পিপিআরসির আলোচনায় বক্তারা

কর সুবিধা পাওয়া গেলে চলচ্চিত্রশিল্পে ১০ লাখ লোকের কর্মসংস্থান সম্ভব

Printed Edition

বিশেষ সংবাদদাতা

সঠিক নীতিমালা ও কর সুবিধা পাওয়া গেলে শুধু চলচ্চিত্রশিল্পে ১০ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান হতে পারে। শুধু তাই নয়, এই খাতের বাজারের আকার পাঁচ থেকে ১০ হাজার কোটি টাকায় উন্নীত করা সম্ভব। আর এ থেকে সরকারের রাজস্ব আয় হতে পারে ৫০০ থেকে এক হাজার কোটি টাকা।

গতকাল শনিবার বেসরকারি গবেষণা সংস্থা পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টার (পিপিআরসি) আয়োজিত এক ওয়েবিনারে এ তথ্য জানান আলোচকরা।

‘ক্রিয়েটিভ ইকোনমি : স্লোগান নাকি সম্ভাবনা’ বিষয়ে জুম প্ল্যাটফর্মে আয়োজিত এ ওয়েবিনার সঞ্চালনা করেন পিপিআরসির নির্বাহী চেয়ারম্যান ও সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ড. হোসেন জিল্লুর রহমান।

অনুষ্ঠানটি এমন একসময়ে আয়োজিত হলো, যখন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটে প্রথমবারের মতো সৃজনশীল অর্থনীতির জন্য ৮০০ কোটি টাকার একটি কর্মপরিকল্পনা ঘোষণা করা হয়েছে, যার মধ্যে ৩০০ কোটি টাকা সরাসরি বরাদ্দ এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের ঈঝজ তহবিল থেকে আরো ৫০০ কোটি টাকা সংস্থানের পরিকল্পনা রয়েছে। এই উদ্যোগের লক্ষ্য জিডিপিতে খাতটির অবদান বৃদ্ধি করা, প্রায় পাঁচ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা এবং চলচ্চিত্র, সঙ্গীত, প্রকাশনা, ডিজিটাল কনটেন্ট ও ডিজাইনসহ বিভিন্ন খাতজুড়ে ঈৎবধঃবফ রহ ইধহমষধফবংয ব্র্যান্ডিং প্রতিষ্ঠা করা।

আলোচনায় বক্তরা বলেন, বাংলাদেশের সৃজনশীল খাতগুলোতে প্রতিভার কখনো অভাব হয়নি; কিন্তু এই খাতগুলোকে প্রকৃত অর্থনৈতিক গুরুত্বসম্পন্ন খাত হিসেবে খুব কমই বিবেচনা করা হয়েছে; বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই এই কাজ চলেছে নীতিগত সহায়তার পরিবর্তে ব্যক্তিগত ভালোবাসা ও আবেগের জোরে। সরকারের সম্পৃক্ততাও একইভাবে ছিল অসামঞ্জস্যপূর্ণ। সাংস্কৃতিক পৃষ্ঠপোষকতা প্রায়ই শিল্পনীতির পরিবর্তে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হয়েছে, এবং ওটিটি করনীতি, কপিরাইট ও প্রকাশনা সংক্রান্ত নিয়ন্ত্রক কাঠামোগুলো এই খাতগুলোর প্রকৃত কার্যপ্রণালীর সাথে তাল মিলিয়ে চলতে পারেনি।

ওয়েবনিয়ারে অংশ নেন চলচ্চিত্র নির্মাতা ও উদ্যোক্তা আলোচিত ছবি ‘বনলতা এক্সপ্রেসের’ পরিচালক তানিম নূর; ওটিটি প্ল্যাটফর্ম চরকি’র প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা রেদওয়ান রনি; বেঙ্গল ফাউন্ডেশনের মহাপরিচালক লুভা নাহিদ চৌধুরী; নাট্যকার, অভিনেতা ও তারুয়ার ক্রিয়েটিভ ডিরেক্টর বাকার বকুল; ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেড (টচখ)-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাহরুখ মহিউদ্দিন; এবং ক্ল্যাসিক্যাল হ্যান্ডমেড প্রোডাক্টস (ঈঐচ)-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো: তৌহিদ বিন আব্দুস সালাম।

