বিশ্বকাপ ফুটবল ২০২৬

স্বাগতিক যুক্তরাষ্ট্রেরও বিদায়

Printed Edition
first-2
যুক্তরাষ্ট্রের জালে বল পাঠিয়ে টিমোথি কাস্টাগনকে নিয়ে উল্লাস করছেন বেলজিয়ামের ফরোয়ার্ড রোমেলু লুকাকু : ইন্টারনেট

শুরুটা হয়েছিল কানাডাকে দিয়ে। তিন যৌথ স্বাগতিকের প্রথম দল হিসেবে এবারের বিশ্বকাপ থেকে ছিটকে পড়ে তারা। এরপর মেক্সিকো। ফলে শেষ আশা ছিল যুক্তরাষ্ট্রকে নিয়ে। হয়তো তারা টিকে থাকবে বিশ্বকাপে। কিন্তু তারাও পারল না। নিজেদের মাটিতে আয়োজিত বিশ্বকাপে যুক্তরাষ্ট্রের আশা শেষ হয়ে যায় পরশু রাতে বেলজিয়ামের কাছে ৪-১ ব্যবধানে হেরে। এই ম্যাচে বেলজিয়ামের চার্লস ডি কেটেলার দু’টি গোল করেন এবং একটি গোলে সহায়তা করেন। এতেই ইউরোপিয়ান দলটি চলে গেল কোয়ার্টার ফাইনালে।

ম্যাচের শুরু থেকেই বিতর্ক ছিল যুক্তরাষ্ট্রের তারকা ফরোয়ার্ড ফোলারিন বালোগুনের এক ম্যাচের লাল কার্ডজনিত নিষেধাজ্ঞা ফিফা বিতর্কিতভাবে তুলে নিলে। এতে কোনো কাজই হয়নি। উল্টো প্রথমার্ধে দু’টি গোল হজম। এর পেছনে আমেরিকান ডিফেন্ডারদের দায় ছিল। এ ছাড়া দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতেই গোলরক্ষক ম্যাট ফ্রিসের ভুলে ‘রেড ডেভিলরা (বেলজিয়াম) তাদের তৃতীয় গোলটি পেয়ে যায়। দ্বিতীয়ার্ধে বদলি খেলোয়াড় হিসেবে নামা রোমেলু লুকাকু ইনজুরি টাইমের তৃতীয় মিনিটে বেলজিয়ামের হয়ে শেষ গোলটি করেন।

প্রথম বিশ্বকাপ শিরোপার সন্ধানে থাকা বেলজিয়াম গত ১২ বছরের মধ্যে দ্বিতীয়বারের মতো যুক্তরাষ্ট্রকে শেষ ষোলো থেকে বিদায় করল এবং নিজেদের অপরাজিত থাকার ধারা ১৮ ম্যাচে উন্নীত করল। শুক্রবার ক্যালিফোর্নিয়ার ইংলউডে ২০১০ সালের চ্যাম্পিয়ন স্পেনের মুখোমুখি হবে বেলজিয়াম। এই ম্যাচের বিজয়ী দল সেমিফাইনালে ফ্রান্স বা মরক্কোর বিপক্ষে খেলার সুযোগ পাবে।

৪৮ দলের এই বর্ধিত টুর্নামেন্টে প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপে তিনটি ম্যাচ জেতার পর, ২০০২ সালের পর প্রথমবারের মতো কোয়ার্টার ফাইনালে ওঠার লক্ষ্য পূরণে ব্যর্থ হয় যুক্তরাষ্ট্র। এ ছাড়া ১৯৩০ সালের শুরুর দিকের টুর্নামেন্টে জয়ের পর থেকে বেলজিয়ামের কাছে টানা সপ্তমবারের মতো তারা পরাজিত হলো। ইউরোপীয় প্রতিপক্ষের বিপক্ষে নিজেদের শেষ ১২টি ম্যাচের মধ্যে ১১টিতেই হেরেছে আমেরিকানরা। একমাত্র জয়টি এসেছিল ‘রাউন্ড অব ৩২’-এ বসনিয়া ও হার্জেগোভিনার বিপক্ষে। পুলিসিক, ওয়েস্টন ম্যাককেনি এবং টাইলার অ্যাডামসের নেতৃত্বে এক প্রতিভাবান প্রজন্ম ফুটবলের মর্যাদা কেবল আংশিকভাবেই অর্জন করতে পেরেছে।

