সঙ্কটে সরকার ও বিরোধী দলের এক হয়ে কাজকে ইতিবাচকভাবে দেখছে সবাই

Printed Edition

মোহাম্মদ জাফর ইকবাল

বৈশ্বিক পরিস্থিতির প্রভাবে বাংলাদেশে চলমান তীব্র জ্বালানি সঙ্কট ও জনদুর্ভোগ নিরসনে দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অচলাবস্থা ভেঙে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার ঘোষণা দিয়েছে সরকার ও বিরোধী দল। বর্তমান পরিস্থিতিতে জাতীয় স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়ে রাজনৈতিক ভেদাভেদ ভুলে যৌথভাবে সঙ্কট মোকাবেলার এই উদ্যোগকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন দেশের সাধারণ মানুষ ও বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, দেশের ৯৫ শতাংশ জ্বালানি আমদানিনির্ভর হওয়ায় বৈশ্বিক পরিস্থিতির প্রভাব অত্যন্ত ভয়াবহ। এই পরিস্থিতি মোকাবেলায় সরকারের পাশাপাশি বিরোধী দলের ভূমিকা রাখার আগ্রহ সঙ্কট সমাধানে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি ঘটাতে পারে। তবে সরকার ও বিরোধী দল ঠিক কিভাবে সমন্বয় করবে, তা নিয়ে বর্তমানে নানা মহলে আলোচনা চলছে। বিরোধী দল জানিয়েছে, তারা সরকারের কাছে একটি সুনির্দিষ্ট প্রস্তাবনা পেশ করবে; তবে এর জন্য সরকারের প থেকে আনুষ্ঠানিক আহ্বান প্রয়োজন। বিরোধীদের এমন আহ্বানে সাড়া দিয়ে গতকাল বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে ১০ সদস্যবিশিষ্ট একটি ‘বিশেষ কমিটি’ গঠন করা হয়েছে।

সংসদ নেতা ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সরকারি দলের পাঁচজন ও বিরোধী দলের পাঁচজনকে নিয়ে এই কমিটি গঠনের প্রস্তাব উত্থাপন করলে স্পিকার তা অনুমোদন করেন। কমিটির সুপারিশ বাস্তবায়নে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। এ সময় বিরোধীদলীয় নেতা ডা: মো: শফিকুর রহমান সরকারের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানানোর পাশাপাশি আশা প্রকাশ করেন যে, জাতীয় সমস্যা সমাধানে সংসদই হবে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু।

সূত্র মতে, গত ২২ এপ্রিল জাতীয় সংসদে ৬৮ বিধিতে বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা: শফিকুর রহমানের আনা এক নোটিশের ওপর জ্বালানি তেল ও বিদ্যুৎ সঙ্কট নিয়ে জরুরি আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। অধিবেশনে বিরোধীদলীয় নেতা জ্বালানি সঙ্কটকে একটি ‘জাতীয় সঙ্কট’ হিসেবে অভিহিত করেন এবং এটি মোকাবেলায় সরকারি ও বিরোধী দলের সমন্বয়ে একটি ‘যৌথ কমিটি’ বা ‘কমন প্ল্যাটফর্ম’ গঠনের প্রস্তাব দেন। তিনি উল্লেখ করেন, জ্বালানি তেলের জন্য দীর্ঘ লাইনে অপো করতে গিয়ে সাধারণ মানুষের প্রাণহানির মতো ঘটনাও ঘটছে, যা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। তিনি সঙ্কট নিরসনে সরকারের কার্যকর পদেেপর দাবি জানান এবং একযোগে কাজ করার প্রস্তাব দেন। জবাবে প্রধানমন্ত্রী ও সংসদনেতা তারেক রহমান এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে বলেন, জনগণের স্বার্থে বিরোধী দলের যেকোনো বাস্তবসম্মত ও গঠনমূলক পরামর্শ গ্রহণ করতে সরকার প্রস্তুত। তিনি আরো বলেন, জাতীয় স্বার্থ ও জনকল্যাণ রার েেত্র আমাদের মধ্যে কোনো দ্বিমত থাকা উচিত নয়। তিনি বিরোধী দলকে তাদের সুনির্দিষ্ট প্রস্তাবনাগুলো সরকারের কাছে জমা দেয়ার আহ্বান জানান।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সরকার ও বিরোধী দল যৌথভাবে কাজ করলে জ্বালানি খাতের অস্থিরতা অনেকটাই লাঘব হবে। তাদের মতে, বিরোধী দলের অভিযোগ অনুযায়ী সরকার শুরুতে সঙ্কটের সঠিক তথ্য দেয়নি; কিন্তু এখন যৌথভাবে কাজ করা সম্ভব হলে এই কমিটির মাধ্যমে জ্বালানির প্রকৃত মজুদ ও সরবরাহ পরিস্থিতি জনগণের সামনে আনা সম্ভব হবে। এটি দেশে কৃত্রিম সঙ্কট ও গুজব রোধে সহায়ক হবে। তারা আরো মনে করেন, উভয় প একমত হলে পাম্পগুলোতে জ্বালানি মজুদকারী সিন্ডিকেট ও কালোবাজারি রোধে আরো কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেয়া সম্ভব হবে; তখন শাস্তির ভয়ে কেউ অসাধু পন্থায় কারসাজি করার সাহস পাবে না। একইসাথে আলোচনার মাধ্যমে এমন একটি ‘জাতীয় জ্বালানি রোডম্যাপ’ তৈরি করা যেতে পারে, যা রাজনৈতিক পরিবর্তনের ফলেও তিগ্রস্ত হবে না। এতে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানো এবং দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধানে অগ্রাধিকার দেয়া সহজ হবে। এ ছাড়া বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সাশ্রয়ে দেশব্যাপী প্রচারণায় রাজনৈতিক ঐক্য জনসচেতনতা বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারবে, যা জনমনে বিশ্বাসযোগ্যতা বাড়াবে।

