ঘুণ : দীলতাজ রহমান

Printed Edition
id
ঘুণ : দীলতাজ রহমান

একদিন এক উঠতি গায়িকা, মানে তার স্বতন্ত্র কণ্ঠ ও দেহবল্লরীর আবেদনময় সঞ্চালনার জন্য তখন তিনি উঠেই গেছেন। তো সে তরুণী গায়িকা এক খবরের কাগজের অফিসে এক সাহিত্য-সম্পাদকের দফতরে এক সোনালি বিকেলে বসে অনেক কথার ভেতরে টেবিল চাপড়ে বলছিলেন, ছেলে আজ বাবার জন্য মন ভার করে ছিল। বলছিল, সবার বাবা সবাইকে নিয়ে বেড়াতে যায়, কিন্তু আমার বাবা আমাদের কাছে আসে না।

ছেলের কথায় আমি তখনি তাকে নিয়ে মার্কেটে গেলাম। বললাম, বাবা থাকলে কী কী কিনে দিত নে, সব নে যা যা তোর দরকার!

ছাপোষা জবুথবু এক মাঝারি বয়স্ক লেখক ঠিক সেই মুহূর্তে সেখানে গিয়ে উপস্থিত হলেন। তিনি গিয়েছিলেন লেখা দিতে। তিনি সেলিব্রেটি হয়ে ওঠা গায়িকাকে দেখে প্রথমে আহ্লাদিত হয়েছিলেন, কারণ তার শুধু গান নয়, তার শরীর দোলানোও অন্য সবার মতো সে লেখকেরও ভালো লাগত। কিন্তু সামনা সামনি গায়িকার অমন কথা শুনে লেখক হতাশ হলেন। ভাবলেন, এই শ্রেণী তাহলে এমনিভাবে এই অবক্ষয় ধারণ করে বাঁচে! লেখকের নিজের শিশুকালটা ভেসে ওঠে মনে। কোনো চাহিদা জানা ছিল না। পিতার উষ্ণ ওমই শৈশবের বড় সঞ্চয় হয়ে আছে। নিজের সন্তানদেরও তিনি অবচেতনে সেটুকুই দেয়ার চেষ্টা করে চলেছেন। ছাপোষা এরপর আগবাড়িয়ে একটি প্রশ্ন করে ফেললেন গায়িকার মুখের ওপর- এরপর কি হলো? ছেলের মন থেকে ছেলের বাবার সান্নিধ্যের তৃষ্ণা মিটে গেল?

সাহিত্য সম্পাদকের টেবিলের অন্যকেউ এ নিয়ে আর কোনো প্রশ্ন না করলেও ছাপোষা করে ফেললেন। আর গায়িকাও টেনে উত্তর দিলেন হ্যাঁয়য়্যা।

তো কতদিন রাখবেন তাকে এভাবে?’ ছাপোষা আবার প্রশ্ন করলেন! এবার সবারই একটু ভড়কে যাওয়ার দশা হলো, সাহিত্যসম্পাদকের টেবিল ঘিরে যারা বসেছিল। সাহিত্যসম্পাদক পেলেন রীতিমতো ভয়। কারণ গায়িকার সাথে তার ব্যক্তিগত খাতির থাকায় মাঝে মধ্যে তার কাছে দপদপিয়ে চলে আসে। আর এতে সবার কাছে তার প্রেস্টিজ বেড়ে যায়। তবে গায়িকা আসেন কখনো তার নিজের সম্পর্কে রটনা ঠেকাতে। কখনো রটনা বাড়াতে। কখনো রটনার মোড় ঘোরাতে। আর তার জন্য গায়িকার দান-দক্ষিণাটুকু যথাযথ সাংবাদিকের পকেটে সাহিত্যসম্পাদকের হাত গলিয়েই যায়!

মাঝারি লেখকের এই একটি সরল প্রশ্নের কারণে সাহিত্যসম্পাদক তরল দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে বললেন, লেখা দিতে এসেছেন? দিয়ে চলে যান।

আমার কিছু বিল পাওনা আছে। আর আমার ওনার কাছ থেকে উত্তরটাও দরকার।

পাশের একজন নিজের টেবিল থেকে বললেন, দেখেন আপনার প্রশ্নের উত্তর সন্তোষজনক হলে তো একটিও দাম্পত্য সম্পর্ক ভাঙত না। আমাদের গায়িকা আপার উপায়টা হচ্ছে ঘা’-এর ওপর ব্যান্ডেজ বেঁধে ক্ষত এবং দুর্গন্ধ দুই-ই ঢেকে রাখার প্রচেষ্টা। তাই আপনার এটা একটি অমীমাংসিত প্রশ্ন। আপনি বরং চলেই যান। আমিও যেমন এখানে থেকেও নেই হয়ে আছি! হাঁ হাঁ হাঁ।

লেখক বোঝেন, তাকে আর ওখানে কেউ চাচ্ছে না। অথচ তিনি আশা করেছিলেন ওখানে সবার সাথে তার জন্যও এককাপ চায়ের অর্ডার হবে। বাড়তি একটা সিংগাড়া আসবে!