৯ মিনিটে ডি কেটেলার বেলজিয়ামকে এগিয়ে দেন; এবারের বিশ্বকাপে এই প্রথম যুক্তরাষ্ট্র ম্যাচের শুরুতে গোল হজম করল। ৩১ মিনিটে যুক্তরাষ্ট্রের টিলম্যানের গোলটি লুমেন ফিল্ডে উপস্থিত ৬৬ হাজার ৯২৫ জন দর্শককে (যাদের অধিকাংশই লাল-সাদা-নীল জার্সিতে সজ্জিত ছিল) উজ্জীবিত করে তোলে। কিন্তু ৩৩ মিনিটে ডি কেটেলার সেই উচ্ছ্বাসে পানি ঢেলে দেন গোলরক্ষক ফ্রিস নিজের পোস্টের সামনে বলের নিয়ন্ত্রণ হারালে। ডি কেটেলার ৫৭ মিনিটে হ্যান্স ভানাকেনকে দিয়ে গোলে করান। এতেই শেষ যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাচে ফেরার লড়াই।

জেরেমি ডোকু এবং কেভিন ডি ব্রুইনার মতো তারকাদের বেঞ্চে রেখেই বেলজিয়াম শুরু থেকে আক্রমণাত্মক খেলা উপহার দেয় এবং আমেরিকানদের রক্ষণভাগের দুর্বলতাকে কাজে লাগায়। ডডি লুকবাকিয়ো মাঠের অপর প্রান্তে কোনাকুনিভাবে একটি লম্বা পাস বাড়ান, যা থেকে ম্যাচের প্রথম গোলটি আসে। লিয়ান্দ্রো ট্রোসার্ড বলটি নিয়ন্ত্রণে নেন এবং তার ক্রসটি অ্যালেক্স ফ্রিম্যান আটকে দিলেও বলটি বাতাসে ভাসতে থাকে। ফ্রিম্যান বলটি পেনাল্টি এলাকার দিকে হেড করেন। টিমোথি কাস্টান সেই বলের পেছনে ছুটে যান এবং ক্রিস রিচার্ডসকে পাশ কাটিয়ে মাঝমাঠের দিকে একটি পাস বাড়ান। ডি কেটেলারে টিম রিম ও অ্যান্টোনি রবিনসনের মাঝখান দিয়ে বেরিয়ে এসে ডান পা দিয়ে বলটি ফাঁকা জালে জড়িয়ে দেন।

এরপর গোলপোস্ট থেকে প্রায় ২৫ গজ দূরে ব্র্যান্ডন মেচেল ফাউল করে বালোগুনকে ফেলে দিলে ফ্রি-কিকে টিলম্যান গোলটি করেন। টিলম্যানের নেয়া শটটি ভানাকেনের মাথায় লেগে দিক পরিবর্তন করে গোলরক্ষক থিবো কর্তোয়ার বাম দিকে চলে যায়। অথচ কর্তোয়া ডান দিকে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন। ৫৭ মিনিটে বেলজিয়াম প্রতিপক্ষের একটি অনাকাক্সিক্ষত ভুলের পূর্ণ সুযোগ কাজে লাগালে যুক্তরাষ্ট্রের কাজ আরো কঠিন হয়ে পড়ে।

যুক্তরাষ্ট্রের গোলরক্ষক ম্যাট ফ্রিস বল ধরতে গোলপোস্ট ছেড়ে অনেকটা এগিয়ে আসেন। কিন্তু বলটিতে লাথি মারার চেষ্টায় তিনি কেবল মাঠের ঘাসেই আঘাত করেন। বলটি চলে যায় হ্যান্স ভানাকেনের নিয়ন্ত্রণে; তার নেয়া শট ডিফেন্ডার টিম রিমকে পরাস্ত করে এবং বেলজিয়ামকে স্বস্তিদায়ক ব্যবধান এনে দেয়।

যুক্তরাষ্ট্র একটি গোল শোধ করার জন্য মরিয়া হয়ে ওঠে এবং বদলি খেলোয়াড় সেবাস্টিয়ান বারহাল্টার দূরপাল্লার শট নিয়ে প্রায় সফলও হতে চলেছিলেন। তবে বলটি বাম দিকের পোস্ট ঘেঁষে সামান্য বাইরে দিয়ে চলে যায়। তার এই প্রচেষ্টা যুক্তরাষ্ট্রের খেলায় প্রয়োজনীয় গতি সঞ্চার করে। ম্যাচের শেষভাগের বেশির ভাগ সময় তারা প্রতিপক্ষের রক্ষণভাগের এলাকায় (অ্যাটাকিং থার্ড) চাপ সৃষ্টি করে খেললেও শেষ পর্যন্ত গোল পেতে ব্যর্থ হয়।

অতিরিক্ত সময়ে রোমেলু লুকাকুর গোলটি যুক্তরাষ্ট্রের জয়ের আশার মূলে চূড়ান্ত আঘাত হানে এবং এর ফলে বেলজিয়াম কোয়ার্টার ফাইনালে স্পেনের মুখোমুখি হওয়ার যোগ্যতা অর্জন করে।