বিলুপ্তপ্রায় অগ্নিঝরা সিঁদুরে লাল মৌটুসি

Printed Edition
back-6
বিলুপ্তপ্রায় অগ্নিঝরা সিঁদুরে লাল মৌটুসি

এম এ রকিব শ্রীমঙ্গল (মৌলভীবাজার)

পাখিটির দিকে তাকালে মনে হয়, কোনো শিল্পী যেন তার সবটুকু লাল রঙ ঢেলে দিয়েছেন এর গায়ে। নাম তার ‘সিঁদুরে লাল মৌটুসি’ বা ‘সিঁদুরে মৌটুসি’। দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বনাঞ্চলে অগ্নিঝড়া রঙের এই পাখিটির দেখা মিললেও বাংলাদেশে বর্তমানে এটি প্রায় বিলুপ্ত প্রজাতির তালিকায় স্থান করে নিয়েছে। বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ আইনে এই দৃষ্টিনন্দন পাখিটিকে সংরক্ষিত ঘোষণা করা হয়েছে।

মৌটুসি পরিবারের এই ক্ষুদে সদস্যটি সিঙ্গাপুরের জাতীয় পাখি হিসেবে বিশ্বজুড়ে স্বীকৃত। বাংলাদেশ ও ভারতের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের চিরসবুজ বন, পাতাঝরা বন ও ঝোপঝাড়ে এদের বিচরণ সবচেয়ে বেশি। চঞ্চল স্বভাবের এই আবাসিক পাখিটি মূলত গভীর অরণ্যের নির্জনতা পছন্দ করে।

রঙে ভিন্নতা : পুরুষ ও স্ত্রী পাখির রূপভেদ

এই প্রজাতির পুরুষ ও স্ত্রী পাখির মধ্যে শারীরিক সৌন্দর্যে বেশ পার্থক্য লক্ষ করা যায়:

পুরুষ মৌটুসি : এদের গায়ের রঙ অত্যন্ত উজ্জ্বল। বুক ও পিঠ গাঢ় সিঁদুরে লাল, পেটের দিকটা হলদে-জলপাই এবং ডানা কালচে। এদের গোলাকার লেজের অগ্রভাগ সাদা এবং দৈর্ঘ্য প্রায় ১৫ সেন্টিমিটার পর্যন্ত হয়। রোদের আলোয় এদের মাথার অংশ ও গোঁফে এক ধরনের নীলাভ ঝিলিক দেখা যায়।

স্ত্রী মৌটুসি : স্ত্রী পাখির গায়ের রঙ কিছুটা ম্লান। দেহের ওপরের অংশ জলপাই-সবুজ এবং নিচের অংশ হলদে-জলপাই। গলা ও বুকে থাকে হালকা লাল আভা। এদের লেজও গোলাকার ও অগ্রভাগ সাদা, তবে দৈর্ঘ্যে পুরুষের চেয়ে ছোট (প্রায় ১০ সেন্টিমিটার)।

সিঁদুরে মৌটুসি মূলত একা বা জোড়ায় বিচরণ করতে পছন্দ করে। এদের দীর্ঘ ও বাঁকানো ঠোঁট এবং নলাকার জিহ্বা ফুলের গভীর থেকে মধু সংগ্রহে সহায়ক। বাতাসের ওপর ভেসে এক ফুল থেকে অন্য ফুলে দ্রুতগতিতে উড়ে বেড়ানো এদের অনন্য বৈশিষ্ট্য। মধুর পাশাপাশি এরা মাকড়সা ও ছোট ছোট পোকামাকড়ও খেয়ে থাকে। বনের নিস্তব্ধতা ভেঙে এরা তীক্ষè স্বরে ‘চি-চিই-চিই’ শব্দে ডাকে। সাধারণত এপ্রিল থেকে জুলাই মাস এদের প্রজননকাল। এ সময় স্ত্রী ও পুরুষ পাখি মিলে ছোট গাছ বা ঝোপের সরু ডালে ঝুলন্ত বাসা তৈরি করে। বাসার বহির্ভাগ মাকড়সার জাল দিয়ে এমনভাবে আবৃত করা হয়, যা একে স্থায়িত্ব ও সৌন্দর্য দেয়। স্ত্রী পাখি সাধারণত দুই-তিনটি ডিম পাড়ে। দুই সপ্তাহ তা দেয়ার পর বাচ্চা ফোটে এবং জন্মের মাত্র তিন সপ্তাহের মধ্যেই ছানারা ডানা মেলে নীল আকাশে উড়তে শুরু করে।

বাংলাদেশে সিলেট ও পার্বত্য চট্টগ্রামের বনাঞ্চলে এই পাখির উপস্থিতি বেশি দেখা গেলেও দিন দিন এদের সংখ্যা কমে আসছে। সম্প্রতি হবিগঞ্জের সাতছড়ি বনে এই নান্দনিক পাখির সৌন্দর্য ক্যামেরাবন্দী করেছেন আলোকচিত্রী ও ছবির কবি তারিক হাসান। তার মতে, প্রকৃতির এই অপূর্ব সৃষ্টিকে বিলুপ্তির হাত থেকে বাঁচাতে বন রক্ষা ও জনসচেতনতা বাড়ানোর কোনো বিকল্প নেই।