ট্রাইব্যুনালে সাীর জবানবন্দী

জিয়াউল আহসানের নির্দেশেই আমার ভাতিজাকে হত্যা করা হয়েছে

- জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের বিচার মানবতাবিরোধী অপরাধ

Printed Edition

নিজস্ব প্রতিবেদক

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে মেজর জেনারেল (অব:) জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে চাঞ্চল্যকর স্যা দিয়েছেন হাবিবুর রহমান মল্লিক। গতকাল বৃহস্পতিবার আদালতে আসামিপরে জেরার মুখে তিনি সরাসরি অভিযোগ করেন যে, গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে তিনি নিশ্চিত হয়েছেন তার ভাতিজা নজরুল ইসলামকে হত্যার মূল পরিকল্পনাকারী ছিলেন জিয়াউল আহসান।

বিচারপতি মো: শফিউল আলম মাহমুদের নেতৃত্বাধীন দুই সদস্যের বিচারিক প্যানেলে এদিন আওয়ামী লীগ আমলের গুম ও মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় চতুর্থ সাী হিসেবে তিনি তার বক্তব্য তুলে ধরেন।

জেরার একপর্যায়ে হাবিবুর রহমান মল্লিক আদালতকে জানান, তার ভাতিজা নজরুল হত্যাকাণ্ডের পর থেকেই তাদের বাড়িতে গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যদের আনাগোনা ছিল। তিনি বলেন, ‘গোয়েন্দাদের মাধ্যমেই জানতে পেরেছি আমার ভাতিজা নজরুল ইসলামকে হত্যা করেছেন জিয়াউল আহসান। একদিন তারা আমাদের সোজাসুজি জানিয়েছিলেন যে, নজরুলকে হত্যা করেছে র‌্যাবের তৎকালীন গোয়েন্দা প্রধান জিয়াউল আহসান।’

গত ২২ এপ্রিল জবানবন্দী শেষ হওয়ার পর এদিন দ্বিতীয় দিনের মতো সাীকে জেরা করেন জিয়াউলের আইনজীবী আমিনুল গণি টিটো। আসামিপ এই স্যাকে ‘অসত্য’ এবং ‘তদন্ত কর্মকর্তার শেখানো বুলি’ বলে অভিহিত করে। আইনজীবী টিটো দাবি করেন, সাী আগে তার জবানবন্দীতে এই নাম উল্লেখ না করলেও এখন উদ্দেশ্যমূলকভাবে জিয়াউল আহসানের নাম বলছেন।

জবাবে সাী তার অবস্থানে অনড় থেকে জানান, পারিবারিক নিরাপত্তার খাতিরে এবং গোয়েন্দাদের কাছ থেকে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতেই তিনি আজ সত্য প্রকাশ করছেন। প্রসিকিউশনের পে শুনানিতে ছিলেন প্রসিকিউটর মিজানুল ইসলাম, শাইখ মাহদী ও তাসমিরুল ইসলামসহ আরো কয়েকজন।

শুনানির শেষ দিকে ট্রাইব্যুনাল আগামী ৬ মে পরবর্তী স্যাগ্রহণের দিন ধার্য করলে এজলাসে তীব্র উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। জিয়াউলের বোন ও আইনজীবী নাজনীন নাহার এই তারিখের বিরুদ্ধে কঠোর আপত্তি জানিয়ে মেজাজ হারিয়ে ফেলেন।

তিনি ট্রাইব্যুনালকে উদ্দেশ করে বলেন, ‘অন্যান্য মামলায় এক সাীর পর ১৫ দিন বা এক মাস সময় দেয়া হয়, কিন্তু আমার মামলার েেত্র কেন সময় দেয়া হচ্ছে না? আমরা সবই বুঝি, এসব ঠিক না। তারিখ পরিবর্তন করে অন্য তারিখ দিন।’ এর প্রত্যুত্তরে প্রসিকিউটর উদয় তাসমির বলেন, ‘মাই লর্ড, সাী আনতে দেরি হলে উনি বলেন কেন সাী আনা হচ্ছে না। আবার নিয়মিত সাী হাজির করলে বলেন কেন এত সাী আনা হচ্ছে। আমরা কোন দিকে যাবো?’ উভয়পরে এই উত্তপ্ত বাক্য বিনিময়ের মধ্যেই ট্রাইব্যুনাল তার সিদ্ধান্ত অপরিবর্তিত রেখে এজলাস ত্যাগ করেন।

