অস্থিরতার কবলে পরমাণু শক্তি কমিশন ও রূপপুর বিদ্যুৎকেন্দ্র

আমিনুল ইসলাম
Printed Edition
  • অভিযুক্তরাই বিচারের দায়িত্বে
  • খোঁজ নিচ্ছে না সরকার!

সরকারের উদাসীনতায় চরম অস্থিরতার সৃষ্টি হচ্ছে পরমাণু শক্তি কমিশন ও রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ প্রকল্পে। সংশ্লিষ্ট বিজ্ঞানী, কর্মকর্তা-কর্মচারীরা প্রশ্ন তুলেছেন, সরকার কি পরমাণু শক্তি কমিশনকে বিলুপ্ত করতে চাইছে? নাকি উন্নত রাষ্ট্রের সাথে তাল মিলিয়ে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই সেক্টরের উন্নতি চাইছে? তারা অভিযোগ করছেন, পরমাণু শক্তি কমিশন ও তার আওতাধীন প্রতিষ্ঠানগুলোকে বাঁচাতে প্রধান উপদেষ্টার কাছে স্মারকলিপি দেয়া হয়েছে। কিন্তু যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়েছে সেই অভিযুক্তদেরই দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। যার কারণে ফ্যাসিবাদের দোসররা সুকৌশলে ধ্বংস করার পাঁয়তারা করছে দেশের সংবেদনশীল এই প্রতিষ্ঠানকে। রূপপুরে বিনা কারণে একের পর ছাঁটাই করা হচ্ছে প্রশিক্ষিত জনবলকে। প্রায় তিন মাস বেতন বন্ধ করে রাখা হয়েছে কমিশনের বিজ্ঞানীসহ দুই হাজার ৫০০ জনের। বন্ধ করে দেয়া হয়েছে বিজ্ঞানীদের আন্তর্জাতিক সেমিনারে অংশগ্রহণ।

জানা গেছে, রূপপুর ও অন্যান্য পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র পরিচালনার জন্য ‘পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র আইন, ২০১৫’ অনুযায়ী বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশন ‘নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্ল্যান্ট কোম্পানি বাংলাদেশ লিমিটেড’ নামে একটি কোম্পানি গঠন করে। পরবর্তী সময়ে, ২০১৮ সালে জনবল নিয়োগ দেয়া শুরু হয়; কিন্তু কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের কোনো পূর্ণাঙ্গ সার্ভিস রুল না দেয়ায় প্রকল্প সাইটে দীর্ঘ দিন কর্তৃপক্ষের সাথে দেনদরবার চলছিল; কিন্তু কর্তৃপক্ষ কোনোভাবেই তাদের মৌলিক বিষয়গুলো আমলে নিচ্ছিল না।

গত আগস্টে সিনিয়র সচিব মো: মোকাব্বির হোসেন দায়িত্ব নিয়ে সার্ভিস রুল প্রদানের নামে প্রায় ৭০ লাখ টাকা ব্যয়ে ৫৪টি সভা করে আংশিক সার্ভিস রুল প্রকাশ করা হয়। যেখানে শৃঙ্খলাবিধি ছাড়া অন্য কোনো সুযোগ সুবিধা সম্পূর্ণ অনুপস্থিত। আর এতেই ক্ষিপ্ত হয় সব স্তরের কর্মকর্তা ও কর্মচারীবৃন্দ। এ ছাড়াও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের স্বাভাবিক পদোন্নতি শুরু হলেও এমডি ড. জাহেদুল হাছান চযুংরপধষ ঝঃধৎঃ-ঁঢ়-এর আগে পদোন্নতি না দেয়ার ঘোষণা দেন। সচিব মো: মোকাব্বির হোসেন দায়িত্ব নিয়ে পূর্বে প্রচলিত সব নিয়োগ ও পদোন্নতি কার্যক্রম বন্ধ করে দেন। এসব বিষয়ে কথা বলার অপরাধে শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগসহ অন্যান্য কারণে ৩০০ জনের বেশি কর্মকর্তা-কর্মচারীকে শোকজ/ সতর্কতা/ স্ট্যান্ড রিলিজ, নোটিশ প্রদান ও বিভিন্ন মিটিংয়ে মৌখিকভাবে বরখাস্তের হুমকি প্রদানের মাধ্যমে ভীতিকর পরিবেশ তৈরি করা হয়। যার কারণে রূপপুর এনপিপি প্রকল্পে শুরু হয় অস্থিরতা, যা আরো বাড়িয়ে দেয় প্রতিষ্ঠানের মালিক বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনকে বাদ দিয়ে (এনপিসিবিএল) কোম্পানির সাথে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের চচঅ করার উদ্যোগ।

