আমরা সবাইকে সাথে নিয়ে দেশ গঠন করতে চাই : তারেক রহমান

Printed Edition
first-2
নীলফামারীতে জনসভায় বক্তৃতা করছেন তারেক রহমান : নয়া দিগন্ত

নীলফামারী ও ঠাকুরগাঁও প্রতিনিধি

বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান বলেছেন, ৭১ সালে আমরা দেশ স্বাধীন করার জন্য যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলাম। ঠিক একইভাবে ২০২৪ সালে ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুথানের সময় আমরা দেখিনি কে কোন র্ধমের। আমরা দলমত, ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে রাজপথে নেমে দেশের স্বাধীনতা রক্ষা করেছিলাম। একইভাবে এখানে দাঁড়িয়ে আপনাদের সামনে পরিষ্কার বলতে চাই আগামী দিনের রাজনীতি হবে দেশ পুনর্গঠনের রাজনীতি, আগামী দিনের রাজনীতি হবে রাষ্ট্র গঠনের রাজনীতি। আমরা সবাইকে সাথে নিয়ে দেশ গঠন করতে চাই।

তিনি গতকাল দুপুরে নীলফামারী হাইস্কুল মাঠে জেলা বিএনপি আয়োজিত এক নির্বাচনী জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে এ কথা বলেন।

তারেক রহমান বলেন, আমরা একটি দলকে খেয়াল করছি এ এলাকার মানুষ যাতে সহজে ভোট দিতে না পারে সে জন্য সমাজের বিভিন্ন মানুষকে ভয় দেখাচ্ছেন। বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করছে। আমি পরিষ্কারভাবে বলতে চাই বাংলাদেশের কোন ভোটারকে যারা ভয় দেখাবে ও বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করবে তাদের বিরুদ্ধে আমরা ব্যবস্থা নেব।

বিএনপির চেয়ারম্যান বলেন, এ অঞ্চলের মানুষের প্রাণের দাবি হচ্ছে তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন। ১২ তারিখের নির্বাচনে বিএনপি সরকার গঠন করলে আমাদের অন্যতম প্রধান কাজ হবে যত দ্রুত সম্ভব তিস্তা মহাপরিকল্পনার কাজ শুরু করা, যাতে এই এলাকা আবার সবুজ শস্য-শ্যামল হয়ে উঠতে পারে। কৃষিসহ অন্যান্য কাজের জন্য মানুষজনকে আর যেন পানির জন্য কষ্ট পেতে না হয়।

তারেক রহমান বলেন, বিএনপিসহ বিভিন্ন দলের বহু নেতাকর্মী স্বৈরাচারের সময় জীবন দিয়েছে। অনেক মানুষ তাদের প্রিয় স্বজনদের হারিয়েছে। অত্যাচার ও নির্যাতনের শিকার হয়েছে। নীলফামারীর মানুষও এই নির্যাতনের হাত থেকে রেহাই পায়নি। রাতের অন্ধকারে অনেক মানুষকে মেরে ফেলা হয়েছে। তাদের অপরাধ ছিল তারা জনগণের ভোটের অধিকার উদ্ধারে কথা বলেছিল। তিনি বলেন, ১২ তারিখের নির্বাচনে বাংলাদেশের মানুষ আবার ভোট দেবে। ভোট দিয়ে তাদের প্রতিনিধিকে নির্বাচিত করবে। কিন্তু শুধু ভোট দিলে চলবে না। আমাদেরকে এই নির্বাচনটাকে দেশ গঠনের নির্বাচন হিসেবে চিন্তা করতে হবে। দেশকে আমাদের গড়ে তুলতে হবে। এ দেশ যদি আমরা গড়ে তুলতে না পারি তাহলে আমাদের যাওয়ার জায়গা থাকবে না। আমাদের প্রথম ঠিকানা বাংলাদেশ শেষ ঠিকানা বাংলাদেশ।

