মহিলাদের ঈদজামাত : ড. মাহফুজুর রহমান আখন্দ
মহানবী সা.-এর বাণী থেকে এটি পরিষ্কার যে, ঈদের নামাজ শুধু পুরুষের জন্য নয়; বরং মহিলারাও ঈদের নামাজ আদায় করতে ঈদগাহে যাবে
Printed Edition
ঈদ মুসলমানদের আনন্দের দিন। একে পুরস্কার প্রাপ্তির দিনও বলা হয়। এই আনন্দ বা পুরস্কার নারী-পুরুষ সবার জন্য। দীর্ঘ এক মাস সিয়াম সাধনার পরে ফলাফল প্রকাশ করা হয় ঈদের দিনে। এই ফলাফল শুধু পুরুষদের জন্য নয়। নারী-পুরুষ, শিশু-যুবা, পৌঢ়-বৃদ্ধ- সবার জন্য। মহান আল্লাহর বিধান এবং রাসূল সা:-এর সুন্নাহ পালনের তাকিদও একক কারো জন্য নয়। সবার জন্য প্রযোজ্য। নামাজ, রোজা, হজ, জাকাত, দান-সাদাকা, বিয়ে-শাদী ইত্যাদি সব ধর্মীয় বিধান যেমন শুধু পুরুষদের জন্য নয়, তেমনি ঈদের নামাজসহ অন্যান্য কোনো নামাজ জামাতের সাথে আদায় করার বিধানও একক কারো জন্য খাস নয়। শরিয়াহর বিধান অনুযায়ী সবার জন্য প্রযোজ্য। আনাস রা: থেকে বর্ণিত- তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সা: মদিনায় এলেন। সে সময় মদিনার অধিবাসীর দু’টি উৎসবের দিন ছিল, যাতে তারা আনন্দ-ফুর্তি করত। তখন তিনি জিজ্ঞেস করলেন, এ দু’টি দিবস কীসের? তারা বললেন, জাহেলি যুগে আমরা এ দু’টি দিনে আনন্দ-ফুর্তি করতাম। এ কথা শুনে রাসূলুল্লাহ সা: বললেন, আল্লাহ তায়ালা এ দু’টি দিনের পরিবর্তে তোমাদেরকে উত্তম দু’টি দিন দান করেছেন। সে দিন দুটি হলো- ‘ইয়াওমুল আজহা’ ও ‘ইয়াওমুল ফিতর’ অর্থাৎ- ঈদুল আজহা ও ঈদুল ফিতরের দুই দিন।’ (সুনানে আবু দাউদ-১১৩৪, মুসনাদে আহমদ-১২০০৬) আবু দাউদ শরিফে হজরত বকর ইবনে মোবাশ্বের আল আনসারি রা: থেকে বর্ণিত- তিনি বলেন, ঈদুল ফিতর এবং ঈদুল আজহার দিন আমরা রাসূল সা:-এর সাথে ঈদগাহে যেতাম এবং রাসূল সা:-এর সাথে নামাজ আদায় করে বাড়ি ফিরতাম।
১২ অথবা ছয় তাকবিরের সাথে ঈদের দিন দু’রাকাত নামাজ জামাতের সাথে আদায় করা সবার জন্য সুন্নতে মুয়াক্কাদাহ বা ওয়াজিব। রাসূল সা: মক্কা থেকে মদিনায় হিজরতের পর থেকে নিয়মিত তা আদায় করেছেন। জীবনে কখনো তরক করেননি; কিংবা ছেড়ে দেননি। সূর্যোদয় হওয়ার পর হতে সূর্য মধ্য আকাশে উপনীত হওয়ার মধ্যবর্তী যেকোনো সময় আদায় করতে হবে। সূর্য পশ্চিম দিকে ঢলে গেলে এ নামাজ আদায় করা যাবে না। কোনো কারণবশত সূর্য মধ্যগগনে উপনীত হওয়ার আগে নামাজ আদায় করতে না পারলে ঈদুল ফিতরের নামাজ পরের দিন ও ঈদুল আজহার নামাজ ১২ জিলহজ পর্যন্ত ওই ওয়াক্তে আদায় করা যাবে।