সংশ্লিষ্টরা বলেন, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র (রূপপুর এনপিপি) নির্মাণের লক্ষ্যে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষে পরমাণু শক্তি কমিশন, রাশান ফেডারেশন সরকারের সাথে সব ধরনের চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। একই সাথে কমিশন পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র আইন, ২০১৫ অনুযায়ী ‘নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্ল্যান্ট কোম্পানি বাংলাদেশ লিমিটেড’ (এনপিসিবিএল) নামে একটি কোম্পানি গঠন করে। ওই আইন, আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি কমিশনের (আইএইএ) গাইডলাইন এবং রাশান সরকারের সাথে চুক্তি অনুযায়ী, বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশন-ই রূপপুরের মালিক সংস্থা এবং এনপিসিবিএল পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র পরিচালনা করবে। যার প্রেক্ষিতে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের নির্মাণের যাবতীয় লাইসেন্স পরমাণু শক্তি কমিশনের নামে করা হয়েছে। আবার রূপপুর বিদ্যুৎকেন্দ্র পরিচালনার জন্য রাশান ফেডারেশনের সাথে ভবিষ্যৎ জ্বালানি ক্রয়ের চুক্তি পরমাণু শক্তি কমিশন করেছে। কিন্তু ভয়ঙ্কর বিষয় হলো বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রকল্প পরিচালক (একই ব্যক্তি) এনপিসিবিএলকে বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশন থেকে আইনবহির্ভূতভাবে আলাদা করার চক্রান্ত করার চেষ্টা করছেন। তিনি সিনিয়র সচিবকে নিয়ে বাপশককে পাশ কাটিয়ে রূপপুরের চড়বিৎ ঢ়ঁৎপযধংব অমৎববসবহঃ এনপিসিবিএল ও বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের সাথে করাই যুক্তিযুক্ত মর্মে উল্লেখ করে অফিস আদেশ জারি করেন। এতে বাপশক ও এনপিসিবিএলকে প্রতিপক্ষ করায় চরম অস্থিরতার সৃষ্টি হয়; যা রূপপুর প্রকল্পসহ যাবতীয় কার্যক্রম চরমভাবে হুমকির সম্মুখীন হচ্ছে বলে মনে করা হচ্ছে। তারা বলেন, রূপপুর প্রকল্পে কাজ করা জনবলদের রাশিয়ানদের দিয়ে প্রশিক্ষণ দেয়া হয়। প্রশিক্ষিত এই জনবলই কাজ করে যাচ্ছিলেন। কিন্তু বর্তমান সচিব ও এমডি সরকারের বিপুল টাকা আত্মসাৎ করতে রাশান ফেডারেশন থেকে বিপুল অর্থের বিনিময়ে জনবল ভাড়া করে রূপপুর এনপিপি পরিচালনা পাঁয়তারা করছে। এটি বাস্তবায়নের জন্য তারা স্থানীয়দের ভাড়া করে রূপপুর প্রকল্পের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের প্রতিবাদে মানববন্ধন করিয়ে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ওপর দোষ চাপিয়ে দেন।

এ ব্যাপারে জানতে এনপিসিবিএলের বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক ড. জাহেদুল হাছান ও বিজ্ঞান মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মো: মোকাব্বির হোসেনের সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাদের পাওয়া যায়নি।