বেলাবতে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে খাতা না দেখেই পরীক্ষার ফল
শিক্ষকদের দায়িত্বে অবহেলা এবং অভ্যন্তরীণ কোন্দলে এসব ঘটছে বলে অভিযোগ
Printed Edition
বেলাব (নরসিংদী) সংবাদদাতা
নরসিংদীর বেলাব উপজেলার আমলাব ইউনিয়নের আব্দুল্লাহনগর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে খাতা মূল্যায়ন না করেই ফলাফল শিটে নম্বর বসানোর অভিযোগ উঠেছে শিক্ষকদের বিরুদ্ধে। এছাড়া প্রাইভেট পড়ার কারণে পছন্দের শিক্ষার্থীদের বেশি নাম্বার দেয়া, পরিবারের সদস্যদের দিয়ে পরীক্ষার খাতা মূল্যায়ন করানোর মতো গুরুতর অভিযোগ তুলেছেন অভিভাবকরা। শিক্ষকদের দায়িত্বে অবহেলা এবং অভ্যন্তরীণ কোন্দলে এসব ঘটনা ঘটছে বলে জানিয়েছেন ক্ষুব্ধ অভিভাবকরা। এ ঘটনায় এলাকায় চাঞ্চল্য সৃষ্টি হলে দুই শিক্ষককে ডেপুটেশনে পাঠানো হয়েছে। এছাড়া এসব অনিয়ম তদন্তে সম্প্রতি তদন্ত কমিটি করেছে উপজেলা শিক্ষা অফিস।
জানা যায়, বিদ্যালয়ের সাবেক প্রধান শিক্ষক আতাউর রহমানের মৃত্যুর পর থেকেই প্রশাসনিক অস্থিরতা শুরু হয়। ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব নিয়ে সহকারী শিক্ষক শরিফা আক্তার ও সুমাইয়া বেগমের মধ্যে দ্বন্দ্ব সৃষ্টি হয়। এই দুই শিক্ষকের পাল্টাপাল্টি দায়িত্ব গ্রহণ এবং গ্রুপিংয়ের কারণে বিদ্যালয়ের শিক্ষার পরিবেশ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সম্প্রতি এক শিক্ষিকার টেবিলের ওপর পা তুলে ঘুমানোর ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে এলাকাবাসীর মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে অভিযোগগুলো সামনে আসতে শুরু করে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ২০২৪ সালের নভেম্বর মাসে অনুষ্ঠিত বার্ষিক পরীক্ষা এবং ২০২৫ সালের প্রথম সাময়িক ও বার্ষিক পরীক্ষায় একাধিক বিষয়ের খাতা মূল্যায়নই করা হয়নি। অথচ ফলাফল শিটে শিক্ষার্থীদের নম্বর দেয়া হয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, চতুর্থ শ্রেণীর ইংরেজি, পঞ্চম শ্রেণীর বাংলা ও ইসলাম শিক্ষা এবং ২০২৫ সালের পরীক্ষায় পঞ্চম শ্রেণীর বাংলা ও বিজ্ঞান, চতুর্থ শ্রেণীর গণিত ও তৃতীয় শ্রেণীর বিজ্ঞান খাতা না দেখেই ফলাফল প্রকাশ করা হয়েছে। এমনকি নৈর্ব্যক্তিক প্রশ্নগুলোও মূল্যায়ন করা হয়নি।
২০২৪ সালে প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণীর খাতা মূল্যায়ন ছাড়াই মৌখিকভাবে ফলাফল ঘোষণা করার অভিযোগও উঠেছে। অনেক শিক্ষক নিজেদের কাজ লাঘব করতে শিক্ষার্থীদের বা তাদের পরিবারের সদস্যদের দিয়ে খাতা দেখিয়েছেন এমন অভিযোগ পাওয়া গেছে। এছাড়া পছন্দের শিক্ষার্থী ও যারা শিক্ষকদের কাছে প্রাইভেট পড়ে, তাদের বাড়তি নম্বর দেয়ার অভিযোগ তুলেছেন ক্ষুব্ধ অভিভাবকরা। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক অভিভাবক জানান, তদারকির অভাবেই শিক্ষকরা দিনের পর দিন এমন দায়িত্বজ্ঞানহীন কাজ করার সাহস পাচ্ছেন।
বর্তমানে প্রশাসনিক বিশৃঙ্খলা সামাল দিতে উপজেলা শিক্ষা অফিস শরিফা আক্তার ও সুমাইয়া বেগমকে অন্য স্কুলে ডেপুটেশনে পাঠিয়েছে। এতে বিদ্যালয়ে এখন শিক্ষকের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে মাত্র তিনজনে, যেখানে ১৪১ জন শিক্ষার্থীর জন্য অন্তত ছয়জন শিক্ষক থাকা প্রয়োজন। এই তীব্র শিক্ষক সঙ্কটের ফলে পাঠদান কার্যক্রম খুঁড়িয়ে চলছে।
ডেপুটেশনে যাওয়ার আগে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক শরিফা আক্তার বলেন, সহকর্মীদের অসহযোগিতার কারণে আমি যথাযথভাবে দায়িত্ব পালন করতে পারিনি। খাতা মূল্যায়ন না করে ফলাফল দেয়ার বিষয়টি আমি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছি।
উপজেলা সহকারী প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা কবির হোসেন জানান, অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের কারণে দুই শিক্ষককে বদলি করা হয়েছে। পুরো বিষয়টি তদন্ত করতে সহকারী শিক্ষা কর্মকর্তা মোহাম্মদ জামাল উদ্দীন ও ইউসুফকে নিয়ে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা জুলেখা শারমিন বলেন, বিষয়টি আমরা অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে দেখছি। এরই মধ্যে তদন্ত কমিটি গঠিত হয়েছে এবং আগামী ৯ এপ্রিলের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দেয়ার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কঠোর প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেয়া হবে।