জানতে চাইলে জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও প্রচার সম্পাদক অ্যাডভোকেট এহসানুল মাহবুব জোবায়ের দৈনিক নয়া দিগন্তকে বলেন, ‘জাতীয় সংসদে বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা: শফিকুর রহমান জ্বালানি সঙ্কট সমাধানে আলোচনার আহ্বান জানিয়েছেন। সরকারি দল সেটি বিবেচনায় নেয়ার আশ্বাস দিয়েছে। ইতোমধ্যে সংসদে ১০ সদস্যের একটি কমিটির কথা প্রধানমন্ত্রী ঘোষণা করেছেন। আমরা বিরোধী দলের প থেকে একটি পূর্ণাঙ্গ প্রস্তাবনা জমা দেব। যৌক্তিক মনে হলে সরকারি দল সেটি গ্রহণ করতে পারে। আমরা সংসদের ভেতরে বা বাইরে এই কমিটির মাধ্যমে আলোচনায় প্রস্তুত আছি।’

পাবনা-৫ আসন থেকে নির্বাচিত বিএনপিদলীয় সংসদ সদস্য ও জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের সমন্বয়ক অ্যাডভোকেট শামছুর রহমান শিমুল বিশ্বাস বলেন, ‘শুধু জ্বালানি নয়, যেকোনো জাতীয় ইস্যুতে সরকার ও বিরোধী দলের একসাথে কাজ করা উচিত। বিরোধী দল তাদের মতামত ও পরামর্শ সরকারকে দেবে এবং সরকার তাদের নীতি অনুযায়ী অবশ্যই জনবান্ধব পরামর্শগুলো গ্রহণ করবে। সংসদে প্রধানমন্ত্রী তো সেই আশ্বাসই দিয়েছেন। আমরা দেখব, বিরোধী দল তাদের প্রস্তাবনায় কোন বিষয়গুলো তুলে ধরে।’

জ্বালানি সঙ্কট নিরসনে দুই পরে যৌথ অবস্থানের ঘোষণাকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির মহাসচিব সাইফুল ইসলাম। তিনি বলেন, ‘সরকার বলছে সঙ্কট নেই, আমরাও তা-ই বিশ্বাস করতে চাই। কিন্তু মূল সমস্যা হচ্ছে রেশনিং ব্যবস্থা। তেল কম দেয়ার কারণে মাঝপথেই গাড়ি বন্ধ হয়ে যাচ্ছে, ফলে চালকদের বারবার পাম্পে ছুটতে হচ্ছে। এ ছাড়া অবৈধ মজুদদারি ও পাচারের অভিযোগও আছে। আমি মনে করি, সরকার ও বিরোধী দল একসাথে কাজ করলে মজুদদারি ও পাচার বন্ধ করা সম্ভব হবে। পরিবহনগুলো পর্যাপ্ত জ্বালানি পেলে দীর্ঘ লাইন, যানজট ও হয়রানি বন্ধ হয়ে যাবে।’

