বইমেলায় লোকসানে রেকর্ড

Printed Edition

আবুল কালাম

লোকসান হতাশার নজিরবিহীন রেকর্ড গড়ল এবারের বইমেলা। অনির্ধারিত সময়ে ১৮ দিনের মেলা। বিক্রিতে ধস এসব কারণে এবার বড় লোকসানে পড়েছেন বিক্রেতারা। ফলে আগামী ফেব্রুয়ারিতে রমজানে মেলা না করে একমাস এগিয়ে জানুয়ারিতে অনুষ্ঠানের কথা বলছেন প্রকাশকরা।

প্রকাশকদের সংগঠন বাংলাদেশ সৃজনশীল প্রকাশক সমিতি বলছে, বই মেলার এবারের চিত্র মেলার অতীত ইতিহাসকে টপকে নজিরবিহীন রেকর্ড সৃষ্টি করেছে। কারণ এবারের মতো বিগত সময়ে মেলায় লোকসান নিয়ে কোনো প্রকাশককে ঘরে ফিরতে হয়নি। অথচ লোকসান ঠেকাতে এবার স্টল ভাড়াও মওকুফ করা হয়েছিলো। কিন্তু ক্রেতার অভাবে প্রতিদিন প্রকাশকদের লোকসান গুনতে হয়েছে। সর্বশেষ মেলা শেষ হওয়ার দুই দিন আগে বৃষ্টি ক্ষতি আরো বাড়িয়ে দিয়েছে। সব মিলে এবারের মতো লোকসান আর হতাশার রেকর্ড বইমেলার ইতিহাসে আর কখানো হয়নি।

বই প্রকাশকদের সংগঠন বাংলাদেশ সৃজনশীল প্রকাশক সমিতির সাধারণ সম্পাদক ও অপর সংগঠন ‘প্রকাশক ঐক্য’-এর সমন্বয়ক গফুর হোসেন গতকাল নয়া দিগন্তকে জানান, এবার মেলা অতিতের সব রেকর্ড ভঙ্গ করে লোকসানে নজির স্থাপন করেছে। তার ভাষ্য, এবারের বইমেলার ব্যবসায়িক পরিস্থিতি ২০২১ সালের করোনাকালীন মেলার চেয়েও খারাপ। অংশগ্রহণকারী প্রায় ৯০ শতাংশ প্রকাশকের স্টল নির্মাণের প্রাথমিক খরচও ওঠেনি। এর মধ্যে প্রায় ৩০ শতাংশ প্রকাশকের পাঁচ হাজার টাকার বইও বিক্রি হয়নি। বিক্রি কমেছে ৮০ শতাংশ। এমন স্টলও ছিলো যেখানে সারা দিনে কোনো বিক্রি হয়নি।

তিনি বলেন, এবার একদিকে মেলা শুরু হয়েছে ফেব্রুয়ারির শেষে। তাও ছিলো মাত্র ১৮ দিন। এর মধ্যে প্রথম তিনদিন মেলার প্রস্তুতিতেই চলে যায়। সে হিসাবে এবার মেলা হয়েছে মাত্র ১৫ দিন। অন্য দিকে রমজান মাস। এতে মানুষ রোজা রেখে মেলায় আসেননি। আর ১৭ শতাংশ স্টল কোনো বই বিক্রি করতে পারেনি। ফলে সব মিলে এবারের পরিবেশটা মেলার জন্য সহায়ক ছিলো না। যার কারণে স্টল ভাড়া মওকুফ করলেও স্টলের ডেকোরেশন, প্রতিদিনের খরচ সব হিসাব করলে এবার রেকর্ড লোকসান দিয়েছেন প্রকাশকরা। ফলে আগামী বছরের মেলাও জানুয়ারিতে শুরুর চিন্তুা চলছে। কারণ ফেব্রুয়ারিতে রমজান। তাই জানুয়ারিতে শুরু করে ফেব্রুয়ারির প্রথম সপ্তাহে যাতে শেষ করা যায় তার প্রস্তুতি নেয়া হবে।