সাবেক এই সেনা অফিসারের বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে সংঘটিত শতাধিক গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের অভিযোগ রয়েছে। এই নির্দিষ্ট মামলায় তিনিই একমাত্র আসামি এবং বর্তমানে বিচারিক হেফাজতে রয়েছেন।

শামীম ওসমানের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের আদেশ ৫ মে

এ দিকে জুলাই আন্দোলনে নারায়ণগঞ্জে ১০ হত্যায় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় সাবেক সংসদ সদস্য শামীম ওসমানসহ ১২ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের আদেশের জন্য ৫ মে দিন ঠিক করা হয়েছে। উভয় পরে শুনানি শেষে গতকাল বৃহস্পতিবার বিচারপতি মো: শফিউল আলম মাহমুদ নেতৃত্বাধীন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এর দুই সদস্যের বেঞ্চ এ দিন ঠিক করে দেন। বেঞ্চের অপর সদস্য হলেন- বিচারক মো: মোহিতুল হক এনাম চৌধুরী।

সব আসামি পলাতক থাকায় ট্রাইব্যুনাল থেকে তাদের পে আইনি লড়াইয়ের জন্য রাষ্ট্র আইনজীবী নিয়োগ দিয়েছে। এদিন আসামিদের অব্যাহতির আবেদনের ওপর শুনানি করেন আইনজীবী মো: আলী হায়দার, শেখ মুস্তাভী হাসান ও আমির হোসেন। শুনানিতে আসামির আইনজীবীরা বলেন, কেবল আওয়ামী লীগের রাজনীতির সাথে যুক্ত থাকার কারণেই শামীম ওসমানসহ ১২ জনকে এ মামলায় জড়ানো হয়েছে। প্রসিকিউশন তাদের বিরুদ্ধে প্রাথমিক কোনো অভিযোগ প্রমাণ করতে পারেনি, তাই তাদের অব্যাহতি দেয়া হোক। রাষ্ট্র নিযুক্ত আইনজীবীর আবেদনের বিরোধিতা করে প্রসিকিউশন।

ট্রাইব্যুনালে প্রসিকিউটর গাজী এম এইচ তামীম বলেন, ‘শামীম ওসমানসহ চারজনের পে নিয়োগ পাওয়া স্টেট ডিফেন্স আইনজীবী আলী হায়দার তার ডিসচার্জ আবেদনে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানকে কথিত বলে উল্লেখ করেছেন। তিনি ফরমাল চার্জের বাইরে গিয়েও নানা বিষয় টেনে এনেছেন। তাই এ আবেদন নিয়ে আমাদের আপত্তি রয়েছে।’ গত ১৯ এপ্রিল এই মামলায় পলাতক ১২ আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের আবেদন করে প্রসিকিউশন। সেদিন কৌঁসুলি আবদুস সাত্তার পালোয়ান আসামিদের বিরুদ্ধে তিনটি সুনির্দিষ্ট অভিযোগ তুলে ধরেন।

প্রসিকিউশনের আনা তিনটি সুনির্দিষ্ট অভিযোগে নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা ও সাইনবোর্ড এলাকায় ১০ জনকে হত্যার বিবরণ তুলে ধরা হয়েছে। প্রথম অভিযোগে বলা হয়েছে, ১৯ জুলাই চাষাড়া, ফতুল্লার সাইনবোর্ড ও এর আশপাশের এলাকায় কিশোর আদিল, ইয়াছিন, শিার্থী পারভেজ, পোশাককর্মী রাসেল এবং ছয় বছরের শিশু রিয়াসহ মোট ছয়জনকে হত্যা করা হয়। দ্বিতীয় অভিযোগে ২১ জুলাই ফতুল্লার ভূঁইগড় বাসস্ট্যান্ডের সামনে আবদুর রহমান ও মোহাম্মদ রাকিবকে হত্যার বিবরণ দেয়া হয়েছে। তৃতীয় অভিযোগে ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার সরকারের পতনের দিন বদিউজ্জামান ও আবুল হাসানকে হত্যার কথা বলা হয়েছে। এসব অভিযোগ প্রমাণের জন্য প্রসিকিউশন ট্রাইব্যুনালে ১৮টি ভিডিও কিপ, অডিও, প্রায় ৩০০ পৃষ্ঠার দালিলিক নথি এবং ৬১ জন চাক্ষুষ সাীর তালিকা জমা দিয়েছে।