তিনি বলেন, ১২ তারিখের নির্বাচনে বিএনপি সরকার গঠন করলে আমরা এ দেশের মা-বোনদেরকে অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করে তুলব। আমরা প্রতিটি নারীর কাছে সে যে ধর্মের হোক না কেন, তার কাছে ফ্যামিলি কার্ড পৌঁছে দিতে চাই। যে ফ্যামিলি কার্ডের মাধ্যমে প্রতিটি খেটেখাওয়া পরিবারের মা প্রতি মাসে সরকারের পক্ষ থেকে সহযোগিতা পাবে। আমরা কৃষকদের জন্য পরিকল্পনা গ্রহণ করেছি। কৃষকরা যদি ভালো থাকে বাংলাদেশের মানুষ ভালো থাকবে। কৃষকদের কৃষি কার্ড পৌঁছে দিতে চাই। তার মাধ্যমে সে সহজে কৃষিঋণ পেতে পারবে, সহজে বীজ, সার, কীটনাশকসহ কৃষিজাত দ্রব্য পাবে। শুধু তা-ই নয়, আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি বিএনপি সরকার গঠন করলে আমরা সারা বাংলাদেশে কৃষকদের ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষিঋণ সুদসহ মওকুফ করব।

তিনি আরো বলেন, সমাজের একশ্রেণীর মানুষ আছে যাদের অবদান জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত। এসব মানুষ হচ্ছে মসজিদ-মাদরাসার ইমাম, খতিব ও মুয়াজ্জিন এবং অন্য ধর্মের যারা গুরু আছেন তাদের অনেকে মানবেতর জীবনযাপন করেন। বিএনপি সরকার গঠন করলে এসব ধর্মীয় মানুষের জন্য সরকারের পক্ষ থেকে সম্মানের ব্যবস্থা করা হবে, যাতে তারা একটি সম্মানজনক জীবনযাপন করতে পারে।

তিনি কর্মসংস্থানের কথা উল্লেখ করে বলেন, নীলফামারী উত্তরা ইপিজেডকে আরো সম্প্রসারণ করা হবে; যাতে এ এলাকার মানুষের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা হয়। ছেলেমেয়েদের প্রশিক্ষণ দিতে এ এলাকায় বিভিন্ন প্রশিক্ষণ কেন্দ্র তৈরি করা হবে। এতে তারা নিজেরাই ব্যবসা বাণিজ্য করতে পারে অথবা বিদেশে চাকরির ব্যবস্থা করতে সহজ হবে।

এ ছাড়া তিনি নীলফামারীতে মেডিক্যাল কলেজ স্থাপন, সৈয়দপুর বিমানবন্দরকে ধীরে ধীরে আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে রূপান্তরিতকরণসহ এ এলাকাকে শিল্প অঞ্চল হিসেবে গড়ে তোলার আশ্বাস দিয়ে তারেক রহমান বলেন, এ এলাকার মানুষকে আর কৃষির ওপর নির্ভরশীল রাখতে চাই না। এ এলাকাকে শিল্পাঞ্চল হিসেবে গড়তে চাই। নীলফামারী-দিনাজপুর অবহেলিত এলাকা এই দুর্নাম ঘুচাতে চাই।

বক্তব্য শেষে সমাবেশে নীলফামারী-১ আসনে জোটের প্রার্থী জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশের মাওলানা মঞ্জুরুল আলম আফেন্দী, নীলফামারী-২ আসনে বিএনপি প্রার্থী প্রকৌশলী শাহরিন ইসলাম চৌধুরী তুহিন, নীলফামারী-৩ আসনে বিএনপি প্রার্থী সৈয়দ আলী ও নীলফামারী-৪ আসনে বিএনপি প্রার্থী আব্দুল গফুর সরকারকে পরিচয় করিয়ে দেন।

জেলা বিএনপির আহবায়ক মীর সেলিম ফারুকের সভাপতিত্বে ও জেলা বিএনপির সদস্য সচিব এএইচএম সাইফুল্লাহ রুবেলের সঞ্চালনায় জনসভায় আরও বক্তব্য দেন বিএনপির রংপুর বিভাগীয় সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক আব্দুল খালেক, সাবেক সংসদ সদস্য বিলকিস ইসলাম, জেলা বিএনপির সাবেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক এ্যাডভোকেট আবু মোহাম্মদ সোয়েম প্রমুখ।

