জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের বিচার মানবতাবিরোধী অপরাধ
সালমান ও আনিসকে দায়ী করলেন শহীদের বাবা
Printed Edition
নিজস্ব প্রতিবেদক
ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে ছেলে হত্যার জন্য সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান ও সাবেক আইনমন্ত্রী আনিসুল হককে সরাসরি দায়ী করেছেন শহীদ আনোয়ারের বাবা আল আমিন পাটোয়ারী। গতকাল বৃহস্পতিবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এর চেয়ারম্যান বিচারপতি মো: মোহিতুল হক এনাম চৌধুরীর একক বেঞ্চে স্যা দেয়ার সময় তিনি এ অভিযোগ করেন।
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় কারফিউ জারি করে গণহত্যায় উসকানি প্রদানসহ মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় সালমান ও আনিসুলের বিরুদ্ধে গতকাল ছিল তৃতীয় দিনের স্যাগ্রহণ। ৬৫ বছর বয়সী অবসরপ্রাপ্ত মাদরাসা শিক আল আমিন পাটোয়ারী মামলার চতুর্থ সাী হিসেবে আদালতে জবানবন্দী দেন। আল আমিন তার জবানবন্দীতে বলেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট মিরপুর-১০ নম্বর এলাকায় বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে অংশ নিয়ে শহীদ হন তার ৩৫ বছরের ছেলে মো: আনোয়ার হোসেন পাটোয়ারী। ছেলের কথা বলতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি। তিনি বলেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট বিকেল ৫টায় ছেলের মোবাইল ফোন বন্ধ পাই। পরে তাকে খোঁজাখুঁজি শুরু করি। ওই সময় লোকমুখে শুনি ছেলে গুলিবিদ্ধ হয়ে মিরপুর-১০ নম্বর এলাকায় ডা: আজমল হাসপাতালে ভর্তি রয়েছে। খবর পেয়ে হাসপাতালে যাই আমি ও আমার স্ত্রী। হাসপাতালের মেঝেতে আনোয়ারসহ ১৫-২০ জনের লাশ দেখতে পাই। সবাই গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা গেছেন। এ সময় আমি আমার ছেলেকে শনাক্ত করি।
তিনি বলেন, হাসপাতালে আমার ছেলে ও অন্যদের শরীরে রক্ত দেখে আমি অসুস্থ হয়ে পড়ি। আমার সাথে আমার ছোট ছেলে মো: আব্দুল্লাহও ছিল। এরপর আমি ছেলের লাশ হাসপাতাল থেকে বাসায় নিয়ে আসি। একই সাথে তার মৃত্যুসনদপত্র সংগ্রহ করি। এরপর রাত ১০টার দিকে রূপনগর আবাসিক এলাকায় আনোয়ারের নামাজে জানাজা সম্পন্ন হয়। পরে তাকে লক্ষ্মীপুরে গ্রামের বাড়িতে দাফন করি।
সাী আরো বলেন, আমার ছেলের হত্যার জন্য সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, সাবেক সড়কমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের, সাবেক আইনমন্ত্রী আনিসুল হক, প্রধানমন্ত্রীর সাবেক উপদেষ্টা সালমান এফ রহমানসহ অন্যরা দায়ী বলে জানতে পেরেছি। বৈঠক করে কারফিউ দিয়ে আন্দোলন দমনের উদ্দেশে ছাত্র-জনতাকে শেষ করে দেয়ার সিদ্ধান্ত নেন তারা। এ কারণেই আমার ছেলের হত্যার জন্য তাদের দায়ী করছি। আমি আমার ছেলে হত্যার ন্যায়বিচার চাই। এমন শান্তি চাই যেন ভবিষ্যতে এমন ঘটনা না ঘটে।
স্যাগ্রহণ শেষে আল আমিনকে জেরা করেন সালমান ও আনিসুলের আইনজীবী মুনসুরুল হক চৌধুরী। এ মামলায় পরবর্তী স্যাগ্রহণের জন্য আগামী ৫ এপ্রিল দিন ধার্য করেন ট্রাইব্যুনাল। প্রসিকিউশনের পে শুনানি করেন প্রসিকিউটর গাজী এম এইচ তামিম। সাথে ছিলেন প্রসিকিউটর আবদুস সাত্তার পালোয়ান, সহিদুল ইসলাম সরদারসহ অন্যরা।
সেনা কর্মকর্তাদের মামলার পুনঃতদন্ত দাবি : এদিকে গুম-খুনসহ জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধে সেনা কর্মকর্তাদের মামলার পুনঃতদন্ত চেয়েছেন ডিফেন্স আইনজীবী এ বি এম হামিদুল মিসবাহ। একই সাথে সেনা আইনে তাদের বিচার চেয়েছেন তিনি। বৃহস্পতিবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল প্রাঙ্গণে প্রেস ব্রিফিংয়ে এ দাবি তোলেন আসামিপরে এই আইনজীবী। মিসবাহ বলেন, সেনা কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে তিনটি মামলা চলমান রয়েছে ট্রাইব্যুনালে। এসব মামলায় চাকরিরত ১৫ জন সেনা কর্মকর্তা গ্রেফতার রয়েছেন। তিনি বলেন, তিনটি মামলাই ট্রাইব্যুনালের অধিেেত্রর মধ্যে পড়ে না। যেহেতু তারা কর্মরত সেনা কর্মকর্তা ছিলেন। আইন দেখলেই বোঝা যাবে এসব মানবতাবিরোধী অপরাধের আওতায় পড়ে না। তাই এখানে শুধু আইসিটি আইন চিন্তা করলেই হবে না। এখানে সেনা আইনও রয়েছে। যেহেতু তারা চাকরিরত সেনা কর্মকর্তা, সেহেতু বিচারটা সেনা আইনেই হওয়া সম্ভব ছিল। তবে এখনো যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে। কেননা আইনের মধ্যেই সুযোগটা করে দেয়া আছে যে তাদের বিচার সেনা আইনে হতে পারে।
তদন্তে গাফিলতি হয়েছে কি না জানতে চাইলে এই আইনজীবী বলেন, সেনা আইন থাকা সত্ত্বেও ট্রাইব্যুনালের আইনকে ঘষামাজা করে সংশোধন আনা হয়েছে। যা সেনা আইনের সাথে সাংঘর্ষিক। অথচ সেনা আইনটি অনেক পুরনো আইন। তাই আমরা মনে করি এটা উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে করা হয়েছে। অর্থাৎ সেনা কর্মকর্তাদের মামলা আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে আনা সেনা আইনের সাথে সাংঘর্ষিক। মিসবাহ বলেন, আমরা অবশ্যই এসব মামলার পুনঃতদন্ত চাইবো। কারণ নিজেদের তাগিদে আত্মসমর্পণ করেছেন ১৫ জন সেনা কর্মকর্তা। তারা বিচারের মুখোমুখি হয়েছেন। তারা চাইলেই অপারগতা প্রকাশ করতে পারতেন। কিন্তু তারা সেটি করেননি। আইনের প্রতি শ্রদ্ধা রেখেই এখানে এসেছেন তারা। তবে কোনো অপরাধ করে থাকলে তাদের আইনেই ন্যায়বিচার সম্ভব।