ঈদের নামাজ ও জুমার নামাজের মতো জামাতে আদায় করতে হবে। একাকী এ নামাজ আদায় করা যাবে না। জুমার নামাজ মসজিদেই আদায় করা হয়। গ্রামের ছোট ছোট পাঞ্জেগানার সামনে অথবা ছোট ছোট মসজিদের সামনে তো দূরের কথা; স্বয়ং রাসূল সা: মদিনা শহরেই ঈদের নামাজ আদায় না করে শহরের সন্নিকটে মদিনার পার্শ্বে এক বিশাল মাঠে আজীবন ঈদের নামাজ আদায় করেছেন। মাত্র একবার প্রবল বৃষ্টির কারণে মসজিদে ঈদের নামাজ আদায় করেছেন। ঈদের নামাজ মাঠে পড়া উত্তম ও সুন্নত। ঈদের নামাজ নারী-পুরুষ সবার জন্য ওয়াজিব। বিনা ওজরে ঈদের নামাজ মসজিদে আদায় করা মাকরুহ। তবে ঝড়, বৃষ্টি-তুফান, মাঠের ব্যবস্থা না থাকা ইত্যাদি ওজরে ঈদের নামাজ মসজিদে পড়া যায়।
রাসূল সা:-এর জীবনে মাত্র একবার প্রবল বৃষ্টির কারণে ঈদের নামাজ মসজিদে পড়েছিলেন। আর বাকি সারা জীবনই মাঠে পড়েছেন। বুখারি শরিফে বর্ণিত হয়েছে- মহানবী সা: ইরশাদ করেছেন, ‘ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহার দিন ঈদগাহে গিয়ে ঈদের নামাজ আদায় করো।’ বুখারি শরিফে হজরত আনাস রা: হতে বর্ণিত- তিনি বলেন, রাসূল সা: ঈদুল ফিতরের দিন কিছু খেজুর বা মিষ্টিজাতীয় দ্রব্য না খেয়ে ঈদগাহে যেতেন না। হজরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা: থেকে বর্ণিত- তিনি বলেন, রাসূল সা: ঈদুল ফিতরের দিন ঈদগাহে যেতেন এবং দুই রাকাত নামাজ আদায় করতেন। যার আগে বা পরে আর কোনো নামাজ পড়েননি। তিনি আরো বলেন, রাসূল সা: এক পথে ঈদগাহে যেতেন এবং অন্য পথে ঈদগাহ থেকে বাড়ি ফিরতেন। হজরত বুরাইদা রা: থেকে বর্ণিত- তিনি বলেন, রাসূল সা: কিছু না খাওয়া পর্যন্ত ঈদগাহে বের হতেন না এবং ঈদুল আজহার দিন নামাজ না পড়া পর্যন্ত কিছু খেতেন না।
হজরত জাবির ইবনে আব্দুল্লাহ রা: থেকে বর্ণিত- তিনি বলেন, রাসূল সা: দুই ঈদের উদ্দেশে বের হতেন এবং তাঁর পরিবার-পরিজনকে বের হওয়ার নির্দেশ দিতেন। হজরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা: থেকে বর্ণিত- তিনি বলেন, রাসূল সা: দুই ঈদের নামাজ আদায়ের জন্য ঈদগাহের দিকে বের হতেন এবং তাঁহার কন্যা ও স্ত্রীগণকেও বের হতে নির্দেশ দিতেন। হজরত আয়েশা রা: থেকে বর্ণিত- তিনি বলেন, রাসূল সা:-কে জিজ্ঞাসা করা হলো- মহিলারা কি ঈদের নামাজের জন্য ঈদগাহে যাবে? তিনি বললেন, হ্যাঁ অবশ্যই। জিজ্ঞাসা করা হলো- যুবতী মেয়েরাও কি বের হবে? তিনি বললেন, হ্যাঁ। রাসূল সা: আরো বলেন, নিজের কাপড় না থাকলেও কোনো সঙ্গী সাথীর কাপড় পরে ঈদগাহে যাবে। মুসনাদে আহমাদে বর্ণিত আছে- হজরত উম্মে আতিয়াহ রা: থেকে বর্ণিত- তিনি বলেন, রাসূল সা: আমাদেরকে ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহার দিনে যুবতী, অন্তঃপুরবাসিনী ও হায়েজ সম্পন্না মহিলাদের ঈদগাহের মাঠে নিয়ে যেতে নির্দেশ দিয়েছেন।