এই উদ্যোগকে স্বাগত জানাচ্ছেন সাধারণ চালকরাও। আসাদগেট তালুকদার পেট্রলপাম্পে জ্বালানির জন্য অপেমাণ উবার চালক রিয়াজ বলেন, ‘আমরা এই কষ্ট আর সহ্য করতে পারছি না।’ পাশে থাকা আরেক চালক মনসুর বলেন, ‘সরকারের উচিত হবে বিরোধী দলের আহ্বানে সাড়া দিয়ে দ্রুত এই সঙ্কটের সমাধান করা।’

জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক এম তামিম মনে করেন, জ্বালানি সঙ্কট নিরসনে সরকারের নমনীয় মনোভাব এবং বিরোধী দলের গঠনমূলক সহযোগিতার প্রস্তাব বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে একটি নতুন মাত্রা যোগ করেছে। উভয় দলের এই ঐক্যবদ্ধ অবস্থান আন্তর্জাতিক বাজার থেকে জ্বালানি আমদানির েেত্র বাংলাদেশের কূটনৈতিক সমতাকেও বৃদ্ধি করবে।

জানা গেছে, চলমান সঙ্কট মোকাবেলায় বিরোধী দল বেশ কিছু প্রস্তাবনা তুলে ধরবে। এর মধ্যে জ্বালানির সুষম ব্যবহার, পেট্রলপাম্পগুলোতে সরবরাহ স্বাভাবিক করা, মজুদ সমতা বৃদ্ধি, নিয়মিত তদারকি, কালোবাজারি বন্ধ, সিন্ডিকেটকারীদের শনাক্তকরণ, অসাধু চক্রের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা এবং আমদানির বিকল্প উৎস খোঁজার মতো বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত থাকবে। এ ছাড়া জ্বালানি সাশ্রয়ে জনমত তৈরিতেও সুনির্দিষ্ট মতামত থাকবে।

রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলনের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক দিদার ভূঁইয়া বলেন, ফিলিংস্টেশনে সাধারণ মানুষের হাহাকার ও রাইডারদের দুর্ভোগ নিরসনে দ্রুত কার্যকর পদপে নিতে হবে। সিন্ডিকেটের স্বার্থ রা না করে জনগণের দীর্ঘমেয়াদি কল্যাণে কঠোর নীতি গ্রহণ করা প্রয়োজন। এেেত্র সরকার ও বিরোধী দলের একযোগে কাজ করার ঘোষণাটি অত্যন্ত ইতিবাচক।

সংসদে বিরোধীদলীয় হুইপ ও এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম বলেন, ‘বিরোধী দলের ভূমিকা পরিষ্কার। প্রধানমন্ত্রী বলেছেন জনবান্ধব যেকোনো প্রস্তাব তিনি গ্রহণ করবেন। এখন সরকার বাস্তবে কী পদপে নেয়, সেটাই দেখার বিষয়।’

বিদ্যুৎ ও জ্বালানিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু নয়া দিগন্তকে জানান, ‘তেলের কোনো সঙ্কট নেই। গত বছরের তুলনায় বর্তমানে ডিজেল, অকটেন ও পেট্রলের সরবরাহ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো হয়েছে। একটি অসাধু চক্র কৃত্রিমভাবে পাম্পে লাইন তৈরি করে কালোবাজার সৃষ্টির চেষ্টা করছে। এতে প্রকৃত ভোক্তারা সমস্যায় পড়ছেন। আমরা বিরোধী দলের প্রস্তাবকে স্বাগত জানাই। যারা কৃত্রিম সঙ্কট তৈরি করছে, তাদের বিরুদ্ধে সবাইকে ভূমিকা রাখতে হবে। সরকার এ বিষয়ে আন্তরিক এবং আলোচনার মাধ্যমে আমরা সঠিক সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারব।’

বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল ও সাবেক এমপি অধ্যাপক মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, ‘বিরোধীদলীয় নেতা ও আমিরে জামায়াত জ্বালানি সঙ্কট সমাধানে সরকারকে সহায়তা করার প্রস্তাব দিয়েছেন। আমাদের একটি প্রস্তাবনা তৈরি আছে। প্রধানমন্ত্রী সংসদে কমিটি ঘোষণা করেছেন; এখন সরকারের সেই আহ্বানে সাড়া দিয়ে আমরা কমিটির কাছে আমাদের প্রস্তাবনাগুলো পেশ করব।’