এ বিষয়ে বাংলা একাডেমির একজন কর্মকর্তা নয়া দিগন্তকে জানান, মেলা শুরুর বিষয়টি তাদের হাতে ছিলো না। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় থেকে যে নির্দেশ আসছে তাই তারা অনুসরণ করেছেন। আর এবার ক্রেতা কম থাকার বিষয়ে তিনি বলেন, রমজান মাসে মানুষ সারা দিন নিজেদের রুটিন কাজের পর বাসায় ফিরেন। ইফতার শেষে তারাবিহসহ নানান ব্যস্ততায় মেলায় আসার সুযোগ কম। ফলে তার প্রভাব বিক্রিতে পড়েছে। এতে হতাশ না হয়ে আগামীর জন্য প্রকাশকদের ঘুরে দাঁড়ানোর কথা বলেন তিনি। আর সামনে বছরে জানুয়ারিতে বইমেলার বিষয়ে তার ভাষ্য, এটা সরকার ও প্রকাশকদের বিষয়। তারা যে সিদ্ধান্ত নেবেন তাতে বাংলা একাডেমির আপত্তি থাকার কথা নয়।

বাংলা একাডেমির তথ্যমতে, ২০২৫ সালের অমর একুশে বইমেলায় মোট তিন হাজার ২৯৯টি নতুন বই প্রকাশিত হয়েছিল। এবারের বইমেলায় নতুন বই জমা পড়েছে মাত্র এক হাজার ৩৩৭টি, যা গত বছরের তুলনায় অনেক কম। আর রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অস্থিরতার কারণে ২০২৫ সালের বইমেলায় বিক্রি ২০২৪ সালের তুলনায় প্রায় ৬০ শতাংশ কমেছিল। আর চলমান ২০২৬ সালের মেলায় বিক্রি কমেছে ২০২৫ সালের তুলনায় প্রায় ৮০ শতাংশ।

এ দিকে এবারের মেলাকে ব্যবসায়িক দিক থেকে শোচনীয় দাবি করে প্রকাশকদের আরেক সংগঠন প্রকাশক ঐক্য বলেছে, ‘প্রায় পাঠকশূন্য এ মেলায় অংশ নিয়ে প্রকাশকরা ব্যাপক আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছেন। তাই চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত প্রকাশকদের সহায়তায় সরকারিভাবে প্রতিটি অংশগ্রহণকারী প্রকাশকের অন্তত একটি করে মানসম্পন্ন বইয়ের তিন শ’ থেকে পাঁচ শ’ কপি ক্রয়ের জরুরি ব্যবস্থা গ্রহণে দাবি জানিয়েছেন তারা। তাদের ভাষ্য, মেলায় মূলধারার প্রকাশকদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করে এবং এবারের মেলার সার্বিক মূল্যায়ন করে আগামী বছরের বইমেলার তারিখ এ মেলা শেষের পর পরই অংশীজনদের সাথে আলোচনা সাপেক্ষে এখনই নির্ধারণ প্রয়োজন।

নানা প্রতিবন্ধকতা নিয়ে অনেকটা জোর করেই এবার মেলা শুরু করে বাংলা একাডেমি। গত ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় নির্বাচন ও গণভোট থাকায় অন্তর্বর্তী সরকার যথা সময়ে বইমেলা শুরু না করে অসময়ে বইমেলা শুরুর উদ্যোগ নেয়। বাংলা একাডেমি প্রকাশকদের অসন্তোষের মুখে ২০ ফেব্রুয়ারি থেকে বইমেলা শুরুর ঘোষণা দেয়। তবে প্রকাশকরা এ সময় বইমেলা করার বিপক্ষে মত জানান। তাদের দাবি ছিল, ঈদের পর বইমেলা করতে হবে। বাংলা একাডেমি তা মানেনি। শেষে ১৮ ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যায় সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের সাথে বৈঠকের পর বাংলা একাডেমি বৈঠকের সিদ্ধান্ত জানায়। বৈঠকের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ২৫ ফেব্রুয়ারি থেকে আমার একুশে বইমেলা শুরুর কথা বলা হলেও ২৬ ফেব্রুয়ারি মেলা শুরু হয়।