বুখারি শরিফের বর্ণনায় পাওয়া যায়- হজরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা: থেকে বর্ণিত- তিনি বলেন, রাসূল সা: একবার ঈদের দুই রাকাত সালাত আদায় করেন এবং এর আগে পরে আর কোনো সালাত আদায় করেননি। তারপর তিনি মহিলাদের কাছে আসেন এবং তাদেরকে সদকা করার নির্দেশ দেন। তখন উপস্থিত মহিলারা নিজেদের কানের দুল, নাকের বালা ইত্যাদি দান করল, সাথে হজরত বিলাল রা: উপস্থিত ছিলেন।
উল্লিখিত হাদিস ও রাসূল সা:-এর সুন্নাহর উপর সব আলেম-ওলামা ঐকমত্য পোষণ করেছেন, বিনা ওজরে ঈদের সালাত মসজিদে পড়া মাকরুহ। ঈদের মাঠ থাকা অবস্থায় ঈদের নামাজ মসজিদে আদায় করা যাবে না।
আধুনিক তথ্য ও প্রযুক্তি সমৃদ্ধ যুগে অবশ্যই এর প্রতিকার হওয়া দরকার এবং দেশের অর্ধেক জনশক্তি মা-বোনদের ন্যায্য অধিকার বাস্তবায়নে সরকার প্রশাসন এবং সব শ্রেণিপেশার মানুষকে এগিয়ে আসা দরকার। তাহলে অতি সহজে ইসলামের অনেক বিষয়ে মহিলাদের জ্ঞান লাভ সম্ভব হবে এবং মহিলাদের দ্বারা যে সব অসামাজিক কাজ সংঘটিত হচ্ছে তা অনেকাংশে কমে যাবে। শুধু তাই নয়, সংসারে পরিবারে সমাজে তাদের দায়িত্বানুভূতি বৃদ্ধি পাবে। পরোক্ষভাবে সুন্দর সমাজ গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালনে সহায়ক হবে। সর্বোপরি পবিত্র কুরআনে সূরা হাশরের ৭ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তায়ালা বলেন- ‘তোমাদের জন্য রাসূল সা: যা নিয়ে এসেছেন তা গ্রহণ করো এবং যা নিষেধ করেছেন তা বর্জন করো। সূরা আলে ইমরান ৩১ আয়াতে আরো ইরশাদ হচ্ছে- ‘হে নবী আপনি বলুন, তোমরা যদি আল্লাহর ভালোবাসা পেতে চাও তাহলে আমার অনুসরণ করো, তাহলেই তোমরা আল্লাহর ভালোবাসা পাবে, আর তিনি তোমাদের অপরাধসমূহ ক্ষমা করে দেবেন। নিশ্চয় তিনি অত্যন্ত ক্ষমাশীল ও দয়াময়।’
মহানবী সা.-এর বাণী থেকে এটি পরিষ্কার যে, ঈদের নামাজ শুধু পুরুষের জন্য নয়; বরং মহিলারাও ঈদের নামাজ আদায় করতে ঈদগাহে যাবে। অথচ আমাদের দেশে খুব কম সংখ্যক এলাকা আছে যেখানে মহিলাদের ঈদের নামাজের ব্যবস্থা করা হয়। আর অধিকাংশ এলাকা এবং ইমাম সাহেবরা মহিলাদের ঈদগাহে যাওয়াকে ফিতনা বলে এড়িয়ে চলেন। অথচ খোদ মহানবী সা: তাঁর নিজের বাস্তব আমল সাহাবায়ে আজমাইন, মক্কা-মদিনাসহ পৃথিবীর সব মুসলিম রাষ্ট্রে যা নিয়মিত আমল হচ্ছে। অথচ এদেশে কিছু খোঁড়া অজুহাতে ইসলামের বড় এবং অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিধান লঙ্ঘন হচ্ছে। ঈদের জামাতের দায়িত্বরত ব্যক্তিরা এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণের যথাযথ প্রচেষ্টা করবেন ইনশাআল্লাহ।