বদলগাছীর হাট প্রভাবশালীদের ‘নিয়ন্ত্রণে’
মূল্য তালিকা ছাড়াই খাজনা আদায়
Printed Edition
মো: সাগর হোসেন বদলগাছী (নওগাঁ)
নওগাঁর ঐতিহ্যবাহী বদলগাছী সদর হাটে সরকারি মূল্য তালিকা ছাড়াই খাজনা আদায় এবং কৃষিপণ্য কেনাবেচায় অতিরিক্ত ওজন ব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয় কৃষক ও ব্যবসায়ীদের দাবি, উপজেলা প্রশাসনের কার্যকর তদারকির অভাবে একটি প্রভাবশালী মহল হাটের বিভিন্ন খাত থেকে খাজনা আদায় করছে। এতে সরকারি রাজস্ব ব্যবস্থাপনা ও খাজনা আদায়ের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
উপজেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, বদলগাছী সদর হাট ও বাজারের ১৪৩৩ বঙ্গাব্দের সম্ভাব্য সরকারি ইজারা মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে ৪৬ লাখ ৪৮ হাজার ৬০০ টাকা। সপ্তাহে দুই দিন বসা (বুধবার ও শনিবার) এ হাট উত্তরাঞ্চলের অন্যতম বৃহৎ কৃষিপণ্য বাজার। আশপাশের বিভিন্ন উপজেলা থেকে কৃষকেরা এখানে সবজি ও অন্যান্য কৃষিপণ্য বিক্রি করতে আসেন। এসব পণ্য রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সরবরাহ করা হয়।
স্থানীয়দের অভিযোগ, সরকারের খাস খাজনার আওতাভুক্ত এই হাটে কোনো সরকারি মূল্য তালিকা টানানো হয়নি। ফলে খাজনার হার সম্পর্কে ব্যবসায়ী ও কৃষকেরা অন্ধকারে থাকছেন এবং ইচ্ছামতো খাজনা আদায়ের সুযোগ তৈরি হয়েছে।
স্থানীয় সূত্রের দাবি, উপজেলা বিএনপির প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক আবু রায়হান গিটারের অনুসারীরা হাটের বিভিন্ন খাত থেকে খাজনা আদায়ের সাথে জড়িত। এ বিষয়ে জানতে চাইলে আবু রায়হান গিটার বলেন, ‘এ বিষয়ে সাক্ষাতে কথা বলব।’ পরে তিনি ফোন সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন।
হাটে কৃষিপণ্য কেনাবেচার ক্ষেত্রেও অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। কৃষকদের দাবি, সরকারিভাবে ৪০ কেজিকে এক মণ ধরা হলেও হাটে ৪২ থেকে ৪৩ কেজিতে এক মণ হিসেবে পণ্য কেনা হচ্ছে। পাশাপাশি প্রতি মণে ২০ টাকা করে খাজনাও আদায় করা হচ্ছে।
কৃষক মহিদুল ইসলাম বলেন, ‘আমার কাছ থেকে ৪২ কেজিতে এক মণ ধরা হয়েছে। আবার প্রতি মণে ২০ টাকা করে খাজনাও নেয়া হয়েছে। সরকারি মূল্য তালিকা না থাকায় ইচ্ছামতো খাজনা আদায় করা হচ্ছে।’
আরেক কৃষক আবদুল মতিন বলেন, ‘উৎপাদিত পণ্যের দাম কম। তার ওপর অতিরিক্ত ওজন, খাজনা ও পরিবহন খরচ মিলে আমাদের আর লাভের মুখ দেখতে হয় না।’
অন্যদিকে দীর্ঘদিনের এক ইজারাদার বলেন, তিনি প্রায় ২০ বছর ধরে হাটের ইজারা নিয়ে আসছেন। এবারো দরপত্রের শিডিউল কিনেছিলেন কিন্তু অজ্ঞাত কারণে তাকে প্রক্রিয়া থেকে বাদ দেয়া হয়েছে।
সরেজমিন দেখা গেছে, খাস খাজনা আদায়ের সময় হাটে কোনো সরকারি কর্মকর্তা বা কর্মচারী উপস্থিত থাকেন না। একই সাথে কোথাও সরকার নির্ধারিত খাজনার হারসংবলিত তালিকাও দেখা যায়নি।
এ বিষয়ে দায়িত্বপ্রাপ্ত উপসহকারী ভূমি কর্মকর্তা মো: আবু রায়হান বলেন, খাস খাজনা আদায় ও মূল্য তালিকা টানানোর বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) সাথে আলোচনা করে জানাতে পারবেন।
সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো: পলাশ উদ্দিন বলেন, হাট-বাজার ইজারা ও খাজনা আদায়সংক্রান্ত বিষয়গুলো ইউএনও কার্যালয়ের সিদ্ধান্তের আওতাভুক্ত।
বদলগাছী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ইসরাত জাহান ছনি বলেন, সদর হাটে খাস খাজনা আদায় করা হচ্ছে। খাজনা আদায়ের সময় সরকারি কর্মকর্তা উপস্থিত ছিলেন না। বিএনপির নেতাকর্মীরা হাট নিয়ন্ত্রণ করছেন বা খাজনা আদায় করছেন- এমন কোনো তথ্য আমার জানা নেই। তিনি আরো বলেন, হাটে খাজনা আদায়ের দায়িত্বে সহকারী তহশিলদার রয়েছেন। আগামী মাসের মধ্যে সরকার নির্ধারিত খাজনার মূল্য তালিকা টানানোর ব্যবস্থা করা হবে।
তবে খাজনা আদায়ের অর্থ কোন হিসাবে জমা হচ্ছে, এ পর্যন্ত কত টাকা আদায় হয়েছে এবং আদায়ের হিসাব সংরক্ষণের দায়িত্বে কারা রয়েছেন- এ বিষয়ে প্রশাসনের পক্ষ থেকে সুনির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া যায়নি। স্থানীয়রা এসব অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন।