যুদ্ধ বন্ধে যুক্তরাষ্ট্রকে ছাড় দিতে নারাজ ইরান
Printed Edition
নয়া দিগন্ত ডেস্ক
ইরানের সাথে যুদ্ধবিরতির মেয়াদ অনির্দিষ্টকালের জন্য বাড়িয়ে দিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ব্যয়বহুল এ যুদ্ধ থেকে বের হওয়ার পথ খুঁজছেন বলে মনে করা হচ্ছে। তবে তেহরান তাকে সহজ কোনো কূটনৈতিক সাফল্য এনে দিতে রাজি নাও হতে পারে।
এএফপি জানায়, ট্রাম্প এখনো ইরানের বিরুদ্ধে নৌঅবরোধ বজায় রেখেছেন। অথচ তেহরান বলছে, এ অবরোধ প্রত্যাহার না হলে যুদ্ধ অবসানের কোনো চুক্তি বিবেচনাই করা হবে না। ২৮ ফেব্রুয়ারি ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্র যৌথভাবে যে যুদ্ধ শুরু করে, সেটির অবসান নিয়ে আলোচনা চলছে।
ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার এবং দেশটির অন্যতম মুখপাত্র মোহাম্মদ বাকের গালিবাফ বলেছেন, ইরানের বন্দরগুলো থেকে যুক্তরাষ্ট্র অবরোধ তুলে না নিলে হরমুজ প্রণালি সবার জন্য উন্মুক্ত করা সম্ভব নয় তেহরানের প।ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে এ তথ্য জানিয়েছেন তিনি।
ইরানের নৌবন্দরগুলোতে জারি থাকা মার্কিন অবরোধকে ‘চলমান যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন’ উল্লেখ করে এক্সবার্তায় গালিবাফ বলেছেন, একটি পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধবিরতি কেবল তখনই অর্থপূর্ণ হয়ে উঠবেÑ যখন নৌঅবরোধ তুলে নেয়া হবে এবং আন্তর্জাতিক অর্থনীতিকে জিম্মি করার মতো কোনো ঘটনা ঘটার আশঙ্কা শূন্যে নেমে আসবে। সেই সাথে একটি সফল ও কার্যকর যুদ্ধবিরতির আরেকটি শর্ত হলো রণাঙ্গনের সব এলাকায় জায়নবাদী যুদ্ধবাজি বন্ধ করা।
তিনি বলেন, যুদ্ধবিরতির এমন খোলাখুলি লঙ্ঘন যদি একটি প করেই যেতে থাকে, তাহলে হরমুজ প্রণালির পুনরায় উন্মুক্ত হওয়া সম্ভব নয়। সামরিক আগ্রাসনের মাধ্যমে তারা যে ল্য অর্জন করতে পারেনি, ভয়ভীতি দেখিয়েও তা পারবে না।
ব্যবসায়িক ধাঁচের দ্রুত সমঝোতা করতে পারার সমতা নিয়ে প্রায়ই গর্ব করা ট্রাম্পের জন্য ইরানের ইসলামী প্রজাতন্ত্রের সাথে আলোচনা একেবারেই ভিন্ন অভিজ্ঞতা। কারণ তেহরানের কূটনীতিকরা দীর্ঘমেয়াদি লড়াইয়ে অভ্যস্ত, ধীরস্থির এবং যুক্তরাষ্ট্রকে অবিশ্বাসী প্রতিপ হিসেবে দেখে। পাকিস্তানে দ্বিতীয় দফা আলোচনায় অগ্রগতির আশা দেখিয়েছিলেন ট্রাম্প। এমনকি ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের সফরের কথাও ছিল। কিন্তু ইরান অংশগ্রহণ নিশ্চিত করেনি এবং শেষ পর্যন্ত ভ্যান্সও সফরে যাননি।
দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতির মেয়াদ শেষ হওয়ার মুখে এবং উপসাগরীয় আরব মিত্ররা সম্ভাব্য নতুন ইরানি হামলার আশঙ্কায় প্রস্তুতি নিতে থাকায় ট্রাম্প যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বাড়ান। তিনি দাবি করেন, যুদ্ধের কারণে ইরানের নেতৃত্ব ‘বিভক্ত’ হয়ে পড়েছে এবং নতুন প্রস্তাব তৈরির জন্য তাদের সময় প্রয়োজন।
ওয়াশিংটন থেকে এএফপি জানায়, মধ্যপ্রাচ্য ইনস্টিটিউটের জ্যেষ্ঠ গবেষক অ্যালেক্স ভাতাঙ্কা বলেন, ট্রাম্প চাইলে আরো আগ্রাসী সামরিক পদপে নিতে পারতেন। কিন্তু এখন পর্যন্ত তিনি নিজেকে আরও গভীর সঙ্কটে ফেলেননি। সামরিক হস্তপেবিরোধী অবস্থান নিয়ে নির্বাচনী প্রচারণা চালানো ট্রাম্পের জন্য এ যুদ্ধ রাজনৈতিকভাবে বিপর্যয়কর হয়ে উঠেছে। এমনকি তার নিজ দল রিপাবলিকানদের ভেতর থেকেও বিরোধিতা দেখা দিয়েছে।