জনগণকে সাথে নিয়ে দেশ পুনর্গঠন করতে চাই : ঠাকুরগাঁও প্রতিনিধি জানান, গতকাল ঠাকুরগাঁও সরকারি বালক উচ্চবিদ্যালয় বড় মাঠে আয়োজিত নির্বাচনী জনসভায় বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান বলেছেন, আমরা দেশকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে চাই। আমরা আন্দোলন করেছি, সংগ্রাম করেছি, জণগণকে সাথে নিয়ে আমরা এখন দেশকে পুনর্গঠন করতে চাই। আমরা এখন দেশকে খাদ্যে সাবলম্বী করে তুলতে চাই। আমাদের বেকারদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে চাই। আমাদের মা বোনদেরকে শিক্ষিত এবং তার পাশাপাশি অর্থনৈতিকভাবে সাবলম্বী করে গড়ে তুলতে চাই। কিন্তু এই কাজগুলো করতে এই দেশের যে মালিক জনগণ, তাদের সহযোগিতা ছাড়া করা সম্ভব নয়।

তিনি বলেন, বিগত স্বৈরাচারী সরকারের সময় যারা দেশে জীবন দিয়েছেন, আহত হয়েছেন, তাদের ত্যাগকে কখনো বৃথা যেতে দেয়া যায় না। এবারের নির্বাচন শুধু জনপ্রতিনিধি নির্বাচন করার নয়। এবারকার নির্বাচন হবে আমাদের দেশকে পুনর্গঠন করার নির্বাচন। গত এক যুগ ধরে বাংলাদেশের মানুষ যেমন তাদের রাজনৈতিক অধিকারকে প্রয়োগ করতে পারে নাই, তারা কথা বলার স্বাধীনতা পায় নাই। একইভাবে অর্থনৈতিকভাবে প্রতিষ্ঠিত অধিকার থেকেও অনেক পিছিয়ে গিয়েছে। দেশে আমাদের তরুণ যুবকদের যে কর্মসংস্থান হওয়ার কথা ছিল তা হয়নি। নারীদের যেভাবে মূল্যায়ন করার কথা ছিল সেটি হয়নি। দেশের কৃষকদের যে সহযোগিতা করার কথা ছিল সে কাজটিও করেনি বিগত স্বৈরাচার সরকার।

তিনি আরো বলেন, দেশের জনসংখ্যার অর্ধেক হচ্ছে নারী, এই নারীকে যদি আমরা আমাদের কর্মের সাথে সম্পৃক্ত করতে না পারি তাহলে কোনভাবেই দেশ এগিয়ে নিয়ে যাওয়া সম্ভব না। আপনারা দেখেছেন দেশনেত্রেী খালেদা জিয়া যখন দেশ পরিচালনার দায়িত্বে ছিলেন, তখন তিনি নারীদের উচ্চশিক্ষা বিনা মূল্যে করে দিয়েছিলেন। আমরা বাংলাদেশের প্রত্যেকটি ঘরে ঘরে গৃহীনীদের কাছে আমরা ফ্যামিলি কার্ড পৌছে দিতে চাই।

তিনি বরেন, ঠাকুরগাঁও, দিনাজপুর, পঞ্চগড় যেহেতু কৃষি প্রধান এলাকা তাই আমরা চাই, এই এলাকার মানুষ যাতে স্বাবলম্বী হতে পারে সে জন্য কৃষকদের সাহায্য সহযোগিতার পাশাপাশি, কৃষি ভিত্তিক যত শিল্প আছে সকল শিল্প এই এলাকার মধ্যে গড়ে তুলতে চাই। আমরা তরুণদের বিভিন্ন বিষয়ে প্রশিক্ষণ দিয়ে দক্ষ করে গড়ে তুলতে চাই, যাতে তারা দেশে বিদেশে কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে পারে।

সমাবেশে ঠাকুরগাঁও, পঞ্চগড় এলাকার বিভিন্ন আসনে বিএনপির প্রার্থীদের সাথে নিয়ে উপস্থিত জনতার কাছে ধারে শীষে ভোট চান তারেক রহমান।

