দর্শনা সীমান্তে গোল্ড করিডোর : পাচার হচ্ছে স্বর্ণ, আসছে মাদক

Printed Edition
bangla-1
দর্শনা সীমান্তে গোল্ড করিডোর : পাচার হচ্ছে স্বর্ণ, আসছে মাদক

দামুড়হুদা (চুয়াডাঙ্গা) সংবাদদাতা

চুয়াডাঙ্গার দামুড়হুদা উপজেলার দর্শনা সীমান্ত ঘিরে গড়ে উঠেছে শক্তিশালী স্বর্ণ চোরাচালান সিন্ডিকেট। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ধারাবাহিক অভিযানে কোটি টাকার স্বর্ণ উদ্ধার ও পাচারকারী আটক হলেও থামছে না এ অবৈধ বাণিজ্য। বরং সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, দর্শনা সীমান্ত এখন চোরাচালানকারীদের কাছে এক ধরনের ‘নিরাপদ করিডোর’- যেখানে এক দিকে পাচার হচ্ছে স্বর্ণ, অন্য দিকে ঢুকছে মাদকদ্রব্য। সাম্প্রতিক দুইটি বড় অভিযানে বিষয়টি আবারও সামনে এসেছে। গত ১২ এপ্রিল সন্ধ্যায় দর্শনার বারাদী বিওপি এলাকায় অভিযান চালিয়ে ৪৫২ গ্রাম ওজনের চারটি স্বর্ণের বারসহ সমর হালদার (২৭) নামে এক পাচারকারীকে আটক করে বিজিবি। উদ্ধারকৃত স্বর্ণের আনুমানিক মূল্য প্রায় ৯৬ লাখ টাকা। এর মাত্র এক দিন পর, ১৩ এপ্রিল ভোরে দর্শনা আন্তর্জাতিক রেলস্টেশন এলাকা থেকে আলমগীর খান (৫০) নামে আরেক পাচারকারীকে আটক করা হয়। তার কাছ থেকে উদ্ধার করা হয় ১০টি স্বর্ণের বার, যার মোট ওজন এক কেজি ১৬৬ গ্রাম এবং বাজার মূল্য প্রায় দুই কোটি ৪৭ লাখ টাকা। বিজিবি জানায়, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে এসব অভিযান পরিচালিত হয়েছে।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, দর্শনার মদনা-পারকৃষ্ণপুর ইউনিয়নের নাস্তিপুর, ছয়ঘড়িয়া, কামারপাড়া ও বারাদী এলাকা বর্তমানে স্বর্ণ পাচারের অন্যতম সক্রিয় রুটে পরিণত হয়েছে। এসব পথ ব্যবহার করে নিয়মিত স্বর্ণ ভারতে পাচার করা হচ্ছে, আর নিয়ে আসা হচ্ছে মাদক।

এই রুটকে কেন্দ্র করে কয়েক মাস আগে ঘটে যাওয়া একটি ঘটনা এখনো আলোচনায় রয়েছে। প্রায় দুই কেজি স্বর্ণের একটি চালান ‘গায়েব’ হওয়াকে কেন্দ্র করে স্বর্ণ বহনকারী শ্রমিক রায়হান মিয়া (২৮) অপহরণের শিকার হয়েছিলেন। রায়হানের দাবি, পাঁচজন অজ্ঞাত ব্যক্তি তাকে হাতকড়া পরিয়ে তুলে নিয়ে যায় এবং স্বর্ণ ছিনিয়ে নেয়। পরে তাকে মারধর করে। তবে পুলিশ বলছে, স্বর্ণ আত্মসাতের অভিযোগকে কেন্দ্র করে চোরাচালান চক্রের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব থেকেই এ ঘটনা ঘটতে পারে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘ দিন ধরে কয়েকজন প্রভাবশালী ব্যক্তি সীমান্তে স্বর্ণ চোরাচালান নিয়ন্ত্রণ করে আসছেন। তারা নতুন শ্রমিকদের দিয়ে ঝুঁকিপূর্ণ পরিবহন করান এবং কোনো চালান গায়েব হলে দায় চাপানো হয় ওই শ্রমিকদের ওপরই। একই সাথে ‘হ্যান্ডকাপধারী’ অপহরণকারী দলের পরিচয় নিয়েও তৈরি হয়েছে রহস্য। তারা কি কোনো বাহিনীর সদস্য, নাকি ছদ্মবেশী চক্র, তা এখনো স্পষ্ট নয়।