আক্রমণের জবাবে ইরান হরমুজ প্রণালীর ওপর নিয়ন্ত্রণ জোরদার করে। বিশ্বের প্রায় পাঁচভাগের একভাগ তেল এই প্রণালী দিয়ে পরিবাহিত হয়। ফলে যুক্তরাষ্ট্রে জ্বালানির দাম বেড়ে যায়, যা কংগ্রেস নির্বাচনের কয়েক মাস আগে ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য চাপ তৈরি করেছে।
তেলআবিব বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট ফর ন্যাশনাল সিকিউরিটি স্টাডিজ এবং ওয়াশিংটনভিত্তিক আটলান্টিক কাউন্সিলের গবেষক, সাবেক ইসরাইলি গোয়েন্দা কর্মকর্তা ড্যানি সিত্রিনোভিচ বলেন, য়তি সত্ত্বেও ইরানের ধর্মীয় শাসনব্যবস্থা ভেঙে পড়ার মুখে নয় এবং তারা আত্মসমর্পণও করবে না। তিনি বলেন, ট্রাম্প উত্তেজনা বাড়াতে চান না। আমি বলছি না যে আর উত্তেজনা হবে না, কিন্তু তিনি রাজনৈতিক সব পথ শেষ পর্যন্ত ব্যবহার করতে চাইছেন।
সিত্রিনোভিচ আরো বলেন, আমার মনে হয় ট্রাম্প এই যুদ্ধ নিয়ে কান্ত। তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, তিনি বুঝতে পারছেন, যদিও প্রকাশ্যে তা স্বীকার করছেন না এ যুদ্ধের মূল্য আরো বাড়বে, কমবে না। তবে ইরানের নেতারা ট্রাম্পকে গভীরভাবে অবিশ্বাস করেন। কারণ যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল হামলা চালানোর মাত্র কয়েক দিন আগেও তার প্রশাসনের প্রতিনিধিরা ইরানের সাথে আলোচনা করছিলেন। একই ধরনের ঘটনা গত জুনেও ঘটেছিল, যখন আলোচনা চলাকালেই ইসরাইল বোমা হামলা শুরু করে। ট্রাম্প ও ইরানের শাসকগোষ্ঠী, উভয় পই নিজেদের দুর্বল দেখানোর বিষয়ে অত্যন্ত সংবেদনশীল।
ভাতাঙ্কা বলেন, যুদ্ধবিরতির সময় নৌঅবরোধ ঘোষণা করে ট্রাম্প নিজেই তার কূটনৈতিক প্রচেষ্টাকে দুর্বল করেছেন, কেবল ‘কঠোর অবস্থান’ দেখানোর জন্য। তার মতে, সম্ভাব্য একটি সমাধান হতে পারে, যুক্তরাষ্ট্র আনুষ্ঠানিকভাবে অবরোধ বজায় রাখবে, কিন্তু সেটি কঠোরভাবে কার্যকর করবে না। ভাতাঙ্কা বলেন, ‘ইরান খুব সহজেই বুঝতে পারবে অবরোধ বাস্তবে কার্যকর হচ্ছে কি না।’
এভাবে ইরান একে নিজেদের বিজয় হিসেবে তুলে ধরতে পারবে। তবে যদি তারা পুরোপুরি অবরোধ প্রত্যাহারের ওপর অনড় থাকে, তাহলে বোঝা যাবে তারা চুক্তির চেয়ে প্রতীকী অবস্থানকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। তার মতে, সেটি ইরানের জন্য ভুল হবে।
এখন পর্যন্ত ট্রাম্প অবরোধ শিথিল করার কোনো ইঙ্গিত দেননি। ইরানে হামলার দীর্ঘদিনের সমর্থক রিপাবলিকান সিনেটর লিন্ডসে গ্রাহাম ইঙ্গিত দিয়েছেন, অবরোধই এখন যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান চাপ সৃষ্টির কৌশল হতে পারে। তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে লেখেন, বুধবার ট্রাম্পের সাথে কথা বলে তিনি ধারণা পেয়েছেন যে ‘অবরোধ আরো বিস্তৃত হবে এবং শিগগিরই তা বৈশ্বিক রূপ নিতে পারে।’
প্রগতিশীল গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর ইন্টারন্যাশনাল পলিসির জ্যেষ্ঠ গবেষক সিনা তুসি বলেন, ট্রাম্পের সামনে এখন দু’টি পথ রয়েছে, অবরোধ তুলে নেয়া, যা ইরানকে আরো শক্তিশালী অবস্থানে থাকার বার্তা দেবে; অথবা অবরোধ বজায় রাখা, যা যুদ্ধবিরতি ভেঙে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি করবে। তিনি বলেন, ‘তেহরানের এখন প্রধান ধারণা হলো সময় তাদের পইে আছে এবং দীর্ঘমেয়াদি সঙ্ঘাত যুক্তরাষ্ট্র ও বৈশ্বিক অর্থনীতির ওপর আরো বড় চাপ সৃষ্টি করবে।’
গত ২৮ তারিখ যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল ইরানে সামরিক অভিযান শুরুর পর হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেয় ইরান। বর্তমানে এই প্রণালি নিয়ন্ত্রণ করছে আইআরজিসি। হরমুজ বন্ধ করার পর ইরানের সরকারের প থেকে বলা হয়েছে, যুদ্ধ চলাকালে যদি কোনো জাহাজ হরমুজ পেরোতে চায়, তাহলে অবশ্যই সেই জাহাজের ক্যাপ্টেনকে আইআরজিসির অনুমতি নিতে হবে।
টানা ৪০ দিন যুদ্ধ করার পর ৮ এপ্রিল ১৪ দিনের যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান। তারপর একটি স্থায়ী যুদ্ধবিরতি চুক্তি স্বারে ১১ এপ্রিল পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে বৈঠকে বসেন মার্কিন ও ইরানি প্রতিনিধিরা। কিন্তু ২১ ঘণ্টা আলোচনার পরও সেই বৈঠক ব্যর্থ হওয়ায় পরের দিন ১২ এপ্রিল ইরানি বন্দরগুলোতে অবরোধ জারির ঘোষণা দেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ঘোষণায় তিনি বলেন, ইরান যুক্তরাষ্ট্রের সাথে শান্তি চুক্তিতে আসার আগ পর্যন্ত দেশটির বন্দরগুলো থেকে কোনো ইরানি জাহাজ বের হতে পারবে না এবং বাইরের কোনো জাহাজ ইরানে প্রবেশও করতে পারবে না। যে ১৪ দিনের যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করেছিল যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান, সেটির মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা ছিল ২২ এপ্রিল; তবে তার আগেই ২১ এপ্রিল যুদ্ধবিরতির মেয়াদ অনির্দিষ্টকালের জন্য বাড়িয়ে দেন ট্রাম্প।
ইরানের ৩টি তেলবাহী জাহাজ জব্দ করল যুক্তরাষ্ট্র
এ দিকে এশিয়ার কয়েকটি দেশের জলসীমা থেকে ইরানি পতাকাবাহী অন্তত তিনটি তেলবাহী জাহাজ জব্দ করেছে মার্কিন সামরিক বাহিনী। গত বুধবার আন্তর্জাতিক শিপিং ও নিরাপত্তা সূত্রের বরাত দিয়ে এ তথ্য জানিয়েছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স। জানা গেছে, ভারত, মালয়েশিয়া ও শ্রীলঙ্কার কাছাকাছি অবস্থান থেকে সরিয়ে দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী।
হরমুজ প্রণালি ও ইরানের বন্দরগুলোতে, অর্থাৎ সমুদ্রপথে তেহরানের বাণিজ্যের ওপর ওয়াশিংটন অবরোধ আরোপ করার পর এ পদপে নেয়া হলো। এর আগে মধ্যপ্রাচ্যের উপসাগরীয় অঞ্চলের প্রবেশদ্বার হরমুজ দিয়ে জাহাজ চলাচল বন্ধ করতে তেহরান তিনটি জাহাজে গুলিবর্ষণ করেছিল। গত কয়েক দিনে মার্কিন বাহিনী ইরানের একটি কার্গো জাহাজ এবং একটি তেলবাহী ট্যাংকার জব্দ করেছে।
অন্য দিকে ইরান জানিয়েছে, তারা বুধবার হরমুজ প্রণালি দিয়ে বেরিয়ে যাওয়ার সময় দুটি কনটেইনার জাহাজ জব্দ করেছে। যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর এটিই ইরানের প্রথম জাহাজ জব্দের ঘটনা। মার্কিন ও ভারতীয় শিপিং সূত্র রয়টার্সকে জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের জব্দ করা তিন ইরানি ট্যাংকারের একটি ‘ডিপ সি’ নামের সুপার ট্যাংকার। এটি মালয়েশিয়া উপকূল থেকে এক সপ্তাহ আগে নিখোঁজ হয়েছিল। এ ছাড়া ‘সেভিন’ ও ‘ডোরেনা’ নামে আরো দু’টি ট্যাংকার জব্দ করা হয়েছে। ডোরেনা ২০ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল নিয়ে ভারত উপকূলের কাছে ছিল।
মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানিয়েছে, ইরানি বন্দর অবরোধ অমান্য করার চেষ্টা করায় ডোরেনা বর্তমানে একটি মার্কিন রণতরীর পাহারায় ভারত মহাসাগরে রয়েছে। সেন্টকম আরো জানায়, অবরোধ শুরু হওয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত ২৯টি জাহাজকে তারা বন্দরে ফিরে যেতে বাধ্য করেছে। সমুদ্রপথে ইরানের সামরিক তৎপরতা এবং ভাসমান মাইন এড়াতে মার্কিন বাহিনী এখন উন্মুক্ত সাগরে ইরানি জাহাজগুলো ল্যবস্তু করছে।