ঠাকুরগাঁও জেলা বিএনপির সভাপতি মির্জা ফয়সল আমীনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সমাবেশে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলসগীর, ঠাকুরগাঁও জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক পয়গাম আলী, পৌর সভাপতি শরিফুল ইসলাম শরিফসহ বিভিন্ন স্তরের নেতাকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন।

দু’দিনে ঢাকার ১৪ আসনে জনসভা করবেন তারেক রহমান

বিশেষ সংবাদদাতা জানান, সারা দেশে নির্বাচনী প্রচারণা শেষ করে আজ ও কাল দু’দিন ঢাকা মহানগরের ১৪টি আসনে নির্বাচনী জনসভা করবেন বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান।

গতকাল শনিবার বিকেলে গুলশানে বিএনপির কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে কেন্দ্রীয় নির্বাচন পরিচালনা কমিটির মুখপাত্র মাহদী আমিন একথা জানান।

তিনি বলেন, তারেক রহমান রোববার (আজ) ঢাকা মহানগর উত্তরের ৬টি নির্বাচনী আসনে জনসভায় যোগদান করবেন। সোমবার নিজের নির্বাচনী এলাকাসহ ঢাকা মহানগর দক্ষিণের ৭টিসহ মোট ৮টি জনসভায় অংশ নেবেন চেয়ারম্যান।

আজ ঢাকা-১৭ নিজের আসন থেকে এই প্রচারণা শুরু করবেন তারেক রহমান। জনসভাটি হবে ইসিবি চত্বরে বেলা ২টায়। এরপর ঢাকা-১৬ আসনে আমিনুল হকের নির্বাচনী এলাকায় পল্লবী দুই নং ওয়ার্ডের লালমাঠে বেলা ২টা ৪০ মিনিটে, ঢাকা-১৫ আসনে শফিকুল ইসলাম খান মিল্টনের নির্বাচনী এলাকায় মিরপুর ১০ নং গোল চত্বর সংলগ্ন আদর্শ উচ্চবিদ্যালয়ে বেলা ৩টা ৩০ মিনিটে, ঢাকা-১৪ আসনে সানজীদা ইসলাম তুলির নির্বাচনী এলাকায় মিরপুর মডেল থানার রিপরীতে ন্যাশনাল বাংলা উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে বিকেল ৪টা ২০ মিনিটে, ঢাকা-১৩ আসনে ববি হাজ্জাজের নির্বাচনী এলাকায় শ্যামলী সিনেমা হলের পশ্চিম পাশে শ্যামলী ক্লাব মাঠে বিকেল ৫টা ১০ মিনিটে এবং ঢাকা-১১ আসনে এম এ কাইয়ুমের নির্বাচনী এলাকায় বাড্ডার সাঁতারকুলে সন্ধ্যা ৬টায় জনসভা হবে।

কাল সোমবার ঢাকা-১৭ আসনে নিজের নির্বাচনী এলাকায় বনানী কামাল আতাতুর্ক অ্যাভিনিউ খেলার মাঠে বেলা ১১টায়, ঢাকা-১০ আসনে শেখ রবিউল আলম রবির নির্বাচনী এলাকায় কলাবাগান ক্রীড়াচক্র মাঠে দুপুর ১২টায়, ঢাকা-৮ আসনে মির্জা আব্বাসের আসনে পীর জঙ্গি মাজার রোডে দুপুর ১টায়, ঢাকা-৯ আসনে হাবিবুর রশীদ হাবিবের আসনে বাসাবো তরুণ সংঘ মাঠে বেলা ২টায়, ঢাকা-৫ আসনে নবী উল্লাহ নবীর নির্বাচনী এলাকায় যাত্রাবাড়ী শহীদ ফারুক রোডে বেলা ৩টায়, ঢাকা-৪ আসনে তানভীর আহমেদ রবিনের নির্বাচনী এলাকায় জুরাইন দয়াগঞ্জ রোডে বিকেল ৪টায় এবং ঢাকা-৬ আসনে ইশরাক হোসেনের নির্বাচনী এলাকায় ধূপখোলা মাঠে ৫টায় এবং ঢাকা-৭ আসনে হামিদুর রহমান হামিদের নির্বাচনী এলাকায় লালবাগ বালুর মাঠে সন্ধ্যা ৬টায় তারেক রহমান বক্তব্য রাখবেন।