মামলার প্রধান আসামি নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য শামীম ওসমান। অন্য আসামিরা হলেন- তার ছেলে ইমতিনান ওসমান অয়ন (অয়ন ওসমান), ভাতিজা আজমেরী ওসমান, অয়নের শ্যালক মিনহাজ উদ্দিন আহমেদ ভিকি, নারায়ণগঞ্জ রাইফেলস কাবের সাবেক সভাপতি তানভীর আহমেদ টিটু, ডিবিসির নারায়ণগঞ্জ প্রতিনিধি রাজু আহমেদ, ১৭ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর আব্দুল করিম বাবু, ১৮ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর কামরুল হাসান মুন্না, নারায়ণগঞ্জ মহানগর আওয়ামী লীগের সাবেক যুগ্ম সম্পাদক শাহ নিজাম উদ্দিন আহমেদ, যুবলীগ নেতা শাহাদাত হোসেন সাজনু, ছাত্রলীগ নেতা হাবিবুর রহমান রিয়াদ ও সোহানুর রহমান শুভ্র।

গত ১৯ জানুয়ারি রাষ্ট্রপ এই মামলায় আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করে। এরপরই ট্রাইব্যুনাল তা আমলে নিয়ে পলাতকদের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করে। সবশেষ গত ৪ মার্চ এই ১২ আসামিকে ট্রাইব্যুনালে হাজির হতে দু’টি দৈনিকে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের নির্দেশ দিয়েছিল আদালত।

হানিফসহ ৪ জনের বিরুদ্ধে স্যাগ্রহণ শেষ

জুলাই গণ-অভ্যুত্থান চলাকালে কুষ্টিয়ায় হত্যার ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব-উল আলম হানিফসহ চারজনের বিরুদ্ধে তদন্ত কর্মকর্তার জেরা শেষ হয়েছে। আগামী ১১ মে যুক্তিতর্ক উপস্থাপনের জন্য দিন ধার্য করেছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। গতকাল বৃহস্পতিবার বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন ট্রাইব্যুনাল-২ এ আদেশ দেয়।

আসামিরা পলাতক থাকায় এদিন তাদের পে রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবীরা তদন্ত কর্মকর্তাকে জেরা করেন। এ মামলায় মোট ১৯ জন সাী স্যা দিয়েছেন। মামলার অন্য তিন আসামি হলেন-কুষ্টিয়া জেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান ও জেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি সদর উদ্দিন খান, জেলা সাধারণ সম্পাদক আজগর আলী এবং সাবেক সদর উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান আতাউর রহমান আতা। গত বছরের ২ নভেম্বর হানিফসহ এই চারজনের বিরুদ্ধে বিচার শুরুর আদেশ দিয়েছিল ট্রাইব্যুনাল-২। এর আগে ৫ অক্টোবর প্রসিকিউশন তাদের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ জমা দেয় এবং ৬ অক্টোবর ট্রাইব্যুনাল তা আমলে নেন।

সেদিন ট্রাইব্যুনাল আসামিদের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করে ১৪ অক্টোবরের মধ্যে আদালতে হাজির হওয়ার নির্দেশ দিয়েছিল। পুলিশের প থেকে আসামিদের গ্রেফতার করা সম্ভব হয়নি বলে জানানো হলে ট্রাইব্যুনাল দু’টি জাতীয় দৈনিকে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের মাধ্যমে তাদের হাজির হওয়ার নির্দেশ দেয়। ২৩ অক্টোবর আসামিদের জন্য আইনজীবী নিয়োগ করে ট্রাইব্যুনাল এবং ২৭ অক্টোবর অভিযোগ গঠনের দিন ধার্য করা হয়।

প্রসিকিউশনের দাখিল করা আনুষ্ঠানিক অভিযোগে হানিফসহ চারজনের বিরুদ্ধে তিনটি সুনির্দিষ্ট অভিযোগ আনা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ‘কমান্ড রেসপনসিবিলিটি’ বা ঊর্ধ্বতন নেতৃত্বের দায় যেখানে আন্দোলনকারীদের ঠেকাতে আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা যথেষ্ট বলে ওবায়দুল কাদেরের দেয়া বক্তব্যের সময় সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত থেকে সমর্থন জানানোর অভিযোগ তোলা হয়েছে।

এ ছাড়া ২০২৪ সালের ২৯ জুলাই কুষ্টিয়ায় একটি বৈঠকে ছাত্র-জনতাকে হত্যা করার ব্যাপারে সরাসরি নির্দেশ দেয়া, ষড়যন্ত্র করা এবং জুলাই-আগস্ট মাসে আন্দোলন চলাকালে কুষ্টিয়া শহরে ৬ জনকে হত্যা করার অভিযোগও রয়েছে।