এখনো নমনীয় পুলিশ : মাঠে নামতে চাইছে নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্রলীগ

আমিনুল ইসলাম
Printed Edition
  • শেষ হয়নি তালিকা তৈরির কাজ
  • বিভিন্ন স্থানে চালানো হচ্ছে পরিকল্পিত হামলা

পুলিশের নমনীয়তায় ফুসে উঠতে চাইছে নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্রলীগসহ আওয়ামী লীগ ও তার অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরা। ইতোমধ্যে তাদের অবস্থান জানান দিতে পরিকল্পিতভাবে বিভিন্ন অপরাধমূলক ঘটনার জন্ম দিচ্ছে। বিশেষ করে প্রকাশ্য দিবালোকে মাদারীপুরের জাজিরায় অর্ধশত বোমার বিস্ফোরণ ঘটিয়েছে। রাজধানীর রুপনগরে ছাত্রদল নেতাকে প্রকাশ্যে পিটিয়ে ও কুপিয়ে জখম করেছে। এর আগে থানায় হামলা চালিয়ে আহত করেছে ওসিসহ তিন পুলিশ কর্মকর্তাকে। অথচ এখনো শেষ হয়নি নিষিদ্ধ ছাত্রলীগ নেতাকর্মীদের ডেটাবেজ তৈরির কাজ। বিচ্ছিন্নভাবে দুই-একজনকে গ্রেফতার করা হলেও ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকেই অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছে তারা। যদিও ছাত্রলীগ নিষিদ্ধ হওয়ার পর থেকেই বিশৃঙ্খলা এড়াতে প্রতিটি জেলা থানা ওয়ার্ড ইউনিয়ন পর্যায়ের নেতাকর্মীদের ডাটা তৈরির নির্দেশ হওয়া হয়েছিল পুলিশ সদর দফতার থেকে। সেই ডাটা অনুযায়ী নজরদারি ও প্রয়োজনে গ্রেফতারের নির্দেশনাও দেয়া হয়েছিল। কিন্তু এখনো শেষ হয়নি ডাটা তৈরির কাজ। ভুক্তভোগীরা মনে করছেন, পুলিশের নমনীয় আচারণে অপরাধীরা বেপরোয়া হয়ে উঠছে। কারণ যে সব ঘটনা ঘটছে এর মধ্যে প্রায় সবটির সাথে সম্পৃক্ত রয়েছে ছাত্রলীগ ও আওয়ামী লীগসহ তাদের অঙ্গসংগঠনের নেতাদের ইন্ধন। আর এরা বুঝে গেছে যে পুলিশ তাদের তেমন কিছুই করতে পারবে না।

সূত্র মতে, ঈদের ছুটিতে সারা দেশে ৬৭টি অপরাধ সংগঠিত হয়েছে। যার মধ্যে খুন, ছিনতাই, চুরি, ডাকাতি, হামলাসহ বিভিন্ন ঘটনা রয়েছে। ঈদের ছুটির মধ্যে মিরপুরে ছিনতাইয়ের অভিযোগে গণপিটুনির শিকার হয়ে এক যুবকের মৃত্যু হয়েছে, ছিনতাইকারীদের ছুরিকাঘাতে গুরুতর আহত হয়েছেন সেন্টমার্টিন সি ভিউ ট্রাভেল এজেন্সির সুপারভাইজার ইমন, মোহাম্মদপুর ৪০ ফিট এলাকায় ছিনতাইকারীর কবলে পড়েন ফুডপান্ডার ডেলিভারিকর্মী, মিরপুরের দারুসসালাম ও মুগদা এলাকায় পৃথক দুই কিশোরীকে ধর্ষণের ঘটেছে, ডেমরায় নারীকে বালিশচাপা দিয়ে হত্যা, ধলেশ্বরী নদীতে নৌকায় উচ্চ শব্দে গান বাজিয়ে কিশোর গ্যাংয়ের দেশীয় অস্ত্র প্রদর্শনসহ বিভিন্ন ঘটনা বেশ আলোচিত হয়েছে। প্রায় প্রতিটি ঘটনার পেছনেই নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের পরিকল্পিত ইন্ধন রয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

