ঐতিহ্য, ফ্যাশন আর সাশ্রয়ী বাজারের মিলনমেলা

ঈদ বাজার

Printed Edition
back-3
ঐতিহ্য, ফ্যাশন আর সাশ্রয়ী বাজারের মিলনমেলা

পবিত্র ঈদুল ফিতরকে সামনে রেখে রাজধানীর পল্টন এলাকায় এখন উৎসবের আমেজ। ঐতিহ্য, আধুনিকতা এবং সাশ্রয়ী কেনাকাটার অনন্য সমন্বয়ে এ এলাকা রূপ নিয়েছে এক ব্যস্ততম ঈদবাজারে। বায়তুল মোকাররমের সুগন্ধি আতর ও কারুকার্যময় পাঞ্জাবি থেকে শুরু করে পলওয়েল সুপার মার্কেটের আধুনিক পশ্চিমা ধাঁচের পোশাক- সব মিলিয়ে পল্টন এখন যেন এক বিশাল কেনাকাটার মেলায় পরিণত হয়েছে।

সরেজমিনে দেখা গেছে, ঈদ উপলক্ষে পল্টনের বিপণিবিতান ও ফুটপাতজুড়ে এখন ক্রেতাদের উপচে পড়া ভিড়। নিরাপত্তার কড়াকড়ির মধ্যেও ব্যস্ত অলিগলিতে বিরাজ করছে উৎসবের আমেজ এবং শেষ মুহূর্তের কেনাকাটার তৎপরতা।

ঢাকার পল্টন ও এর আশপাশের এলাকা দীর্ঘদিন ধরেই ঈদ কেনাকাটার অন্যতম প্রধান কেন্দ্র। এখানে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের জন্য রয়েছে আলাদা আলাদা মার্কেট ও পণ্যের বৈচিত্র্য। আধুনিক পোশাকের জন্য পলওয়েল সুপার মার্কেট, ধর্মীয় ও ঐতিহ্যবাহী পোশাকের জন্য বায়তুল মোকাররম মার্কেট, পারিবারিক কেনাকাটার জন্য সিটি হার্ট শপিং কমপ্লেক্স এবং সাশ্রয়ী বাজারের জন্য জোনাকি সিনেমা হল ও গাউছুল আজম মার্কেট ক্রেতাদের কাছে বিশেষভাবে জনপ্রিয়। এ ছাড়া জিরো পয়েন্ট থেকে বায়তুল মোকাররম পর্যন্ত বিস্তৃত ফুটপাত বাজারও স্বল্প আয়ের ক্রেতাদের প্রধান ভরসা।

বিভিন্ন শ্রেণির ক্রেতার ভিড়

ঈদ বাজারে পল্টন এলাকায় মূলত মধ্যবিত্ত ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত ক্রেতাদের উপস্থিতি সবচেয়ে বেশি। এ শ্রেণির মানুষ সাধারণত বায়তুল মোকাররম মার্কেট বা সিটি হার্টে পরিবারের কেনাকাটা সারতে পছন্দ করেন। অন্যদিকে ফ্যাশন সচেতন তরুণ ও যুবকদের ভিড় সবচেয়ে বেশি দেখা যায় পলওয়েল সুপার মার্কেটে। আধুনিক ও বিদেশি ধাঁচের পোশাকের জন্য এই মার্কেট তাদের কাছে বিশেষ আকর্ষণীয়।

যেহেতু পল্টন একটি বড় বাণিজ্যিক এলাকা, তাই এখানে বিপুল সংখ্যক অফিসগামী কর্মজীবী মানুষও আসেন। অনেকেই অফিস শেষে দ্রুত কেনাকাটা সেরে নেন। এ ছাড়া দিনমজুর ও ভাসমান আয়ের মানুষরা ফুটপাতের দোকান থেকেই তাদের সাধ্যের মধ্যে ঈদের বাজার করে থাকেন। সব মিলিয়ে পল্টন এলাকা এখন সব স্তরের মানুষের এক বৈচিত্র্যময় ঈদ বাজারে পরিণত হয়েছে।

