এনসিটিবিতে চেয়ারম্যান পদশূন্য ২০২৬ সালের পাঠ্যবই মুদ্রণে শঙ্কা

এক ব্যক্তির কব্জায় তিন পদ বোর্ড সভায় কোরাম সঙ্কট

দীর্ঘ চার মাসেরও বেশি সময় ধরে সংস্থাটির প্রধান নির্বাহী চেয়ারম্যানের পদটি শূণ্য। দীর্ঘদিন হয়েছে প্রাথমিক শিক্ষাক্রমের সদস্য পদেও নেই কোনো কর্মকর্তা।

শাহেদ মতিউর রহমান
Printed Edition
NCTB-Logo

শিক্ষার্থীদের জন্য বিনা মূল্যের পাঠ্যবই মূদ্রণের এই ভরা মৌসুমে (পিক আওয়ার) এনসিটিবির কাজে চলছে স্থবিরতা। দীর্ঘদিন ধরেই প্রতিষ্ঠান প্রধান চেয়ারম্যানের পদ শূণ্য থাকায় অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়েও সিদ্ধান্ত নিতে বিলম্ব হচ্ছে। ফলে ২০২৬ শিক্ষাবর্ষের পাঠ্যবই মূদ্রণের কাজ নিয়েও তৈরি হয়েছে অনিশ্চয়তা। চেয়ারম্যানসহ গুরুত্বপূর্ণ তিনটি পদে একজন মাত্র ব্যক্তি দায়িত্বে থাকায় বোর্ড সভার উপস্থিতিতে কোরাম নিয়েও সঙ্কট তৈরি হয়। এতে গুরুত্বপূর্ণ অনেক সিদ্ধান্ত নিতে হিমশিম খেতে হয় জাতীয় শিক্ষাক্রম পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের (এনসিটিবি) বর্তমান কর্মকর্তাদের। গত মার্চ মাস থেকে চেয়ারম্যানের পদ শূণ্য। এমনকি আগামী নবেম্বর মাসের প্রথম সপ্তাহে বর্তমানে যিনি চেয়ারম্যানের অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করছেন সেই প্রফেসর রবিউল কবির চৌধুরীও অবসরে চলে যাচ্ছেন। ফলে আগামী শিক্ষাবর্ষের আগে পাঠ্যবই মূদ্রণের বিশাল যে কর্মযজ্ঞ সেখানেও কাজের বেশ ভাটা পড়েছে। চলমান এই সঙ্কট নিরসনে অতীত অভিজ্ঞতাসম্পন্ন ব্যক্তিকে এনসিটিবির চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দেয়া জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

এনসিটিবি’র কর্মকর্তাদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, দীর্ঘ চার মাসেরও বেশি সময় ধরে সংস্থাটির প্রধান নির্বাহী চেয়ারম্যানের পদটি শূণ্য। দীর্ঘদিন হয়েছে প্রাথমিক শিক্ষাক্রমের সদস্য পদেও নেই কোনো কর্মকর্তা। হজের ছুটিতে একমাসের বেশি সময় সৌদি আরবে ছিলেন পাঠ্যপুস্তক উইংয়ের সদস্য। সম্প্রতি তিনি দেশে এসেছেন। জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের গুরুত্বপূর্ণ পাঁচটি পদের তিন পদেই নেই কোনো দায়িত্বশীল কর্মকর্তা। অবশ্য ভারপ্রাপ্ত হিসেবে একজনকে দায়িত্ব দেয়া হলেও পাঠ্যবই মূদ্রণ প্রক্রিয়া শুরুর এই সময়টাতে কোনোই অভিভাবকই যেন নেই এনসিটিবিতে। আর এই সুযোগে অনিয়ম আর দুর্নীতিও একসাথেই জেঁকে বসেছে বিনামূল্যের পাঠ্যবই মূদ্রণের তদারকির দায়িত্বে থাকা এই প্রতিষ্ঠানটিতে।