কিন্তু প্রচণ্ড অপমান বোধ নিয়ে তাকে যেহেতু উঠতে হচ্ছে, সেই জ্বালা থেকে তিনি গায়িকার চোখে চোখ বিঁধিয়ে বললেন, একটি কথা মনে রাখবেন, সন্তান সবসময় ভিকটিমের পক্ষে থাকে! মানে মা এবং বাবা, দু’জনের ভেতর যে অত্যাচারিত হয়! আর যে অত্যাচার করে তার প্রতি জন্মে ক্ষোভ-ঘৃণা। আপনি হয়তো বাচ্চাটিকে পুষে-কাছে পেয়ে সুখ পাচ্ছেন আর ভাবছেন আপনার সেই সুখে তার জীবন ভরিয়ে দিচ্ছেন। তা নয় কিন্তু! ঘরভাঙা যদি অনিবার্য হয়, আপনারা ঘর ভাঙবেন! ভাঙবেন না কেন? কিন্তু প্রথমত দেখবেন না ভাঙলে চলে কি না! তারপরও যদি ভাঙেনই, সন্তানকে নিজের সম্পত্তি বানিয়ে রাখবেন না! সে বাবার কাছে যেতে চাইলে তার বাবাকে সে কথা জানান দিন! এ বিষয়ে সে দায়িত্ব এড়াতে চাইলেও আপনার কাজটি আপনি সারুন! উঠতি বয়সে অনেকে ঘুমের বড়ি খেয়ে অথবা উঁচু ভবন থেকে লাফিয়ে পড়ে বা ট্রেনের নিচে ঝাঁপিয়ে পড়ে জীবন দেয়, খোঁজ নিয়ে দেখবেন তাদের শৈশবেও খেলনাপাতি-পোষাক-আশাক, চকোলেটের অভাব ছিল না! বরং ওগুলোর আধিক্য থাকে বলেই না মেটা তৃষ্ণাটা প্রবলভাবে জেগে থাকে! প্রেমেন্দ্র মিত্রের দু’টি লাইন শোনেন, ‘মেটার যা নয়/ সেই তৃষ্ণাই প্রাণের গহন উৎস চেনায়!’ অতএব, যে তৃষ্ণা নিয়ে যে বড় হবে ফুলে- ফেঁপে তাই তাকে ছাপিয়ে থাকবে।

বয়সে মাঝারি লেখক এবং ছাপোষা তিনি লেখেনও ভালো। তাই তাকে গলা ধাক্কা দিয়ে বের করে দিলে পরিণতি কী হতে পারে, তা সাহিত্যসম্পাদক জানেন বলেই ধাক্কাটা দিলেন না। তিনি নিজেকে দমন রেখে চোখ রাগিয়ে বললেন, আপনাকে যেতে বলছি কিন্তু! আপনি কে এখানে এত কথা বলার জন্য?’

ছাপোষা বললেন, আমি লেখক। একজন লেখককে সময়ের কথা সময়েই ব্যক্ত করতে হবে! না হলে আর কে বলবে? আমার এই কথাগুলো আপনারও তো বলা উচিত!’ বলে ছাপোষা দ্রুত পত্রিকা অফিসের পাঁচতলা থেকে সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতে বিড়বিড় করে বলতে লাগলেন, আমরা জানিনে যেন, খ্যাতিতে এগিয়ে যাওয়ায় এখন আর খ্যাতিহীন সাংবাদিক স্বামীকে গায়িকার ভালো লাগছে না! আর ওই সাহিত্যসম্পাদক, যে ওনার বাসায় প্রায়ই যান, যা তিনি নিজেই প্রায়ই প্রসাদিত হয়ে প্রচার করেন, তিনি কি গায়িকার বাসায় জিকির করতে যান! আমি তো আর এই এক পত্রিকা অফিসেই আসি না! বিখ্যাতদের যেখানে যা ঘটে, কিছু তো তাদের সাথে চলাফেরা করা মানুষের কানে আসে!