দর্শনা থানার তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে একাধিক ঘটনায় বিপুল পরিমাণ স্বর্ণ ও রুপা উদ্ধার হয়েছে। ৮ আগস্ট ঈশ্বরচন্দ্রপুর এলাকা থেকে দুই কেজি ৪৫১ গ্রাম স্বর্ণ, ২৬ আগস্ট ছয়ঘড়িয়া থেকে এক কেজি ১৬৫ গ্রাম স্বর্ণসহ চারজন, ৩০ সেপ্টেম্বর কামারপাড়া থেকে ৩৫০ গ্রাম স্বর্ণসহ পাঁচজন এবং ২৬ জুলাই আজিমপুর এলাকা থেকে ১০ কেজির বেশি রুপা উদ্ধার করা হয়। তবে এত অভিযানের পরও পাচার কমেনি, বরং চোরা কারবারিরা আরো সংগঠিত হয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

এ দিকে সীমান্ত এলাকায় একটি শক্তিশালী অর্থচক্র সক্রিয় রয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। তারা স্বর্ণ, মাদক ও হুন্ডি লেনদেন নিয়ন্ত্রণ করে। স্থানীয়দের দাবি, এই চক্রের মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ অর্থ বিদেশে পাচার হচ্ছে এবং কিছু ব্যক্তি অল্প সময়েই অস্বাভাবিক সম্পদের মালিক হচ্ছেন। যদিও অভিযুক্তরা এসব অভিযোগ অস্বীকার করছেন।

স্থানীয়দের মধ্যে আরো একটি ভয়াবহ গুঞ্জন রয়েছে। যারা চোরাচালান সংক্রান্ত কোনো তথ্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে সরবরাহ করে, তারা পরে ঝুঁকিতে পড়ে। যদিও এসব অভিযোগের কোনো আনুষ্ঠানিক প্রমাণ পাওয়া যায়নি, তবে এতে এলাকায় এক ধরনের নীরব ভীতি তৈরি হয়েছে, যা সিন্ডিকেটকে আরো শক্তিশালী করে তুলছে।

দর্শনা থানার এক কর্মকর্তা জানান, স্বর্ণ পাচার চক্র সক্রিয় রয়েছে- এ কথা ঠিক। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে লিখিত কোনো অভিযোগ না থাকায় ব্যবস্থা নিতে জটিলতা তৈরি হয়।

এ বিষয়ে দর্শনা থানার ওসি মেহেদী হাসান বলেন, ‘মাদকসহ যেকোনো অপরাধে আমরা জিরো টলারেন্স নীতিতে কাজ করে যাচ্ছি। স্বর্ণ চোরাচালান একটি বড় চক্র- এটি প্রতিরোধে আমাদের কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে।’

চুয়াডাঙ্গা বিজিবি-৬ ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল নাজমুল হাসান বলেন, ‘সীমান্ত এলাকায় সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থায় টহল জোরদার করা হয়েছে। স্বর্ণ চোরাচালানসহ সব ধরনের অপরাধ প্রতিরোধে বিজিবি কঠোর অবস্থানে রয়েছে।’

সব মিলিয়ে দর্শনা সীমান্ত এখন শুধু একটি ভৌগোলিক সীমানা নয়, বরং ঝুঁকিপূর্ণ এক অর্থনৈতিক করিডোরে পরিণত হয়েছে। প্রতি দিন কোটি টাকার স্বর্ণ পাচারের পাশাপাশি এর ছায়ায় জন্ম নিচ্ছে সহিংসতা, অপহরণ ও আতঙ্ক। স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, সঠিক ও নিরপেক্ষ তদন্ত এবং সমন্বিত কঠোর পদক্ষেপ ছাড়া এই শক্তিশালী সিন্ডিকেট ভাঙা সম্ভব নয়।