তিস্তায় ধু-ধু বালুচর, দুর্ভোগে উলিপুরের জনপদ
Printed Edition
মো: মুরাদ হোসেন মণ্ডল উলিপুর (কুড়িগ্রাম)
কুড়িগ্রামের উলিপুরে এক সময়ের খরস্রোতা তিস্তা নদী এখন পানিশূন্য হয়ে বিস্তীর্ণ বালুচরে পরিণত হয়েছে। নদীর বুকে জেগে উঠেছে অসংখ্য চর; কোথাও হাঁটুসমান পানি, আবার কোথাও নদীর তলদেশ পুরোপুরি শুকিয়ে গেছে। এতে এ অঞ্চলের কৃষি, মৎস্য ও যোগাযোগ ব্যবস্থায় পড়েছে নেতিবাচক প্রভাব। চরম দুর্ভোগে পড়েছেন তিস্তাপাড়ের হাজারো মানুষ।
স্থানীয়রা জানান, নদীতে পানি না থাকায় দুই তীরের মানুষকে এখন পায়ে হেঁটে নদী পার হতে হচ্ছে। কোথাও সামান্য পানির অংশ নৌকায় পার হয়ে আবার দীর্ঘ বালুচর হেঁটে গন্তব্যে যেতে হয়। এতে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়ছে শিশু, বয়স্ক ও অসুস্থ মানুষরা। স্থানীয়রা জানান, বর্ষা এলেই আবার একই নদী ভয়ঙ্কর রূপ ধারণ করবে এবং নদীর দুই পাড় ভাসিয়ে নেবে বন্যায়। সৃষ্টি হবে পাড় ভাঙন। ফসলি জমি ও কৃষকদের ঘরবাড়ি ভেঙে ভাসিয়ে নিবে নদীর বুকে। এ কারণে বছরজুড়েই তিস্তা পাড়ের মানুষদের জীবন কাটে অনিশ্চয়তায় ও কষ্টে।
একসময় তিস্তার পানি ব্যবহার করে এ অঞ্চলের কৃষকেরা ধান, গম, ভুট্টা ও বিভিন্ন সবজি চাষ এবং জেলেরা নদীতে মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করতেন। কিন্তু নদীতে পানি কমে যাওয়ায় সেচের জন্য এখন ডিজেলচালিত পাম্পের ওপরই নির্ভর করতে হচ্ছে। এতে উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে, অনেকে লোকসানের মুখে পড়ছেন।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, উলিপুর উপজেলার বজরা, গুনাইগাছ, থেতরাই ও দলদলিয়া ইউনিয়ন তিস্তা নদীঘেঁষা এলাকা। এসব অঞ্চলে নৌকাঘাট থাকলেও নদীতে পর্যাপ্ত পানি না থাকায় স্বাভাবিক পারাপার ব্যাহত হচ্ছে। অনেক সময় দীর্ঘ বালুচর হেঁটে নদীর মাঝামাঝি গিয়ে নৌকায় উঠতে হয়, যা সাধারণ মানুষের জন্য অত্যন্ত কষ্টকর হয়ে দাঁড়িয়েছে।
উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, তিস্তা ও ব্রহ্মপুত্র তীরবর্তী ৮৪টি চরাঞ্চলে প্রায় ছয় হাজার ৬৫০ হেক্টর জমিতে বিভিন্ন ফসলের আবাদ হয়েছে। তবে নদীতে পানি না থাকায় সেচ ব্যয় দিন দিন বেড়েই যাচ্ছে। অনেক কৃষক বাধ্য হয়ে ডিজেলচালিত সেচযন্ত্র ব্যবহার করছেন। এতে কৃষি উৎপাদনের খরচ যাচ্ছে বেড়ে।
সরজমিনে তিস্তা তীরবর্তী বিভিন্ন এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, নদীর মাঝখানে বিস্তীর্ণ বালুচর আর শুকনো খাল। কোথাও কোথাও সবুজ ফসলের আবাদ থাকলেও নদীর শাখা-প্রশাখাগুলো প্রায় মরুভূমির মতো শুকিয়ে গেছে। স্থানীয়রা জানান, নদীতে পানি এলেই আবার ভাঙন শুরু হবে এবং বসতভিটা ও ফসলি জমি নদীতে বিলীন হয়ে যাবে। ফলে খরা ও বন্যা- দুই অবস্থাতেই দুর্ভোগ পোহাতে হয় তিস্তাপাড়ের মানুষকে।
উপজেলার দড়িকিশোরপুর পানিয়ালের ঘাট এলাকার কৃষক নুরনবী মিয়া বলেন, ‘এক সময় ভরা তিস্তা এখন মরুভূমির মতো হয়ে গেছে। আবার বর্ষায় পানি বাড়লে সাগরের মতো ঢেউ খেলবে, ঘরবাড়ি ভেঙে নদীতে চলে যাবে। এখন বালুচর হেঁটে হেঁটে নদী পার হতে হয়। এতে বয়স্ক ও অসুস্থ মানুষ নিয়ে চলাচল খুব কষ্টসাথ্য ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়।’
তিস্তার নাব্যতা সঙ্কট দূর করতে দীর্ঘদিন ধরে ‘তিস্তা মহাপরিকল্পনা’ বাস্তবায়নের দাবি জানিয়ে আসছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। এ ব্যাপারে তাদের অভিযোগ, নানা জটিলতায় প্রকল্পটি বাস্তবায়ন না হওয়ায় উত্তরাঞ্চলের লাখো মানুষ দীর্ঘদিন ধরে ভোগান্তিতে রয়েছেন।
উপজেলা চর উন্নয়ন কমিটির আহ্বায়ক ও পৌর বিএনপির সদস্যসচিব সোলাইমান আলী বলেন, ‘উত্তরাঞ্চলের জীবনরেখা তিস্তা নদী। কিন্তু নাব্যতা সংকটের কারণে কৃষি, অর্থনীতি ও পরিবেশ- সব ক্ষেত্রেই বিরূপ প্রভাব পড়ছে। তিস্তা মহাপরিকল্পনা দ্রুত বাস্তবায়ন না হলে এই অঞ্চলের মানুষ আরো পিছিয়ে পড়বে।’ তিনি আরো জানান, তিস্তা রক্ষায় বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করা হচ্ছে
নদীর নাব্যতা ফিরিয়ে আনতে দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ নেয়ার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।