রক্তরঞ্জিত জুলাই-৩০
সব কর্মসূচিতে পুলিশি বাধা, রাতেই ‘মার্চ ফর জাস্টিস’-এর ডাক
অভিভাবকদের মৌন মিছিল, শিক্ষকদের প্রতিবাদ, সব জায়গায় ছিল বাধা, ছিল ধরপাকড়। দিন শেষে রাত সোয়া ১১টায় আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক আব্দুল কাদের ঘোষণা করেন নতুন কর্মসূচি ‘মার্চ ফর জাস্টিস’।
Printed Edition
২০২৪ সালের ৩০ জুলাই ছিল এক রক্তাক্ত ও উত্তাল দিন। সেদিন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ডাক দেয়া মুখে লাল কাপড় বেঁধে পালন করা শান্তিপূর্ণ কর্মসূচিগুলো একের পর এক পুলিশি বাধায় পণ্ড হয়ে যায়। অভিভাবকদের মৌন মিছিল, শিক্ষকদের প্রতিবাদ, সব জায়গায় ছিল বাধা, ছিল ধরপাকড়। দিন শেষে রাত সোয়া ১১টায় আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক আব্দুল কাদের ঘোষণা করেন নতুন কর্মসূচি ‘মার্চ ফর জাস্টিস’।
ঘোষণায় বলা হয়, ৩১ জুলাই বুধবার দুপুর সাড়ে ১২টায় দেশের সব আদালত, ক্যাম্পাস ও রাজপথে ‘মার্চ ফর জাস্টিস’ পালিত হবে। টেলিগ্রাম অ্যাপের মাধ্যমে আন্দোলনকারী ছাত্ররা দেশজুড়ে এই বার্তা ছড়িয়ে দেয়। দাবির মধ্যে রয়েছে জাতিসঙ্ঘের মাধ্যমে তদন্ত করে বিচার, গণগ্রেফতার বন্ধ এবং ৯ দফা ছাত্র-জনতার দাবি বাস্তবায়ন।
সামাজিক মাধ্যমে প্রতিক্রিয়া : ৩০ জুলাই সারা দেশে সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে প্রতিবাদের রঙ লাল। কোটা সংস্কার আন্দোলনে নিহতদের স্মরণে শিক্ষার্থী, শিক্ষক, সংস্কৃতিকর্মী, সাংবাদিকসহ নানা শ্রেণী-পেশার মানুষ ফেসবুক প্রোফাইল লাল ফ্রেমে রাঙান। এই উদ্যোগের ডাক দিয়েছিলেন আন্দোলনের নেতা মাহিন সরকার।
অন্যদিকে, সরকারের সমর্থকেরা কালো ফ্রেমে তাদের প্রোফাইল ছবি বদলে প্রতিবাদ জানান। একই দিন সরকার একদিনের রাষ্ট্রীয় শোক পালন করে। সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা কালো ব্যাজ ধারণ করেন, দেশের মসজিদ, মন্দির, গির্জা, প্যাগোডায় অনুষ্ঠিত হয় প্রার্থনা ও দোয়া মাহফিল।
শিক্ষক, অভিভাবক ও পেশাজীবীদের প্রতিবাদ : রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা মুখে লাল কাপড় বেঁধে মৌন মিছিল করেন। গুলিস্তানে প্রতিবাদী গানের মিছিল করে সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠনের সদস্যরা, যেটি পুলিশি বাধার মুখে পড়ে। পুরানা পল্টন মোড়ে বাম গণতান্ত্রিক জোট বিক্ষোভ করে সরকারের পদত্যাগ দাবি করে।
অভিভাবকদের অবস্থান কর্মসূচিতেও বাধা দেয় পুলিশ। ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের সামনে নারী মুক্তি কেন্দ্রের ব্যানারে একদল অভিভাবক অবস্থান নিতে গেলে তাদের সরিয়ে দেয়া হয়।
আন্তর্জাতিক উদ্বেগ : এই ঘটনার প্রেক্ষিতে আন্তর্জাতিক মহল থেকেও প্রতিক্রিয়া আসতে শুরু করে। জাতিসঙ্ঘের মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেস শিক্ষার্থী ও জনতার ওপর দমন-পীড়নের বিষয়ে ‘বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ’ পাওয়ার কথা জানান এবং জাতিসঙ্ঘের পক্ষ থেকে পদক্ষেপ নিতে প্রস্তুতির ঘোষণা দেন।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের পররাষ্ট্রনীতিবিষয়ক প্রধান জোসেপ বোরেল বলেন, ‘দেখামাত্র গুলির নির্দেশ এবং বিচারবহির্ভূত হত্যা মানবাধিকারের গুরুতর লঙ্ঘন।’
অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের মহাসচিব অ্যাগনেস ক্যালামার্ড খোলাচিঠিতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে সাম্প্রতিক দমনাভিযানের বিষয়ে গভীর উদ্বেগ জানিয়ে বলেন, ‘এটা শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের অধিকার হরণ।’
সরকারের প্রতিক্রিয়া : প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাতিসঙ্ঘসহ আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সহায়তায় সুষ্ঠু তদন্ত চেয়ে বলেন, ‘আমি জানি আমার কোনো ঘাটতি ছিল না, তবে নিরপেক্ষ তদন্তে সত্য বেরিয়ে আসুক।’
তিনি আহতদের দেখতে সোহরাওয়ার্দী মেডিক্যাল কলেজে যান ও যথাযথ চিকিৎসা নিশ্চিতের নির্দেশ দেন।
গ্রেফতার ও মামলা : ঢাকায় ২৬৪টি মামলা হয়েছে ৩০ জুলাই পর্যন্ত। এর মধ্যে ৫৩টি হত্যা মামলা। গ্রেফতার ২,৮৫০ জন। সারা দেশে মোট গ্রেফতার অন্তত ১০ হাজার। ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ‘ডিবিতে থাকা আন্দোলনের ছয় সমন্বয়কসহ অন্যদের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে মুক্তি না দিলে আরো কঠোর কর্মসূচি হবে।’
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলছে ধাপে ধাপে : এদিন সন্ধ্যায় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে মন্ত্রিসভা বৈঠকের পর শিক্ষামন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী বলেন, ‘জননিরাপত্তা বিবেচনায় ধাপে ধাপে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলবে সরকার। ইন্টারনেট সচল থাকায় অনলাইন ক্লাসের বিষয়টিও ভাবা হচ্ছে।’
বিএনপি-জামায়াত প্রসঙ্গ : বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, ‘গণহত্যা আড়াল করতেই সরকার এখন জামায়াত নিষিদ্ধের প্রসঙ্গ আনছে।’