অব্যাহতভাবে দাম বাড়ছে বিপাকে সাধারণ মানুষ
চালের বাজারে সিন্ডিকেট সক্রিয়
Printed Edition
দেশে চালের বাজারে ফের অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। গত কয়েক সপ্তাহে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় সব ধরনের চালের দাম দ্রুতগতিতে বাড়ছে। বাজারে ক্রেতাদের চাপ, সরবরাহ কমে যাওয়া এবং মিলারদের মজুদদারি এই তিনটি প্রধান কারণকে সামনে এনে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন দেশের ধানের উৎপাদন পর্যাপ্ত হলেও অব্্যাহতভাবে বাড়ছে চালের দাম। চালের বাজার নিয়ন্ত্রণে সিন্ডিকেট সক্রিয় ভূমিকা পালন করছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন গত বছর সরকার চাল আমদানির ওপর শূন্য শুল্ক সুবিধা দিয়েছিল। এর ফলে বেসরকারিভাবে প্রায় ৭ লাখ টন চাল আমদানি হয়। কিন্তু চলতি বছরের মে মাসের শেষ দিকে ওই সুবিধা তুলে নেয়ার পর থেকে আবার ৬২.৫ শতাংশ শুল্ক আরোপ করা হয়েছে। ফলে চাল আমদানি কার্যত বন্ধ হয়ে গেছে। এই সুযোগে দেশের চাল সিন্ডিকেট সক্রিয় হয়ে উঠেছে। একজন শীর্ষস্থানীয় আমদানিকারক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, দেশে খুব বেশি চাল আমদনি হয় না তবে দাম নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা পালন করে। শুল্ক বৃদ্ধির ফলে চাল আমদানিতে উৎসাহ হারিয়ে ফেলেছেন প্রায় সব বেসরকারি আমদানিকারক। এতে সুযোগ নিচ্ছে চাল সিন্ডিকেটের ব্যবসায়ীরা।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাজারে সরকারি চাল সরবরাহ কম থাকার সুযোগে মিলাররা এখন কার্যত বাজার নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়েছে। খুলনা, নাটোর, দিনাজপুর, ময়মনসিংহ এবং ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বড় মিলগুলোর একটি অংশ এখন বিপুল পরিমাণ চাল গুদামজাত করেছে বলে একাধিক ব্যবসায়িক সূত্রে জানা গেছে। একজন আড়তদার বলেন, যেখানে এক মাস আগেও মিলগেট দামে চাল পাওয়া যেত কেজিতে ৫০-৫২ টাকায়, সেখানে এখন ৫৮-৬০ টাকার নিচে বিক্রি হচ্ছে না। এমন অবস্থায় বাজারে স্বাভাবিক সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে। খুচরা বাজারে মোটা চাল বিক্রি হচ্ছে ৬০ টাকার ওপরে, মাঝারি ৬৮ টাকা আর চিকন ও আতপ চাল ৯৫-১০৫ টাকায়। শুধু শহর নয়, এমন দাম গ্রামাঞ্চলেও ছড়িয়ে পড়েছে।
বাজারে দাম বাড়লেও কৃষকরা এই দাম বৃদ্ধির কোনো সুফল পাচ্ছেন না। কৃষি অর্থনীতিবিদ ড. মাহমুদ হাসান নয়া দিগন্তকে বলেন, চাল যখন ধান হিসেবে কৃষকের গুদামে ছিল, তখন তারা কেজিপ্রতি গড়ে ৩২-৩৫ টাকায় বিক্রি করেছে। এখন সেই চাল কেজিতে বিক্রি হচ্ছে দ্বিগুণ দামে। কিন্তু লাভ করছে কেবল মধ্যস্বত্বভোগীরা। চলতি মৌসুমে বোরো ধানের রেকর্ড ফলন হয়েছে। কৃষি মন্ত্রণালয় বলছে, প্রায় ২ কোটি ৬ লাখ টন চাল উৎপাদিত হয়েছে, যা গত বছরের চেয়ে ৬ শতাংশ বেশি। কিন্তু মিলারদের অনৈতিক মজুদ, আমদানির অনুপস্থিতি ও সরবরাহ ব্যবস্থায় জটিলতা এই উৎপাদনের ইতিবাচক প্রভাব বাজারে পড়তে দিচ্ছে না।