পলওয়েল সুপার মার্কেট : তরুণদের ফ্যাশনের কেন্দ্র

পলওয়েল সুপার মার্কেট মূলত তরুণ প্রজন্মের স্টাইলিশ পোশাকের জন্য পরিচিত। সরেজমিনে দেখা গেছে, এখানকার বেশিরভাগ পণ্য চীন, থাইল্যান্ড ও ভিয়েতনাম থেকে আমদানি করা। এখানে ফ্যাশন সচেতন তরুণ, শিক্ষার্থী এবং উচ্চ-মধ্যবিত্ত যুবক শ্রেণির ক্রেতা বেশি দেখা যায়। এ ছাড়া ঢাকা ও ঢাকার বাইরের অনেক অনলাইন শপ বা বুটিক ব্যবসায়ীরাও এখান থেকে খুচরা ও পাইকারি পণ্য সংগ্রহ করেন।

মার্কেটটিতে প্রিমিয়াম কোয়ালিটির জিন্স প্যান্ট, গ্যাবার্ডিন প্যান্ট, ক্যাজুয়াল ও ফরমাল শার্ট, টি-শার্ট, পলো শার্ট, ব্লেজার এবং ডেনিম জ্যাকেট পাওয়া যায়। পাশাপাশি ব্র্যান্ডের অনুকরণে তৈরি স্নিকার্স, ফরমাল লেদার জুতা, বেল্ট, মানিব্যাগ এবং বিভিন্ন ধরনের পারফিউমও বিক্রি হচ্ছে।

ডেমরা থেকে টি-শার্ট কিনতে আসা বেসরকারি চাকরিজীবী কালাম হোসেন বলেন, ‘রাজধানীর নামীদামি ব্র্যান্ডের দোকানে যে টি-শার্ট ১ হাজার ৯০০ থেকে ২ হাজার ৩০০ টাকায় বিক্রি হয়, সে একই ধরনের টি-শার্ট এখানে এক হাজার ৪০০ টাকায় পাওয়া যায়। তাই এত দূর থেকে এখানে কেনাকাটা করতে এসেছি। এক দোকান মালিক জানান, পাইকারি ও খুচরা- দুই ক্ষেত্রেই এখনো আশানুরূপ বিক্রি হয়নি। তবে রমজানের শেষের দিকে ভালো ব্যবসার আশা করছেন তারা।

বায়তুল মোকাররম মার্কেট : ঐতিহ্যবাহী ঈদ বাজার

দেশের অন্যতম প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী বিপণিবিতান বায়তুল মোকাররম মার্কেট। ঈদ উপলক্ষে এখানে তিল ধারণের জায়গা থাকে না। মধ্যবিত্ত ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারের পাশাপাশি ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্যপূর্ণ ক্রেতাদের উপস্থিতি এখানে বেশি দেখা যায়। বয়স্ক ব্যক্তি থেকে শুরু করে শিশুদের জন্য পাঞ্জাবি কিনতে আসা অভিভাবকরাই এই মার্কেটের প্রধান ক্রেতা।

এখানে লক্ষেèৗ, সুতি ও সিল্ক কাপড়ের কারুকার্য করা পাঞ্জাবি, পায়জামা, দেশী-বিদেশী টুপি, বিভিন্ন ব্র্যান্ডের আতর, সুরমা, তসবিহ এবং জায়নামাজ পাওয়া যায়। নিচতলায় রয়েছে নামি-দামি ব্র্যান্ডের ঘড়ি, চশমা এবং স্যান্ডেল বা চটির বড় সংগ্রহ। স্বর্ণালঙ্কার ও ইলেকট্রনিক পণ্যের দোকানও রয়েছে এখানে।

ক্রেতা আসলাম বলেন, ছেলের জন্য আর নিজের জন্য পাঞ্জাবি নিতে এসেছি। সাথে টুপি আর আতরও কিনলাম। বায়তুল মোকাররমে না এলে ঈদের কেনাকাটা পূর্ণ হয় না। তবে এবার জুতার দাম গতবারের চেয়ে একটু বেশি মনে হচ্ছে। এক পাঞ্জাবি বিক্রেতা জানান, “আলহামদুলিল্লাহ, এবার সুতি ও সিল্কের ওপর হাতের কাজ করা পাঞ্জাবি বেশ ভালো বিক্রি হচ্ছে। আমাদের এখানে বংশপরম্পরায় কাস্টমার আসে।

