বিশ্ব অর্থনীতিতে উপসাগরীয় প্রভাব কতটা গুরুত্বপূর্ণ?

আলজাজিরার বিশ্লেষণ

Printed Edition
onno-4
হরমুজ প্রণালীতে ইরানি যুদ্ধজাহাজ : ইন্টারনেট

বিশ্ব অর্থনীতি কি উপসাগরীয় দেশগুলোর ওপর আগের চেয়ে বেশি নির্ভরশীল? সাম্প্রতিক ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং বিশেষ করে ২০২৬ সালের শুরুতে শুরু হওয়া ইরান-ইসরাইল-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে এই প্রশ্নটি আরো জোরালো হয়ে উঠেছে। আলজাজিরা তাদের এক বিশেষ ভিডিও বিশ্লেষণে দেখিয়েছে যে, উপসাগরীয় অঞ্চলের (জিসিসি) স্থিতিশীলতা কেবল মধ্যপ্রাচ্যের জন্য নয়, বরং পুরো বিশ্বের টিকে থাকার জন্য কতটা গুরুত্বপূর্ণ।

যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইল বনাম ইরান যুদ্ধের প্রভাবে পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলোর অর্থনীতি বর্তমানে এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে, যার কম্পন অনুভূত হচ্ছে বিশ্বের প্রতিটি প্রান্তে। বিশ্লেষণে উঠে এসেছে, কেন এই অঞ্চলের অর্থনীতি কেবল তেলের বাজার নয়, বরং পুরো বৈশ্বিক ব্যবস্থার টিকে থাকার জন্য এক অপরিহার্য স্তম্ভ।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত কয়েক দশকে উপসাগরীয় দেশগুলো তাদের অর্থনীতিকে তেলের বাইরে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলেও, বর্তমান যুদ্ধ পরিস্থিতি প্রমাণ করেছে যে জ্বালানি এখনো বিশ্ব অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি। বিশেষ করে গত দুই সপ্তাহে হরমুজ প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হওয়ায় বিশ্বজুড়ে জ্বালানি তেলের সরবরাহে যে সঙ্কট তৈরি হয়েছে, তা ১৯৭০-এর দশকের তেল সঙ্কটের চেয়েও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। আলজাজিরার তথ্যমতে, বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) এই অঞ্চল থেকে আসে, যা বর্তমানে অনিশ্চয়তার মুখে।

বিশ্লেষণটিতে আরো উঠে এসেছে যে, এই সঙ্কট কেবল পেট্রোল পাম্পের লাইনেই সীমাবদ্ধ থাকছে না। উপসাগরীয় অঞ্চলের অস্থিরতা এখন সরাসরি বৈশ্বিক খাদ্য নিরাপত্তাকে আঘাত করছে। সার উৎপাদনের প্রধান উপাদান হিসেবে ব্যবহৃত প্রাকৃতিক গ্যাস এবং ইউরিয়া রফতানির একটি বিশাল অংশ এই অঞ্চল থেকে আসে। ফলে লাতিন আমেরিকা থেকে দক্ষিণ এশিয়া- সবখানের কৃষিখাত এখন এক গভীর সঙ্কটের মুখোমুখি। আলজাজিরার অর্থনৈতিক সম্পাদক এড কনওয়ে মনে করেন, এই যুদ্ধ কেবল সামরিক সংঘাত নয়, বরং এটি একটি ‘গ্লোবাল সাপ্লাই চেইন’ বা বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থার বিপর্যয়।

কেবল জ্বালানি বা খাদ্য নয়, উপসাগরীয় দেশগুলোর হাতে থাকা ‘সোভেরেন ওয়েলথ ফান্ড’ বা বিশাল বিনিয়োগ তহবিলগুলো এখন বিশ্ববাজারের স্থিতিশীলতা রক্ষা করছে। সৌদি আরবের পিআইএফ বা কাতারের কিউআইএ-এর মতো প্রতিষ্ঠানগুলো পশ্চিমা বিশ্বের প্রযুক্তি ও রিয়েল এস্টেট খাতে যে ট্রিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করে রেখেছে, এই অঞ্চলের অস্থিতিশীলতা সেই পুরো বিনিয়োগ ব্যবস্থাকে ঝুঁকির মুখে ফেলে দিচ্ছে। প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, যদি এই যুদ্ধ আরো দীর্ঘায়িত হয়, তবে বিশ্ব অর্থনীতিতে যে স্থবিরতা ও মুদ্রাস্ফীতি তৈরি হবে, তা থেকে মুক্তি পাওয়া গত কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে কঠিন চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে।

আলজাজিরা এই সতর্কবার্তা দিয়েছে যে, উপসাগরীয় অঞ্চলের অর্থনৈতিক গুরুত্ব বর্তমানে এমন এক উচ্চতায় পৌঁছেছে যেখানে এখানকার শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখা কেবল আঞ্চলিক বিষয় নয়, বরং তা বৈশ্বিক টিকে থাকার লড়াই। কারণ, দুবাই বা দোহার বাজারে লাগা আগুনের আঁচ এখন ওয়াশিংটন থেকে টোকিও- সবখানেই সমানভাবে অনুভূত হচ্ছে।