মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধাবস্থা : জাতীয় নিরাপত্তা ও দক্ষ কূটনীতিতে জোর
এফএসডিএসের আলোচনা সভায় অভিমত
Printed Edition
নিজস্ব প্রতিবেদক
রাজধানীতে এক উচ্চপর্যায়ের আলোচনায় বক্তারা বলেছেন, মধ্যপ্রাচ্যের চলমান যুদ্ধাবস্থার প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তা, সার্বভৌমত্ব এবং কূটনৈতিক সক্ষমতা জোরদার করা এখন সময়ের দাবি। জনগণের প্রত্যাশা ও জনসমর্থনকে ভিত্তি করে একটি রাষ্ট্র তার কূটনৈতিক অবস্থানকে শক্তিশালী করতে পারে, এমন অভিমত তুলে ধরে তারা বলেন, জাতীয় স্বার্থে দৃঢ় অবস্থান নেয়া ছাড়া কার্যকর কূটনীতি সম্ভব নয়।
মঙ্গলবার (২১ এপ্রিল ২০২৬) রাজধানীর গুলশানে ফাউন্ডেশন ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ (এফএসডিএস) আয়োজিত ‘বর্তমান মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধে ইরানের টিকে থাকা : অসম সহনশীলতা, আঞ্চলিক পুনর্গঠন এবং বৈশ্বিক বিপর্যয়ের যুক্তি’ শীর্ষক এক আলোচনায় এসব বিষয় উঠে আসে। সংস্থাটির কার্যালয়ে আয়োজিত এই অনানুষ্ঠানিক বৈঠকে নীতিনির্ধারক, সাবেক সামরিক ও কূটনৈতিক কর্মকর্তারা অংশ নেন।
এফএসডিএসের চেয়ারম্যান অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল ফজলে এলাহী আকবরের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন প্রিন্সিপাল রিসার্চ ফেলো ও সেক্রেটারি জেনারেল ড. ইশারফ হোসেন। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ড. শাফায়াত আহমেদ। আলোচনায় অংশ নেন সাবেক রাষ্ট্রদূত নাসিম ফেরদৌস, বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের মহাপরিচালক মেজর জেনারেল আ স ম রিদওয়ানুর রহমান, সাবেক আইজিপি মো: আশরাফুল হুদা, সাবেক রাষ্ট্রদূত এ কে এম হুমায়ুন কবীরসহ বিভিন্ন পর্যায়ের বিশেষজ্ঞরা।
বক্তারা বলেন, ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় নানা বাধ্যবাধকতা থাকলেও সেগুলোকে চিহ্নিত করে ধীরে ধীরে জাতীয় স্বার্থে কাজে লাগাতে হবে। একই সাথে বিদেশী নির্ভরতা কমিয়ে বিকল্প কৌশল তৈরি করার ওপরও গুরুত্ব দেন তারা। তাদের মতে, কূটনীতির মূলশক্তি হলো সার্বভৌম স্বায়ত্তশাসনের কার্যকর প্রয়োগ এবং নিজের অবস্থান স্পষ্টভাবে তুলে ধরার সক্ষমতা।
আলোচনায় পররাষ্ট্রনীতিকে রাজনৈতিক বিভাজনের ঊর্ধ্বে রাখার আহ্বান জানানো হয়। বক্তারা উল্লেখ করেন, রাষ্ট্রীয় স্বার্থ ও কৌশলগত বাস্তবতার মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কেবল জনদাবির ভিত্তিতে নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত বিবেচনায় সিদ্ধান্ত নেয়াই পররাষ্ট্রনীতিকে কার্যকর করে তোলে।
মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান পরিস্থিতিকে বক্তারা তিনটি দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্লেষণ করেন- ভূরাজনীতি, ভূঅর্থনীতি এবং সভ্যতার সঙ্ঘাত। বিশেষ করে ইরানের কৌশলগত ধৈর্য, অসম যুদ্ধ পরিচালনার সক্ষমতা এবং জাতীয় ঐক্যকে তারা গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরেন। তাদের মতে, সামরিক শক্তির পাশাপাশি জনগণের নৈতিক দৃঢ়তা ও ঐক্য একটি রাষ্ট্রকে দীর্ঘমেয়াদে টিকিয়ে রাখার বড় উপাদান।
অরাষ্ট্রীয় শক্তির উত্থানকে নতুন ধরনের নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ হিসেবে চিহ্নিত করে বক্তারা বলেন, প্রচলিত কূটনৈতিক কাঠামোর বাইরে গিয়ে নতুন কৌশল গ্রহণ করতে হবে। একই সাথে দেশের আমলাতান্ত্রিক কাঠামোর সীমাবদ্ধতার কথাও তুলে ধরা হয়। মতপ্রকাশের সীমাবদ্ধতা ও নীতিনির্ধারণে স্বচ্ছতার অভাব কূটনৈতিক দুর্বলতা তৈরি করছে বলে তারা মনে করেন।
বক্তারা আরো বলেন, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের অবস্থান শক্তিশালী করতে হলে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, অন্তর্ভুক্তিমূলক নীতিনির্ধারণ এবং জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। বন্ধু রাষ্ট্রের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমিয়ে আত্মনির্ভর কূটনৈতিক সক্ষমতা গড়ে তোলার ওপরও জোর দেয়া হয়।
বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট থেকে শিক্ষা নেয়ার আহ্বান জানিয়ে তারা বলেন, কোনো দেশের অন্ধ অনুকরণ নয়; বরং তাদের কৌশল, ধৈর্য ও অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে বাংলাদেশের বাস্তবতার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নীতি প্রণয়ন করতে হবে। বিশেষ করে প্রতিবেশী দেশগুলোর সাথে সম্পর্ক ব্যবস্থাপনা এবং আঞ্চলিক ভারসাম্য রক্ষায় নতুন দৃষ্টিভঙ্গি জরুরি। আলোচনার শেষাংশে বক্তারা জাতীয় ঐক্য, কৌশলগত দূরদর্শিতা এবং কার্যকর কূটনৈতিক কাঠামো গড়ে তোলার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তাদের মতে, একটি আত্মবিশ্বাসী ও সক্ষম রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তুলতে হলে উন্মুক্ত আলোচনা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং জবাবদিহিমূলক শাসনব্যবস্থা নিশ্চিত করা অপরিহার্য।