চলচ্চিত্র নির্মাতা তানিম নূর বলেন, সৃজনশীল অর্থনীতির জন্য একটি নির্দিষ্ট করনীতি থাকলে পুরো খাতে অনেক বেশি বিনিয়োগ আসতে পারে। বর্তমানে একটি চলচ্চিত্রে ১০০ টাকা বিনিয়োগ করলে সরকারকে ২৩ টাকা কর হিসেবে দিতে হয়। এটি যদি ১২% নামিয়ে আনা যায় তবে এ খাতে আরো বেশি বিনিয়োগ আসবে। তিনি বলেন, সত্তর বা আশির দশকে দেশের সিনেমাশিল্পের সুবর্ণ সময়ে এ খাতে প্রায় দুই লাখ মানুষ যুক্ত ছিলেন। বর্তমানে ওটিটি প্ল্যাটফর্ম, হল এবং পোস্ট-প্রোডাকশন, ভিএফএক্স বা ভিএফএসের মতো নতুন প্রযুক্তি মিলিয়ে চলচ্চিত্র খাতে ১০ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান হতে পারে। এর মাধ্যমে এই খাতের বাজারের আকার পাঁচ থেকে ১০ হাজার কোটি টাকায় উন্নীত করা সম্ভব। তখন সরকারও বছরে ৫০০ থেকে এক হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আয় করতে পারবে। তবে এ জন্য সঠিক সরকারি নীতি ও পৃষ্ঠপোষকতা প্রয়োজন

চরকির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা রেদওয়ান রনি বলেন, ‘সরকার যদি চলচ্চিত্রশিল্পকে শক্তিশালী করতে চায়, তাহলে অবকাঠামো উন্নয়ন এবং কর ও লাইসেন্সিং নীতি উভয় ক্ষেত্রেই মনোযোগ দিতে হবে। ওটিটি প্ল্যাটফর্মের জন্য তৈরি বাংলাদেশী কনটেন্ট বর্তমানে সাধারণ করপোরেট কাঠামোর অধীনে করারোপিত হয়, কারণ এই খাতের জন্য নির্দিষ্ট কোনো নীতিমালা এখনো তৈরি হয়নি। অথচ নেটফ্লিক্স ও আমাজনের মতো বৈশ্বিক প্ল্যাটফর্মগুলো বাংলাদেশী দর্শকদের কাছ থেকে আয় করলেও, দেশীয় ওটিটি প্ল্যাটফর্মগুলোর মতো একই কর বাধ্যবাধকতার আওতায় পড়ে না, ফলে স্থানীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে অসম প্রতিযোগিতার মুখোমুখি হতে হচ্ছে।’

বেঙ্গল ফাউন্ডেশনের মহাপরিচালক লুভা নাহিদ চৌধুরী মন্তব্য করেন, দেশজুড়ে সৃজনশীল প্রতিভার অভাব না থাকলেও, সেই প্রতিভাকে লালন ও বাণিজ্যিকীকরণ করার মতো ইকোসিস্টেম এখনো যথেষ্ট উন্নত নয়। তিনি বলেন, ‘সরকারকে কাঠামোগত সংস্কার গ্রহণ করতে হবে এবং সৃজনশীল অর্থনীতিকে শক্তিশালী করতে সহায়ক ভূমিকা পালন করতে হবে। শুধু শিল্পীদের ওপরই নয়; বরং পেছনে কাজ করা বিশাল কর্মিবাহিনীর দিকেও দৃষ্টি দিতে হবে।’

সবশেষে সমাপনী বক্তব্যে ড. হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, বাংলাদেশের সৃজনশীল অর্থনীতিকে তার ক্রমবর্ধমান সম্ভাবনার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ একটি নীতি ইকোসিস্টেম প্রয়োজন। তিনি বলেন, ‘শুধু একমাত্রিক অবকাঠামোগত দৃষ্টিভঙ্গি আমাদের এগিয়ে নিতে পারবে না- আমাদের প্রয়োজন মানসম্পন্ন অবকাঠামো, যা টেকসই ব্যবস্থাপনা মডেল ও সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে গড়ে উঠবে। এই খাতের প্রতি করনীতির পর্যালোচনা, রয়্যালটি বণ্টন, কপিরাইট সুরক্ষা এবং লাইসেন্সিং- এগুলোকে নীতিগত অগ্রাধিকার হিসেবে গ্রহণ করতে হবে।

হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, শিল্পকলা একাডেমির মতো প্রতিষ্ঠানগুলো সম্পূর্ণ আমলাতান্ত্রিক মানসিকতায় পরিচালিত হচ্ছে। এগুলো স্মরণসভা বা এ জাতীয় কাজেই বেশি ব্যবহার হয়, যা থেকে কোনো রাজস্ব আসছে না।