অবরোধ ভেঙে কিউবায় রুশ তেলবাহী জাহাজ
Printed Edition
দ্য নিউইয়র্ক টাইমস
দীর্ঘ দিনের মার্কিন অর্থনৈতিক ও জ্বালানি অবরোধে বিপর্যস্ত কিউবার জন্য সাময়িক স্বস্তি নিয়ে এসেছে একটি রুশ তেলবাহী জাহাজ। যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর নজরদারি ও সমুদ্রে কোস্টগার্ডের উপস্থিতি থাকা সত্ত্বেও জাহাজটিকে বন্দরে ভিড়তে বাধা দেয়া হয়নি। এমন সময়ে এই সিদ্ধান্ত নেয়া হলো, যখন দেশটির অর্থনীতি ও বিদ্যুৎব্যবস্থা প্রায় ভেঙে পড়ার মুখে।
গতকাল সোমবার রাতের মধ্যে প্রায় সাত লাখ ৩০ হাজার ব্যারেল অপরিশোধিত তেল নিয়ে রাশিয়ার জাহাজ ‘আনাতোলি কোলোডকিন’ কিউবার মাতানজাস বন্দরে পৌঁছানোর কথা। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে যুক্তরাষ্ট্র কিউবার ওপর কার্যত একটি ‘জ্বালানি অবরোধ’ আরোপ করে, যার লক্ষ্য ছিল কিউবা সরকারের ওপর রাজনৈতিক চাপ বৃদ্ধি করা।
তবে পরিস্থিতি ক্রমেই মানবিক সঙ্কটে রূপ নেয়ায় এবং রাশিয়ার সাথে সরাসরি সামরিক উত্তেজনার ঝুঁকি এড়াতে শেষ মুহূর্তে মার্কিন কোস্টগার্ডকে জাহাজটি আটক না করার নির্দেশ দেয়া হয়। অনেকেই এই সিদ্ধান্তকে ওয়াশিংটনের নীতিতে সাময়িক নমনীয়তা হিসেবে দেখছেন। রাশিয়ার রাষ্ট্রায়ত্ত শিপিং কোম্পানির মালিকানাধীন এই ট্যাংকারটি ৯ মার্চ বাল্টিক সাগরের প্রিমোরস্ক বন্দর থেকে যাত্রা শুরু করে। যদিও ২০২৪ সাল থেকেই জাহাজটি মার্কিন নিষেধাজ্ঞার আওতায় ছিল, তবুও এটি আটলান্টিক মহাসাগর পাড়ি দিয়ে কিউবার নৌসীমার কাছাকাছি পৌঁছাতে সক্ষম হয়। রোববার এয়ার ফোর্স ওয়ানে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে ট্রাম্প বলেন, কোনো দেশের টিকে থাকার জন্য যদি একটি জাহাজ তেল প্রয়োজন হয়, তবে তাতে যুক্তরাষ্ট্রের আপত্তি নেই। তবে একই সঙ্গে তিনি কিউবা সরকারের কঠোর সমালোচনা করে মন্তব্য করেন, একটি মাত্র তেলের চালান দেশটির সামগ্রিক সঙ্কট দূর করতে পারবে না।
গত কয়েক মাস ধরে জ্বালানি সঙ্কটের কারণে কিউবায় প্রতিদিন লোডশেডিং, পরিবহন বিপর্যয়, গ্যাসের তীব্র ঘাটতি এবং স্বাস্থ্যসেবার অবনতি দেখা দিয়েছে। কিছু এলাকায় ছোট আকারের বিক্ষোভও শুরু হয়েছে বলে জানা গেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই তেলের চালান কিউবাকে মাত্র কয়েক সপ্তাহের জন্য স্বস্তি দিতে পারে। অপরিশোধিত তেল থেকে ডিজেল, পেট্রল ও জেট ফুয়েল উৎপাদন করা হবে, যা বিদ্যুৎ উৎপাদন, কৃষিকাজ এবং পরিবহন ব্যবস্থার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে তেল পরিশোধন ও দেশজুড়ে বিতরণ করতে অন্তত চার সপ্তাহ সময় লাগতে পারে। এ দিকে মেক্সিকোয় অবস্থিত রুশ দূতাবাস কিউবার ওপর মার্কিন অবরোধকে ‘অবৈধ’ আখ্যা দিয়ে দেশটির প্রতি সমর্থন জানিয়েছে। যদিও এই এক জাহাজ তেল কিউবার দীর্ঘমেয়াদি সঙ্কটের স্থায়ী সমাধান না হলেও তাৎক্ষণিক অর্থনৈতিক ধস থেকে আপাতত কিছুটা অর্থনৈতিক ধস থেকে মুক্তি দেবে।
কিউবার উদ্দেশে যাওয়া তেলের চালান আটকানোর পথ থেকে সরে দাঁড়ানোর ইঙ্গিত দিয়ে ট্রাম্প বলেছেন, কোনো দেশ কমিউনিস্ট পার্টিশাসিত দ্বীপটিতে অপরিশোধিত তেল পাঠাতে চাইলে তার কোনো ‘সমস্যা নেই’।
রাশিয়ার একটি তেলবাহী ট্যাংকার কিউবার এক বন্দরের কাছে পৌঁছানোর পর রোববার মার্কিন প্রেসিডেন্ট এ কথা বলেন।
এ বছরের জানুয়ারিতে ভেনিজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে অপহরণ করার পর যুক্তরাষ্ট্র কিউবায় ভেনিজুয়েলার তেল রফতানি বন্ধ করে দেয়। অন্য কোনো দেশ হাভানায় অপরিশোধিত তেল পাঠাতে চাইলে তাদের ওপরও শাস্তিমূলক শুল্ক বসানোর হুমকি দেন তিনি। তার এ হুমকির পর মেক্সিকো কিউবায় তেল পাঠানো বন্ধ করে দেয়। কিউবার তেলের বেশির ভাগই ভেনিজুয়েলা ও মেক্সিকো থেকে আসত।
ট্রাম্প প্রশাসনের অবরোধের কারণে তিন মাসে একটি ট্যাংকারও কিউবায় ঢুকতে পারেনি বলে জানিয়েছেন দ্বীপদেশটির প্রেসিডেন্ট মিগেল দিয়াস-কানেল। এর ফলে দেশটির জ্বালানি সঙ্কট তীব্র আকার ধারণ করে। কঠোর পেট্রল রেশনিংয়ের পাশাপাশি এক কোটি জনসংখ্যার দেশটি নিয়মিত দীর্ঘ লোডশেডিংয়ের কবলে পড়তে থাকে।
চরম এ বিদ্যুৎ সঙ্কটের কারণে কিউবায় ক্যান্সার রোগী বিশেষ করে শিশু রোগীদের মৃত্যুঝুঁকি বেড়ে গেছে বলে জানিয়েছেন দেশটির স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা। রোববার এয়ার ফোর্স ওয়ানে সাংবাদিকদের সাথে কথোপকথনে ট্রাম্প কিউবার জনগণের জ্বালানি প্রয়োজনীয়তায় সহানুভূতি ব্যক্ত করেন এবং বলেন, হাভানার কমিউনিস্ট সরকারকে কে কী সহায়তা করল তা নিয়ে তিনি উদ্বিগ্ন নন; কারণ, তার ধারণা ওই সরকার শিগগিরই পড়ে যাবে।
‘যদি কোনো দেশ এখন কিউবায় কিছু তেল পাঠাতে চায়, আমার তাতে কোনো সমস্যা নেই- এটা রাশিয়াই হোক বা অন্য যে কেউ।
‘কিউবা শেষ। তাদের শাসনব্যবস্থা বাজে। তাদের নেতারা খুবই খারাপ ও দুর্নীতিগ্রস্ত। এখন তারা এক নৌকা তেল পেল কি পেল না, তাতে কিছু আসে যায় না। আমি ওই তেল ঢুকতে দেবো, সেটা রাশিয়াই হোক বা অন্য কেউ, কারণ লোকজনের তাপ, ঠাণ্ডা করার ব্যবস্থা ও প্রয়োজনীয় অনেক কিছু দরকার,’ বলেছেন তিনি।