খাদ্য অধিদফতর চলতি বোরো মৌসুমে ১৭ লাখ ৫০ হাজার টন চাল সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। এর মধ্যে এখন পর্যন্ত প্রায় ১১ লাখ টন সংগ্রহ করা হয়েছে। কিন্তু বিশ্লেষকদের মতে, এই চাল মূলত সরকারি গুদামেই সংরক্ষিত থাকে এবং সরাসরি বাজারে আসে না। খাদ্য অধিদফতরের এক কর্মকর্তা বলেন, সরকারি মজুদ এখন ১৪ লাখ টনের মতো। এটা জাতীয় নিরাপত্তা ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের জন্য সংরক্ষিত।
এদিকে টিসিবির মাধ্যমে স্বল্পমূল্যে চাল বিক্রির উদ্যোগ থাকলেও তা খুব সীমিত পরিসরে কার্যকর। রাজধানীতে প্রতিদিন ৫০ থেকে ৭০টি ট্রাকে চাল বিক্রি হয়, যা চাহিদার তুলনায় সামান্য। চালের বাজার নিয়ন্ত্রণে মিল মালিকদের ওপর নজরদারি ও অভিযান জোরদার করা দরকার বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দাম বৃদ্ধি অব্যাহত থাকার কারণে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েছেন শহরের নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো।
মোহাম্মদপুরের গৃহবধূ রুবিনা আক্তার নয়া দিগন্তকে বলেন, মাসে ৩০ কেজি চাল লাগে তার সংসারে। আগে যেখানে ১ হাজার ৮০০ টাকায় চাল কিনতেন, এখন একই পরিমাণ চাল কিনতে খরচ হচ্ছে ২ হাজার ৮০০ টাকা। দুধ, ডিম, তেল সবগুলোর দাম বেশি। চালের দাম যদি আরো বাড়ে, তাহলে না খেয়ে থাকা লাগবে।
একই অভিযোগ মধ্যবিত্ত চাকরিজীবীদেরও। গার্মেন্ট কর্মকর্তা সাইফুল ইসলাম নয়া দিগন্তকে বলেন, যেখানে বেতন বাড়ে ৫-১০ শতাংশ, সেখানে চালের দাম এক মাসেই বেড়ে যায় ২০-৩০ শতাংশ। আমরা যাব কোথায়।
জুলাই-আগস্ট মাস সাধারণত বন্যা, অতিবৃষ্টি বা নদীভাঙনের সময়। এই সময় ফসলের মাঠে ক্ষয়ক্ষতি হয় এবং খাদ্য সঙ্কটের আশঙ্কা থাকে। যদি এখন চালের দাম নিয়ন্ত্রণে না আনা যায়, তাহলে আগস্ট-সেপ্টেম্বরে তা আরো বেড়ে যেতে পারে। এমনকি সামাজিক অস্থিরতা তৈরি হওয়ার আশঙ্কাও উড়িয়ে দিচ্ছেন না অনেকে। দেশের খাদ্য নিরাপত্তা নিয়ে গর্ব করলেও, নীতিগত কিছু সিদ্ধান্ত ও বাজার ব্যবস্থাপনার দুর্বলতার কারণে সাধারণ মানুষ প্রতিনিয়ত ভোগান্তিতে পড়ছে।
চালের মতো মৌলিক খাদ্যপণ্যের দামে যদি স্থিতিশীলতা না থাকে, তাহলে সামগ্রিক মূল্যস্ফীতির ওপরও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। এখন সময় কার্যকর ও দ্রুত সিদ্ধান্ত নেয়ার। বাজারের ওপর সরকারের প্রত্যক্ষ নজরদারি, আমদানি শুল্কে সাময়িক ছাড় এবং মজুদদারদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা এই তিনটি উদ্যোগ একসাথে বাস্তবায়ন করলে তবেই চালের বাজারে স্বস্তি ফিরবে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।