গায়িকা যখন আরো বিখ্যাত হয়ে যায়, লেখকের বয়সও তখন আরো বছর পনের বেড়ে গেছে। কিছুটা নূব্জও হয়ে গেছেন তিনি। কিন্তু ছাপোষা সে লেখকের ওই সেদিনের সেই ঘটনা একেবারে গতকালই মাথায় বেঁধা পেরেকের মতো দগদগে হয়ে আছে তার বাকি জীবন! যেন গায়িকার শিশু ছেলেটি তিনি নিজে। যে বাবার কথা ভুলতে রাশিরাশি খেলনার ভেতর বসে একহাতে চকোলেট আরেক হাতে আইসক্রিম চাটছে, যার দৃষ্টি উ™£ান্ত-লক্ষহীন! কান পাশের ঘরে মায়ের কাছে আসা মানুষের কথপোকথনে।

একদিন একবাড়িতে লেখক বেড়াতে গেলে তাদের টিভিতে গানের অনুষ্ঠান চলছিল। এর ভেতর এলো সেই গায়িকার গান গাওয়ার পালা। তার চটকদার গানের সাথে দেহভঙ্গি সব কজন দর্শকের নজর টেনে রাখল। তারপর আরো কজন গান গাইতে থাকলেও পরিবারের সবাই শিল্পী রোয়েনার গানই শুধু নয়, তার উত্থান ও কিছুটা ব্যক্তিজীবনও নিয়ে মেতে উঠল। লেখক দেখলেন, বাড়ির মানুষ যা বলছে, অনেকটাই আজগুবি মনে হচ্ছে। কারণ তিনি তো ভেতরগত বিষয়টি সেই কবেই জেনে আসছেন! স্বামী তার মতো এগোতে পারেননি বলে স্ত্রীর অবহেলা ও স্ত্রীর উত্থানের সিঁড়ির প্রতি স্বামীর সন্দেহ দুজনকে দুই দিক করে দিয়েছিল।

লেখক বাসার সদস্যদের প্রতি আচমকা একটি প্রশ্ন করে ফেললেন। বললেন, আচ্ছা, গায়িকা রোয়েনার একটি ছেলে আছে, সে নিশ্চয় অনেক বড় গায়ক হয়েছে? তার নাম কি?’ কারো কাছ থেকে উত্তর আসছে না দেখে তিনি আবার বললেন, গায়ক না হলেও আরো ভালো কিছু হয়েছে নিশ্চয়?

পরিবারের প্রধান যিনি তিনি বেশ ইতস্তত হয়ে বললেন, আরে বন্ধু তুমি ছেলেমেয়ের ভেতর কী সব প্রশ্ন করছ? এসব খবর রাখবার কথা বিনোদন পাতার সাংবাদিকদের! হাঁড়ির খবর সব জানলেই তো সব লেখা যায় না, লেখক হয়ে বুঝি তা জানো না?

বাহ্, তারা যা জানেন তাই লেখেন। কিন্তু পড়েন কারা? তুমি পড়ো না?

-না আমার তেমন কিছু নজরে আসেনি!

-আমি আজ উঠি!

-কী ব্যাপার? তোমার একটা প্রশ্নের জবাব পেলে না বলে উঠে যাবে? আমাদের দু’জনের আড্ডাই তো হলো না! বসো, আজ আমাদের খুদের ভাত রান্না হয়েছে!

-খুদের ভাত? বহুদিন পর শুনলাম খাবারটির নাম।

-হ্যাঁ আগে যা মানুষ অভাবে খেতো, এখন তাই মানুষ শখে খায়। আগের খুদে কত কুন ছিল তাও আমাদের পেট হজম করে ফেলত, তাই না! এখন চাল কেটে ছোট করতে মানে চালকে মিনিকাট করতে যে ভাঙা অংশ বেরোয়, দানা দানা ছাঁকা ধবধবে খুদ, তাও তেল বা ঘি দিয়ে রাঁধতে হয়! আর তা খাওয়া নিয়েও কত আড়ম্বর।

লেখকের তর সইছিল না। তিনি রাস্তায় নেমেই এক বিনোদন পাতার সাংবাদিককে ফোন করলেন এবং সরাসরি জানতে চেয়ে বললেন- শোনো আমি আসগর আলি। লেখালেখি করি।

-চিনেছি! চিনেছি!

-আচ্ছা শোনো, তোমাকে তুমি করে বলছি বলে কিছু মনে করো না!

