অস্তিত্ব সঙ্কটে সিরাজগঞ্জের তাঁতশিল্প বেতন পাননি অনেক শ্রমিক

Printed Edition
bangla-1
সিরাজগঞ্জের একটি তাঁত কারখানায় কাজ করছেন এক শ্রমিক : নয়া দিগন্ত

নিজস্ব প্রতিবেদক

ঈদকে সামনে রেখে সিরাজগঞ্জের তাঁতপল্লীগুলোতে আবার কর্মচাঞ্চল্য ফিরেছে। ভোর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত তাঁত বুননের খটখট শব্দে মুখর হয়ে উঠেছে সদর, বেলকুচি, শাহজাদপুর, উল্লাপাড়া ও এনায়েতপুরের তাঁত এলাকা। তবে এই কর্মব্যস্ততার আড়ালে রয়েছে গভীর সঙ্কট। কাঁচামালের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি, আমদানি সংক্রান্ত জটিলতা এবং নীতিগত সমস্যার কারণে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন তাঁতিরা। অনেকেই লোকসানের আশঙ্কা জেনেও ঈদের বাজার ধরতে ঝুঁকি নিয়ে কাপড় উৎপাদন করছেন।

স্থানীয় তাঁতি ও তাঁত মালিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, আগে যে শাড়িটি তৈরি করতে ৩০০ টাকা থেকে ৫০০ টাকা খরচ হতো, বর্তমানে সেই শাড়ি তৈরি করতে খরচ হয় ৭০০ থেকে এক হাজার টাকার কাছাকাছি। সুতার পাশাপাশি রং ও রাসায়নিকের দামও কয়েক গুণ বেড়ে যাওয়ায় উৎপাদন ব্যয় বেড়ে গেছে কয়েকগুণ। ফলে লাভের বদলে অনেক ক্ষেত্রেই লোকসানের মুখে পড়ছেন তাঁতিরা। এ কারণে অনেক শ্রমিককে এখনও বেতন দেয়া সম্ভব হয়নি।

তাঁত মালিকেরা বলছেন, বাংলাদেশ তাঁত বোর্ডের মাধ্যমে আগে তুলনামূলক কম দামে সুতা, রং ও প্রয়োজনীয় রাসায়নিক আমদানির সুবিধা পাওয়া যেত। কিন্তু গত প্রায় দুই বছর ধরে সেই সুবিধা কার্যত বন্ধ থাকায় তাদের খোলাবাজারের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। এতে বাজারে সিন্ডিকেট তৈরি হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তাঁতিরা। বাধ্য হয়ে তারা তিন থেকে চার গুণ বেশি দামে কাঁচামাল কিনে কাপড় উৎপাদন করছেন।

সরজমিনে বেলকুচি ও শাহজাদপুরের বিভিন্ন তাঁতপল্লীতে দেখা যায়, ঈদের বাজার ধরতে রাত-দিন ব্যস্ত সময় পার করছেন তাঁতিরা। কারখানাগুলোতে তৈরি হচ্ছে বিভিন্ন নতুন ডিজাইনের জামদানি, সুতি জামদানি, কাতান, বেনারসি ও অন্যান্য নানা ধরনের শাড়ি। প্রতিটি শাড়িতে আধুনিক ও শৈল্পিক কারুকাজে ফুটিয়ে তোলা হচ্ছে বাহারি নকশা।

বেলকুচি তাঁতপল্লীর শ্রমিক সাইদুল ইসলাম বলেন, ‘ঈদ এলেই কাজের চাপ কয়েক গুণ বেড়ে যায়। এবারও অনেক নতুন ডিজাইনের শাড়ি তৈরি হচ্ছে। কাজের চাপ বাড়ায় আয়ও কিছুটা বাড়ে। কিন্তুসুতার দাম বেশি হওয়ায় মালিকেরা খুব চিন্তায় আছেন।’

তাঁত মালিক বৈদ্যনাথ রায় বলেন, ‘তাঁতশিল্প এখন কঠিন সময় পার করছে। কাঁচামালের দাম এত বেশি যে উৎপাদন খরচ বেড়ে গেছে। আগে যে কাপড় তৈরি করতে ৩০০ টাকা লাগত, এখন সেই কাপড়টি তৈরি করতে লাগে প্রায় ৭০০ টাকা। ঈদের বাজার ধরতে ঝুঁকি নিয়ে কাপড় তৈরি করছি। কিন্তু ঈদের পর কী হবে, তা নিয়ে সবাই চিন্তিত।’

শিল্প-সংশ্লিষ্টদের মতে, সিরাজগঞ্জের তাঁতশিল্প একসময় দেশের অন্যতম প্রধান ঐতিহ্যবাহী শিল্প হিসেবে পরিচিত ছিল। জেলার ৯টি উপজেলায় প্রায় ১০ লাখ মানুষ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে এই শিল্পের সঙ্গে জড়িত ছিল। পাওয়ারলুম ও হ্যান্ডলুম মিলিয়ে জেলায় প্রায় পাঁচ লাখ তাঁত ছিল। তবে কাঁচামালের দাম বৃদ্ধি, বাজারের অস্থিরতা ও নীতিগত সমস্যার কারণে ইতিমধ্যে বহু তাঁত বন্ধ হয়ে গেছে।

