দিগন্তকে বলেন, ইইউর নতুন অবস্থান স্পষ্টভাবে ইঙ্গিত করছে যে ভবিষ্যতে অ্যাসাইলামের পথ আরও সঙ্কুচিত হবে। বাংলাদেশসহ বেশ কয়েকটি দেশকে নিরাপদ উৎস দেশ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে, এসব দেশের নাগরিকদের আবেদন দ্রুত নিষ্পত্তির আওতায় আনা হবে।
তিনি বলেন, ইউরোপে যাওয়ার ক্ষেত্রে অ্যাসাইলামকে স্থায়ী সমাধান হিসেবে না দেখে বৈধ কর্মসংস্থান, শিক্ষাভিত্তিক অভিবাসন কিংবা সরকার অনুমোদিত অন্যান্য পথকে অগ্রাধিকার দেয়া উচিত। অন্যথায় অনেক মানুষ দালালচক্রের প্রলোভনে পড়ে জীবন ও সম্পদ ঝুঁকির মুখে ফেলতে পারেন।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, স্পেনের বৈধকরণ কর্মসূচি বর্তমানে সেখানে বসবাসরত অনেক বাংলাদেশীর জন্য ইতিবাচক সুযোগ তৈরি করেছে। তবে এটিকে নতুন করে অনিয়মিত অভিবাসন উৎসাহিত করার কারণ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বরং ইইউর কঠোর আশ্রয়নীতি এবং বাংলাদেশকে নিরাপদ দেশের তালিকাভুক্ত করার সিদ্ধান্ত প্রমাণ করছে যে ভবিষ্যতে ইউরোপে বৈধ পথেই অভিবাসনের সুযোগ সবচেয়ে বেশি টেকসই ও নিরাপদ হবে।