-হ্যাঁ তাই তো বলবেন! কিন্তু ফোন করেছেন কেন তাই বলেন!

-বলছি, বিখ্যাত গায়িকা রোয়েনার একটি ছেলে আছে জানতাম, সে এখন কী করে জানো?

-হঠাৎ করে রোয়েনার ছেলের কথা আপনার জানার ইচ্ছে হলো কেন, আমাকে আগে তাই জানতে হবে। হাঁ হাঁ হাঁ।

-এমনি মনে হলো। তার ছোটবেলায় তাকে চিনতাম, তাই! আর যে কারো ছেলেমেয়ের কে কি করে তা যে কেউ জানতে পারে না?

-বলার মতো নয় বলে বলছি না!

-আমি বরং তোমার অফিসে আসি, কী বলো?

-এখনি?

-আমি পথেই আছি! খালি পথের ভেতর পথ বদলে নেবো! আসো তো অফিসে?

-মাত্র এলাম। আসেন! আর আপনি কিন্তু আমাকে বিষয়ভিত্তিক লেখা দিতে পারেন! সম্মানী পাবেন।

- সে হবে! আমি আসছি!

বিনোদন পাতার সাংবাদিক সুজাত রায়হান বলতে শুরু করলেন- রোয়েনা নিজে অতো সময় দিতে পারেনি ছেলেকে। কাজের লোকদের মানা দূরে থাক তাদের গায়ে হাত তুলত শিশু বয়স থেকেই। তারপর তারাও তো আর ছেড়ে দিতো না। এমন ঘটনায় দোটানায় থাকতে হয়েছে রোয়েনাকে। তার ওপর আবার ক’বার ছেলে বাসা থেকে পালিয়েছেও। নানা-নানীও নাতিকে টেককেয়ার করতে এসে অতিষ্ঠ হয়ে চলে যেত। লেখাপড়ায় পিছাতে পিছাতে রোয়েনার আর ছেলেকে এগিয়ে নেয়ার অবস্থা ছিল না। তার ভেতর কিভাবে যেন নেশা করা শিখে গিয়েছিল। পরে রোয়েনা ছেলের নিজের কেরিয়ার শুধু নয়, গা বাঁচাতেও নিজেই নেশার দ্রব্য কিনে দিতো, যা এখনো দিতে হয়। এদের তো আর বিয়ে হয় না কিন্তু বিনিপয়সায় নেশার লোভে ছেলের রুমে গার্লফ্রেন্ডদের আনাগোনা লেগেই আছে!

-রোয়েনার ছেলের নাম?

-নাম থাক।

- ছেলের বাবা কখনো ছেলের খোঁজখবর রাখেনি?

-কোনো কোনো মানুষ ঘর হারালে আবার নতুন ঘর বাঁধে। কোনো কোনো মানুষ ভাঙা ধসের মতো ঘোলাজলে মিশে যায়। তুহিনের অবস্থা তাই-ই হয়েছে। ও যেকোনো উপায়ে আমেরিকা গিয়েছিল। বৈধ কাগজপত্রের অভাবে আর ফিরতে পারেনি। সেখানে ও ভালো নেই। জানতে পারি ছেলের প্রতিও তার কোনো আগ্রহ নেই। সে বলে বিগড়ানো সন্তান এনে সামাল দেবো সে সামর্থ্য আমার কই! সম্পর্ক ছিন্ন হলেও সন্তান প্রাক্তন স্বামী-স্ত্রী দুজনের ভেতর সাঁকো হয়ে থাকে অনেকের জীবনে। কিন্তু রোয়েনা ওপরে ওঠার সিঁড়ি খুঁজতে আমাকে তাড়িয়েছে শুরুতেই। আর সত্যিকথা আমিও থাকতে পারিনি। ছেলেকে বাগে রাখতে তার মূল্যবোধে তার মা ঘুণ ধরিয়েছে! রোয়েনা তার সন্তানের পরিচয়ের জন্যই হয়তো আমাকে বিয়ে করেছিল।

চিরকেলে ছাপোষা লেখকের মগজের ভেতর শিল্পী রোয়েনার কথার প্রতিধ্বনি উঠতে লাগল, ‘বল, বাবা থাকলে কী দিতো? সব নে যা চাস্। খেলনা-জামা-আইসক্রিম-চকোলেট?’ এরপর লেখক স্বগতোক্তি করেন, হ্যাঁ এরপর তো বাকি থাকে ওই নেশার দ্রব্যই!