সিটি হার্ট শপিং কমপ্লেক্স : পরিবারের স্বস্তির কেনাকাটা

পল্টনের আধুনিক বিপণিবিতানগুলোর মধ্যে সিটি হার্ট শপিং কমপ্লেক্স অন্যতম। পরিবার নিয়ে স্বাচ্ছন্দ্যে কেনাকাটার জন্য এটি বেশ জনপ্রিয়। এখানে মূলত মধ্যবিত্ত ও উচ্চ-মধ্যবিত্ত শ্রেণির নারী ও পরিবার বেশি আসেন। যারা ভিড় এড়িয়ে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে সময় নিয়ে কেনাকাটা করতে চান, তারা এই মার্কেটকে প্রাধান্য দেন।

এই মার্কেটে নারীদের জন্য ভারতীয় ও পাকিস্তানি থ্রি-পিস, লেহেঙ্গা, কাফতান, জর্জেট ও সুতি শাড়ি পাওয়া যায়। শিশুদের জন্য রয়েছে রঙিন ফ্রক, স্কার্ট, শার্ট-প্যান্ট সেট এবং বিভিন্ন ধরনের খেলনা। পাশাপাশি উন্নত মানের কসমেটিকস ও জুয়েলারির দোকানও রয়েছে।

এক দোকান মালিক বলেন, “ফ্যামিলি কাস্টমারই আমাদের মূল ক্রেতা। এবার ইন্ডিয়ান ‘আলিয়া কাট’ ও ‘নায়রা কাট’ থ্রি-পিস মেয়েরা বেশি পছন্দ করছে। সন্ধ্যার পর থেকে ভিড় সামলানো কঠিন হয়ে পড়ে।” গৃহিণী ফারিয়া বলেন, “বাচ্চাদের জন্য ফ্রক আর নিজের জন্য পাকিস্তানি লন কিনতে এসেছি। এখানে সব ধরনের কালেকশন এক জায়গায় পাওয়া যায় বলে সুবিধা।”

সাশ্রয়ী বাজার : জোনাকি ও গাউছুল আজম মার্কেট

যাদের বাজেট তুলনামূলক কম, তাদের জন্য জোনাকি সিনেমা হল মার্কেট ও গাউছুল আজম মার্কেট বেশ জনপ্রিয়। নিম্ন-মধ্যবিত্ত ও শ্রমজীবী মানুষেরাই এখানে বেশি কেনাকাটা করেন। এখানে স্থানীয় কারখানায় তৈরি ছেলেদের সুতি শার্ট, প্যান্ট, শিশুদের রেডিমেড পোশাক এবং সাধারণ ওড়না বা ওড়না সেট পাওয়া যায়। পাশাপাশি গৃহস্থালির প্রয়োজনীয় তৈজসপত্র ও রান্নার সরঞ্জামও বিক্রি হয়।

ছোটদের পোশাকের দোকানদার মিরাজ বলেন, আমাদের ক্রেতারা অনেকেই আর্থিক টানাপড়েনে থাকেন। তাই আমরা কম লাভে বেশি পণ্য বিক্রির চেষ্টা করি। গ্রামের বাড়িতে যারা ঈদ করতে যাবেন, তারা এখান থেকে অনেক সময় একসাথে বেশি পণ্য কিনে নেন।

ক্রেতা শাকিল বলেন, বাজেট কম, তাই এখানেই কেনাকাটা করতে এসেছি। বাবা-মা আর ছোট ভাইয়ের জন্য কাপড় কিনেছি। বড় মার্কেটে যাওয়ার সাহস পাই না, এখানে দরদাম করে সাধ্যের মধ্যে জিনিস পাওয়া যায়।

কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা

ঈদকে কেন্দ্র করে পল্টন এলাকায় কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) এক কর্মকর্তা বলেন, পবিত্র ঈদুল ফিতর উৎসবমুখর ও নিরাপদ পরিবেশে উদযাপনের লক্ষ্যে সব ধরনের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। পুলিশের পাশাপাশি ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান পর্যায়েও নিরাপত্তা সচেতনতা বাড়াতে হবে।

তিনি আরো বলেন, ঈদযাত্রাকে স্বস্তিদায়ক করতে পর্যাপ্তসংখ্যক পুলিশ সদস্য নিরলসভাবে কাজ করছেন। সবার সম্মিলিত সহযোগিতায় কাজ করতে পারলে ঈদকে ঘিরে যেকোনো সমস্যা মোকাবেলা করা সম্ভব হবে।