সিরাজগঞ্জ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের সভাপতি সাইদুর রহমান বাচ্চু বলেন, ‘সিরাজগঞ্জের তাঁতশিল্প দেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহ্য। এই শিল্প টিকিয়ে রাখতে হলে কাঁচামালের বাজার নিয়ন্ত্রণ ও সরকারি সহায়তা জরুরি। সরকারের যথাযথ পৃষ্ঠপোষকতা পেলে এই শিল্প আবার ঘুরে দাঁড়াতে পারে।’

উল্লেখ্য, গত ৪ জানুয়ারি সুতা, রঙ রাসায়নিক আমদানিসহ চার দফা দাবিতে সারা দেশের তাঁতিদের তাঁতবোর্ড ঘেরাও কর্মসূচি পালিত হয়। সেখানে তাঁতিরা বলেন, দেশের ৩০ লাখ তাঁতি ও ৬০ লাখ তাঁতশ্রমিকের ৪ দফা প্রাণের দাবি আদায়ের লক্ষ্যে তাঁতবোর্ড ঘেরাওসহ, মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করছেন। দুর্নীতিগ্রস্ত কর্মকর্তাদের অপসারণ এবং সুতা, রঙ রাসায়নিক আমদানি অব্যাহত রাখার দাবিতে সারা দেশের তাঁতিরা এই কর্মসূচি পালন করে। অন্য তাঁতি নেতারাও অভিযোগ করেন, তাঁত বোর্ডে এখনো আওয়ামী দোসর হিসেবে পরিচিত কয়েকজন কর্মকর্তা বহাল রয়েছেন। বিশেষ করে তাঁত বোর্ডের মেম্বার দেবাশীষ নাগ (এসঅ্যান্ডএম) ও উপমহাব্যবস্থাপক রতন চন্দ্র সাহা (এসসিআর) তাঁতিদের আমদানি সুপারিশ বাস্তবায়নে প্রধান বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছেন। তাদের কারণেই চেয়ারম্যান আমদানি সুপারিশ কার্যকর করছেন না বলে অভিযোগ করা হয়।

তাঁতি নেতারা বলেন, আগে তাঁত বোর্ডের সহায়তায় সুতা, রং ও রাসায়নিক আমদানি করে তুলনামূলক কম খরচে কাপড় উৎপাদন করা যেত। কিন্তু গত দেড় বছর ধরে এসব কাঁচামাল আমদানির সুপারিশ না দেওয়ায় তাঁতিরা বড় সঙ্কটে পড়েছেন। ফলে খোলাবাজারে এসব পণ্যের দাম কয়েক গুণ বেড়ে গেছে। তাঁতশিল্প-সংশ্লিষ্টদের দাবি, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) জারি করা এসআরও নং ২০০-আইন/২০২৪/৫২ কাস্টমস-সংক্রান্ত জটিলতাও কাঁচামাল আমদানিতে বাধা সৃষ্টি করছে। এ ছাড়া তাঁত বোর্ডের কিছু কর্মকর্তার বিরুদ্ধে আমদানির সুপারিশ কার্যকর না করার অভিযোগও তুলেছেন তাঁতি নেতারা।

তাঁতিদের আরও একটি দীর্ঘদিনের দাবি হলো ঢাকার মিরপুরে ৪০ একর জমির ওপর পরিকল্পিত বেনারসি পল্লী ভাষানটেক প্রকল্প দ্রুত বাস্তবায়ন করা। তাঁতিদের অভিযোগ, প্রায় চার দশক ধরে প্রকল্পটি ঝুলে রয়েছে।

তাঁতি নেতারা বলেন, সুতা, রং ও রাসায়নিক আমদানির সুবিধা পুনর্বহাল, বিতর্কিত কর্মকর্তাদের অপসারণ এবং ভাষানটেক প্রকল্প বাস্তবায়নসহ চার দফা দাবি দ্রুত বাস্তবায়ন না হলে দেশের ঐতিহ্যবাহী তাঁতশিল্প বড় সঙ্কটে পড়বে। ফলে লাখো তাঁতি ও শ্রমিকের জীবিকা হুমকির মুখে পড়বে।

তাঁতিরা আশা করছেন, সরকারের কার্যকর উদ্যোগ ও নীতিগত সহায়তা পেলে সিরাজগঞ্জের ঐতিহ্যবাহী তাঁতশিল্প আবারো ঘুরে দাঁড়াতে পারবে। অন্যথায় ধীরে ধীরে হারিয়ে যেতে পারে শত বছরের এই শিল্প ঐতিহ্য।