শরীয়তপুরের জাজিরায় প্রকাশ্যে খোলা মঠে আওয়ামী লীগের দুই পক্ষের সদস্যরা বৃষ্টির মতো বোমা ফাটিয়েছে। যার ভিডিও দেশব্যাপী ছড়িয়ে পড়েছে। তুরাগ থানা ছাত্রদলের নেতা ফারুক হোসেন ও যুবদল নেতা মাসুদ রানাকে এলোপাতাড়ি কুপিয়ে ও মারধরে আহত করেছেন থানা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি সাবেদ আলীর ছেলে ছাত্রলীগ নেতা শান্ত ও তার ভাই প্রশান্ত। আহত মাসুদ তুরাগ থানা বিএনপির সাবেক সহ প্রচার সম্পাদক জাকির হোসেনের ছোট ভাই। মাসুদ ও ফারুক হোসেনের ওপর এমন হামলার বীভৎসকর ভিডিও এলাকায় তীব্র ভীতিকর অবস্থা বিরাজ করছে।

এ দিকে নিষিদ্ধ ঘোষিত বাংলাদেশ ছাত্রলীগের সারা দেশের নেতাকর্মীদের তালিকা তৈরির নির্দেশনা দিয়েছিল পুলিশ সদর দফতর। সংগঠনটির নেতাকর্মীদের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ, রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা, সামাজিক কার্যক্রম এবং সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা বুঝতে এই উদ্যোগ নেয়া হয়। কোনো ধরনের হয়রানি বা মামলা করতে নয়; রাষ্ট্রের নিরাপত্তার স্বার্থে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের তথ্য-উপাত্ত যাচাই করা হতে এই উদ্যোগ নেয়া হয়।

পুলিশের সূত্র বলেছে, নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটানোর অপচেষ্টা চালাতে পারে। এ জন্য তারা সংগঠিত হওয়ার চেষ্টা করছেন। সেই আশঙ্কা থেকে তাদের গতিবিধি অনুসরণ করতে পুলিশ সদর দফতর থেকে জেলা পুলিশ সুপারদের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। সব থানা থেকে তালিকা সংগ্রহ করে সদর দফতরে পাঠাতে বলা হয়েছে। পুলিশ সদর দফতর বলেছে, ছাত্রলীগ নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠন। আইন অনুযায়ী এদের সব কার্যক্রম শাস্তিযোগ্য অপরাধ।

গত বছরের ২৩ অক্টোবর বাংলাদেশ ছাত্রলীগকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে অন্তর্বর্তী সরকার। একই সাথে ছাত্রলীগকে নিষিদ্ধ সত্তা হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হয়। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন চলাকালে হত্যা, হত্যাচেষ্টা, হামলাসহ বিভিন্ন অভিযোগে সারা দেশে অসংখ্য মামলায় আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গ সংগঠনগুলোর হাজার হাজার নেতাকর্মীকে আসামি করা হয়েছে। কিন্তু হাতেগোনা কয়েকজন ছাড়া বাকি সবাই রয়েছেন ধরাছোঁয়ার বাইরে।

পুলিশের সূত্র বলছে, আত্মগোপনে থাকা ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা সংগঠিত হয়ে দেশে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টি করার চেষ্টা করছেন বলে গোয়েন্দা তথ্য রয়েছে। তাই তাদের আইনের আওতায় আনা প্রয়োজন।

ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের তালিকা তৈরিতে পুলিশ সদর দফতর নির্দেশনা দেয়ার পর জেলা পুলিশ সুপারের কার্যালয় থেকে থানায় থানায় চিঠি দেয়া হয়েছে। ফ্যাক্স ও ই-মেইলে পাঠানো চিঠিতে বলা হয়েছে থানা পর্যায়ে ছাত্রলীগের নেতাদের পাঁচ ধরনের তথ্য সংগ্রহ করতে হবে। এর মধ্যে ছাত্রলীগের নেতার পূর্ণ নাম ও পরিচয়, জাতীয় পরিচয়পত্র নম্বর, পাসপোর্ট নম্বর (যদি থাকে), রাজনৈতিক পরিচয় ও সংগঠনে অবস্থান, অতীত ও বর্তমান কার্যক্রমের বিবরণ, জিডি বা মামলা থাকলে তার বিবরণ। এ ছাড়া তিনি কোন এলাকার নেতাকর্মী সেটাও উল্লেথ করতে হবে। কিছু এলাকার তালিকা তৈরি হলেও এখনো সেগুলো যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে বলে জানা গেছে।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে পুলিশ সদর দফতরের ঊর্ধ্বতন কয়েক কর্মকর্তা বলেন, ছাত্রলীগসহ বিভিন্ন পর্যায়ের অপরাধীদের কর্মপরিকল্পনা জানতে গোয়েন্দা নজরদারি বৃদ্ধি করা হয়েছে। যেকোনো অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড প্রতিহত করা হবে। কোনো অপরাধীকেই ছাড় দেয়া হবে না।