এনসিটিবি সূত্র জানায়, প্রতিষ্ঠানটি সর্বশেষ চেয়ারম্যানের দায়িত্বে থাকা প্রফেসর ড. এ কে এম রিয়াজুল হাসান গত ২৫ জানুয়ারি অবসরে চলে যাওয়ার পর তাকে আবারো দুই মাসের জন্য চুক্তিভিত্তিক হিসেবে এনসিটিবি’র চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব দেয়া হয়েছিল। সেই মেয়াদও গত ২৬ মার্চ শেষ হয়েছে। কিন্তু এরপর এখনো পর্যন্ত কাউকেই এনসিটিবিতে নিয়মিত চেয়ারম্যান পদে নিয়োগ দেয়া হয়নি। তবে অতিরিক্ত দায়িত্ব হিসেবে এনসিটিবি’র শিক্ষাক্রম উইংয়ের সদস্য প্রফেসর ড. রবিউল কবীর চৌধুরীকে তার দায়িত্বের বাইরেও চেয়ারম্যান পদে অতিরিক্ত দায়িত্ব দেয়া হয়। অর্থাৎ গত চার মাস ধরেই চেয়ারম্যান হিসেবে অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করছেন তিনি। অন্য দিকে এনসিটিবি’র অন্যতম একটি গুরুত্বপূর্ণ বিভাগ প্রাথমিক উইং। এই উইংয়ের সদস্য পদটিও গত ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি থেকে শূন্য রয়েছে। আগে এই পদে দায়িত্ব পালন করেছেন প্রফেসর ড. সারোয়ার জাহান। তিনি ফেব্রুয়ারি মাসের মাঝামাঝিতে বদলি হয়ে যাওয়ার পর এই পদেও অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করছেন প্রফেসর ড. রবিউল কবীর চৌধুরী। তিনি একাই এখন এনসিটিবির প্রধান তিনটি পদের দায়িত্ব পালন করছেন। অন্য দিকে মেম্বার প্রাথমিক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন প্রফেসর

এনসিটিবি’র ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. রবিউল কবীর চৌধুরী নয়া দিগন্তকে বলেন পদশূন্য থাকলে কাজের গতি কমে যাবে এটাই স্বাভাবিক। আমি নিজেও চাইছি এখানে একজন স্থায়ীভাবে চেয়ারম্যান পদে কেউ আসুক। এতে আমি আমার নিজের কাজে আরো বেশি মনোযোগ দিতে পারব। তবে যতদিন চেয়ারম্যান পদে কেউ না আসে ততদিন তো আমাকেই সব কাজ দায়িত্ব নিয়েই পালন করতে হচ্ছে।

২০২৬ শিক্ষাবর্ষের শুরুতে দেশের সব শিক্ষার্থীর হাতে বিনামূল্যের পাঠ্যবই তুলে দেয়ার জন্য এখন থেকেই প্রস্তুতি নিতে হচ্ছে এনসিটিবিকে। সেই লক্ষ্যে কাজের গতি এবং তদারকি বাড়াতে এনসিটিবিতে নিয়মিত একজন অভিজ্ঞ ও দক্ষ চেয়ারম্যান নিয়োগ দেয়া জরুরি। বিশেষ করে সরকারের যে টার্গেট আগামী নভেম্বর মাসের ৩০ তারিখের মধ্যে দেশের প্রত্যেক উপজেলায় বই পৌঁছে দেয়া, সেই টার্গেট পূরণে অতীতের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে আগামী শিক্ষাবর্ষের বই শিক্ষার্থীদের হাতে পৌঁছাতে সক্ষম হবে এমন ব্যক্তিকেই চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দেয়া জরুরি। একই সাথে আওয়ামী লীগের সময়ে বিশেষ সুবিধা পাওয়া ব্যক্তিরা যারা নানা অনিয়ম আর দুর্নীতির সাথে জড়িত ছিলেন তাদেরও এখন চিহ্নিত করে এবং তাদের সহযোগী ও দোসরদের চিহ্নিত করে তাদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নিতে হবে। কথিত আছে, এনসিটিবিতে এখনো এমন অনেক কর্মকর্তা রয়েছেন যারা আওয়ামী লীগের নেতাদের আত্মীয় কিংবা প্রতিবেশী পরিচয় দিয়ে অন্যায়ভাবে নানা সুবিধা নিয়েছেন তাদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা গ্রহণ করা জরুরি।